ব্যাট এবং খুন্তি, দুটোতেই সমান স্বচ্ছন্দ
রিচা রায়
সদ্য তখন গোঁফের রেখা উঠতে শুরু করেছে। বাবার সঙ্গে মাঠে যাওয়া শুরু। দিনভর প্র্যাকটিসের পরে আবার বাবার হাত ধরেই বাড়ি ফেরা। সময়ের স্রোতে জীবন নানা খাতে বয়েছে। সাফল্য, ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা হয়েছে। যা-ই হয়ে যাক, বাবা বন্ধুর মতো পাশে থেকেছেন। সদ্য সেই ‘বন্ধু’কে চিরতরে হারিয়েছেন ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং বাংলার কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লা। তিনি গল্প করছিলেন, কম বয়সে রোজ সকালে মাঠে যাওয়ার সময়ে বাবা তাঁর জন্য বানাতেন এক বিশেষ খাবার। সেটা খেয়েই দুরন্ত ঘোড়ার মতো ছুটতেন।
লক্ষ্মী বলেন, ‘বাবা ভোরে উঠে আমার জন্য বানাতেন ডালিয়ার পায়েস। সেটা খেয়েই মাঠে যেতাম। দারুণ এনার্জি পেতাম। দীর্ঘদিন ডালিয়ার পায়েস খেয়েই প্র্যাকটিসে গিয়েছি।’ ভরপুর দুধ আর চিনি দিয়েই তৈরি হতো সেই পায়েস। একজন খেলোয়াড় চিনি দেওয়া জলখাবার খেয়ে প্র্যাকটিসে যাচ্ছেন, সেটা শুনে অনেকেই একটু নড়েচড়ে বসতে পারেন। ফিট থাকতে হলে চিনি থেকে দূরে থাকো, সেই মন্ত্রেই বিশ্বাসী অনেকে। লক্ষ্মী সেই ভুলটা ভাঙালেন। তাঁর কথায়, ‘কেউ যদি বেশি কায়িক পরিশ্রম করেন, তা হলে চিনি খাওয়া যেতেই পারে। আমি সেই সময়ে সারাদিন প্র্যাকটিস করতাম। ঘাম ঝরত। অনেকটা ক্যালোরি বেরিয়ে যেত। একটু চিনি না খেলে তো শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এখন যেহেতু খেলা ছেড়ে দিয়েছি, তাই চিনি খাওয়া বন্ধ। চায়েও চিনি খাই না।’ অবশ্য তাঁর পছন্দের চা একটু অন্য রকমের। চায়ের সঙ্গে দারচিনি, লবঙ্গ, তুলসি, এলাচ, হলুদ দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নির্যাসটা ছেঁকে আয়েশ করে চুমুক দেন কাপে।

তাঁর কথায়, ‘সারাবছর এই চা খেলে কোনও রোগবালাই ছুঁতে পারবে না। ফিট থাকা যাবে।’ ওটস, মুসলি, টকদই কিংবা চিয়া সিডস নয়, ফিট থাকার জন্য তাই তাঁর প্রথম পছন্দ ভাত-ডাল এবং আলু চোখা। অনেকেই সর্ষের তেল, ভাজা পেঁয়াজ, শুকনো লঙ্কা দিয়ে আলু চোখা তৈরি করেন। তবে লক্ষ্মীর পছন্দ একটু আলাদা। বেশি ঘি দিয়ে একেবারে মিহি করে মাখতে হবে। মুখে যেন আলুর দানা না আটকায়। হাওড়ার নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা। ছোট থেকেই ভাত আর মুড়ির সঙ্গে তাঁর দারুণ দোস্তি। ইন্ডিয়া টিমে খেলার সময়েও ম্যাচ না থাকলে লক্ষ্মীর প্লেটে ভাত-ই থাকত। লন্ডন হোক কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ়, যেখানেই যান না কেন ভাত তাঁর চাই-ই। ভাতের প্রতি ভালোবাসা এখনও অটুট। তবে খান পান্তা ভাত। রাতে গরম ভাতে জল দিয়ে রাখা হয়। পরের দিন জল ঝরানো পান্তা ভাতের সঙ্গে গরম ডাল আর তরকারি তৃপ্তি ভরে খান। লক্ষ্মীর টিপস, পান্তাভাতে ফ্যাটের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। তাই এ ভাবে ভাত খেলে ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয় নেই একেবারেই।

ভাতের মতোই মুড়িও তাঁর বড্ড প্রিয়। রঞ্জি খেলার সময়ে ড্রেসিংরুমে কখনও মুড়ি-ঘুগনি, আবার কখনও ঝালমুড়ি পার্টি চলত। হাওড়ার মানুষ নাকি মুড়ির নামে এক ঘটি জল বেশি খান? লক্ষ্মী বলেন, ‘হাওড়ার মানুষ বলে নয়। মুড়ি খেতে আমরা সকলেই ভালোবাসি। মুড়ি দিয়ে ঘুগনি আমার সবচেয়ে প্রিয়। ইডেনের ক্যান্টিন থেকে মাঝেমাঝেই খাই। বলতে গিয়ে এখনই জল চলে আসছে জিভে। আবার আসা-যাওয়ার পথে ভিক্টোরিয়ার সামনে গাড়ি দাঁড় করাই। এক দাদু বসেন ঝালমুড়ি, পাপড়িচাট, আলুকাবলি নিয়ে। মন ভরে খাই। মোট কথা মুড়ি আমার পছন্দের। ইডেনের সামনেও একজন মুড়ি বিক্রি করেন। মুড়ি কিনে লঙ্কা, আচারের তেল দিয়ে ভালো করে মেখে খাই। আমাদের বাড়িতেও খুব ভালো আচার বানানো হয়। শীতকালে আচার দিয়ে মুড়ি হলে আমার আর কিছু চাই না।’
গত তিন বছর ধরে মাছ, মাংস খান না। তবে ডিম খান মাঝেমধ্যে। ৪৫ ছুঁইছুঁই বয়সে শরীরে এতটুকু মেদ জমতে দেননি। ফিটনেসের সবচেয়ে বড় মন্ত্র হলো বাড়ির খাবার খাওয়া। বাইরের খাবার শেষ কবে খেয়েছেন মনে পড়ে না। ভেজ বিরিয়ানি হোক বা পোলাও, খেতে ইচ্ছে হলে বাড়িতেই বানিয়ে নেন বাংলার কোচ। কারণ হাতে ব্যাট এবং খুন্তি, দুটোতেই তিনি অলরাউন্ডার। সব রান্নাই করতে পারেন। শুক্ততে কী ফোড়ন দেওয়া হয়, সেটাও জানেন।

সগর্বে বলেন, ‘হ্যাঁ, সব পারি। শুক্ততে দেয় পাঁচফোড়ন। আমিষ, নিরামিষ সব ধরনের খাবারই বানাতে পারি।’ এই যেমন পোস্তর বড়া একটু অন্য ভাবে তৈরি করেন। লক্ষ্মী যে পোস্তর বড়া বানান তাতে থাকে লঙ্কা, রসুন, কুচোনো সব্জি আর বেসন। পেঁয়াজ পোস্তও বড্ড পছন্দের। পটলের দোরমার কথা মনে পড়লে মন আনচান করে। ক্রিকেট পিচে ব্যাটে-বলে তিনি অলরাউন্ডার। তবে তাঁর ‘ফুড ইনিংস’ও কম লোভনীয় নয়।
ছবি: সর্বজিৎ সেন