পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ছক কতটা পাল্টাবে? - 24 Ghanta Bangla News
Home

পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ছক কতটা পাল্টাবে?

Spread the love

পারস্য উপসাগরে মোটেও একটা যুদ্ধ চলছে না। বরং তেল আভিভ আর ওয়াশিংটন-এর সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের আড়ালে তেহরানের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি আর সৌদি আরবেরও যুদ্ধ চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলির এত দিন ধরে পুঞ্জীভূত বৈরিতার লাভার অগ্ন্যুৎগীরণ হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায় এই যুদ্ধকে ঢাল করে। এরই পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে মার্কিন একাধিপত্য ভেঙে নতুন জোটের পদধ্বনিও। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ছায়া ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, একাধারে জ্বালানি সুরক্ষা এবং কৌশলগত কারণে পশ্চিম এশিয়ায় আবু ধাবিই কি নয়াদিল্লির তুরুপের তাস হয়ে উঠছে?

দুবাইয়ের এক অভিজাত এলাকার অনেকেই আজকাল উদ্বিগ্ন মুখে আকাশের দিকে মাঝেমধ্যেই তাকিয়ে থাকছে। দেখতে চেষ্টা করছে, তাদের মাথার উপর দিয়ে ঘন ঘন আকাশপথে উড়ে যাওয়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন মহানগরীর উপরই এসে পড়ল কি না। শঙ্কার যথেষ্ট সঙ্গত কারণও রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, আমিরশাহির উপর হাজার তিনেক ড্রোন আর শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। আবার এ-ও শোনা যাচ্ছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরব ইরানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

ইতিহাস বলে, পারস্য উপসাগরের উত্তর উপকূলের ইরান ও দক্ষিণ উপকূলের আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বৈরিতা শত শত বছরের। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে তেহরানের বৈরিতা।

তিন দ্বীপের গপ্পো

এই বৈরিতার সূত্র আছে পাঁচ শতাব্দী আগের ইতিহাসে। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে পর্তুগাল থেকে ভারতে আসার সমুদ্রপথ খুঁজে বার করেন। এর পরই ইউরোপ থেকে সমুদ্রপথে বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য করার জন্য পর্তুগিজ়়রা কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। নজর পড়ে পারস্য উপসাগর ও সেখানকার তৎকালীন উপজাতি-শাসিত রাজ্যগুলোর উপর। ১৫০৭ সালে আলফন্সো দ্য আলবুকার্ক পারস্য উপসাগরের মুখে হরমুজ় দ্বীপ দখল করে পশ্চিম এশিয়ায় পা রাখেন। তৈরি হয় ফোর্ট অফ আওয়ার লেডি অফ কনসেপশন, যেখান থেকে ১৬২২ পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়া শাসন করেছে পর্তুগাল।

হরমুজ় প্রণালীর মুখে অবস্থিত হরমুজ় দ্বীপ ছিল পারস্যের শাহের সাম্রাজ্যের মধ্যে। কিন্তু পর্তুগিজ়়রা এই দ্বীপ দখল করে সেখানে স্বাধীন ভাবে শাসন করতে শুরু করে, হরমুজ় প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে শুল্কও আদায় করে। তেমন নৌ-শক্তি না থাকায় পারস্য কিছু করতেও পারছিল না। ১৫১০ সালে গোয়া এবং ১৫১১ সালে মালাক্কা প্রণালী দখল করে পুরো এশীয় জলপথে তখন কর্তৃত্ব করছে পর্তুগাল।

সপ্তদশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও এশীয় জলপথে বাণিজ্য করতে অগ্রসর হয়। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তৎকালীন দুই ইউরোপীয় নৌ-শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সুযোগ বুঝে তৎকালীন পারস্যের শাহ প্রথম আব্বাস ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র নীতি মেনে ইংরেজ কোম্পানিকে আহ্বান করলেন হরমুজ় থেকে পর্তুগিজ় তাড়ানোর জন্য।

১৬২২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ক্যাপ্টেন জন ওয়েডেল আর ক্যাপ্টেন রিচার্ড ব্লিথ-এর নেতৃত্বে কোম্পানির নৌবাহিনী হরমুজ় অবরোধ করে। টানা ১০ সপ্তাহ অবরোধের পরে ২২ এপ্রিল পর্তুগিজ় সেনা কম্যান্ডার ক্যাপ্টেন সিমাও দি মেলো-র নেতৃত্বাধীন সেনা আত্মসমর্পণ করে। উপসাগরে পর্তুগিজ় জমানার অবসান হয়, বন্দর আব্বাসে ইংরেজ ঘাঁটি গেঁড়ে বসে। শুরু হয় উপসাগরে ৩৪৯ বছরব্যাপী ব্রিটিশ জমানা।

পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলের ছোট ছোট আরব উপজাতি-শাসিত রাজ্যগুলো কার্যত স্বাধীনই ছিল। পারস্য কিছুতেই তাদের কব্জা করতে পারত না। উপসাগরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে লুঠপাট চলত। এতে পারস্যের বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতো। পর্তুগিজ় জমানায় এরা কিছুটা শান্ত থাকলেও ব্রিটিশ জমানায় ফের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কাসিমি উপজাতি আমিরশাহিতে ফের ক্ষমতা দখল করে উপসাগরীয় জলপথের বাণিজ্যিক জাহাজে লুঠপাট শুরু করে।

কাসিমিদের হাত থেকে কোম্পানির বাণিজ্যপোতও যখন বাঁচল না, তখন ব্রিটিশ নৌবাহিনী স্বমূর্তি ধারণ করল। ইংরেজ নৌবাহিনী ১৮০৯ আর ১৮১৯ সালে দু’বার তৎকালীন আমিরশাহির মূল শহর রাস-অল-খাইমা’র মূল দুর্গ মুর্হুমুহু গোলাবর্ষণ করে গুঁড়িয়ে দিলো, কাসিমি নৌবহর ধ্বংস করল। শেষে ১৮২০ সালে ইংরেজদের সঙ্গে নৌ-চুক্তি করতে বাধ্য হলো কাসিমিরা। আদতে বন্দুকের নলের মুখে এই চুক্তি বাহানা মাত্র। আমিরশাহির সব রাজ্য ১৫০ বছরের জন্য ব্রিটিশ শাসনাধীনে চলে যায়। যেটুকু ফাঁকফোকর ছিল, সেগুলোও পরবর্তী কালে, ১৮৫৩ আর ১৮৯২ সালের দুটো চুক্তিতে মিটিয়ে নেয় ইংরেজ। এই সব ঘটনায় অবশ্য পারস্য তথা ইরানের সুবিধে হলো না। উল্টে ধীরে ধীরে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলের ছোট ছোট আরব উপজাতি-অধ্যুষিত রাজ্যগুলো কোম্পানির খপ্পরে পড়ল।

ইতিহাসবিদরা আবার পারস্য উপসাগরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রমরমার অন্য কারণও দেখিয়েছেন। পারস্যের শাহ প্রথম আব্বাস যখন ইউরোপীয় শক্তিগুলিকে ডাকছেন পর্তুগিজ়দের ঠান্ডা করার জন্য, তখন ইংরেজরা শুধু নিজেদের সমুদ্র-বাণিজ্য রক্ষার জন্য এগিয়েছিল, এ কথা ভাবা ভুল হবে। কোম্পানি যে শুধু বাণিজ্যের জন্য আসেনি, তা অবশ্য পর্তুগিজ়-পরবর্তী যুগে পারস্যের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ নৌ-শক্তির সামনে পারস্য অসহায় ছিল। ফলে উপসাগরের উভয় উপকূলে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজ্যগুলো যখন ব্রিটিশরা একে-একে গ্রাস করল, তখন কাগুজে প্রতিবাদ ছাড়া তাদের আর করার কিছু ছিল না। অপর দিকে, অটোমান আর পারস্যের হাত থেকে বাঁচার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলি ব্রিটিশ ছাতার তলায় থাকা শ্রেয় মনে করল। অর্থাৎ আমিরশাহির মতে, উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে পারস্যের বৈরিতার বীজ পোঁতা হয়েছিল বহু আগেই।

তবে বিংশ শতকে এই বৈরিতা সরাসরি সামরিক সংঘাতে পরিণত হয় হরমুজ় প্রণালীর তিনটি দ্বীপকে কেন্দ্র করে। প্রণালীর জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের মালিকানা আমিরশাহি ও ইরান, উভয়ই দাবি করে। ১৮৭২ থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত কাসিমি জমানায় এই তিনটি দ্বীপ আমিরশাহির অধীনেই ছিল। তখনও ইরান দাবি করে, কাসিমিরা আদতে তাদের অধীন বলে। পহলবি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রেজ়া শাহ বিগত শতকের কুড়ির দশকে নৌ-বাহিনী গড়ে তোলার উপর জোর দেন। দ্বীপ তিনটে নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গেও সমঝোতায় আসতে উদ্যোগী হন রেজ়া শাহ। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

তবে ইরানের সামনে সুযোগ আসে ১৯৭১ সালে। ব্রিটেন ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষে ওই অঞ্চল থেকে তল্পি গোটায়। অন্য দিকে, ব্রিটেনের থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমিরশাহি স্বাধীনতা লাভ করে ২ ডিসেম্বর। অর্থাৎ মাঝের দু’দিন এই তিনটি দ্বীপের মালিকানা কার্যত ছিল না। ইরান ঠিক এই সুযোগটাই নেয়। ৩০ ডিসেম্বর ইরান এই তিন দ্বীপ দখল করে। শোনা যায়, বাহরাইনের উপর দাবি তুলে নেওয়ার বদলে হরমুজ় প্রণালীর এই তিনটি দ্বীপ পায় ইরান। আমিরশাহির তরফে এর তীব্র প্রতিবাদ হয়। এই দখলের সমালোচনা হয় আরব দুনিয়া জুড়েও, কিন্তু এখনও দ্বীপ তিনটি তেহরানের কব্জায়।

১৯৭৯ সালে ইরানে পহলবি রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে আয়াতোল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে ইসলামি কট্টরপন্থীরা ক্ষমতা দখল করলে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়। প্রথম থেকেই নয়া প্রশাসন আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের বিরোধিতা শুরু করে। ফলে তেহরানের এত দিনের বন্ধু বলে পরিচিত রিয়াধ আর তেল আভিভ রাতারাতি শত্রুতে পরিণত হয়। পড়শি সুন্নি দেশগুলোর রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য ডাকও দেয় শিয়া ইরান। ইরানের সম্ভাব্য আক্রমণের থেকে বাঁচতে বাহরাইন, ওমান, কাতার, কুয়েত, আমিরশাহি আর সৌদি আরব, এই ছয় সুন্নি দেশ ১৯৮১ সালে গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি তৈরি করে। ৩০টির মতো মার্কিন ঘাঁটিও থাকে জিসিসি দেশগুলিতে। ফলে কার্যত বারুদের স্তূপের উপর বসে ছিল পশ্চিম এশিয়া। এই যুদ্ধ সেই বারুদে অগ্নিসংযোগ করেছে।

আমিরশাহিই তুরুপের তাস?

এই যুদ্ধের পরে কী হবে? ভারতেরই বা কোন ভূমিকা থাকবে? এটা পরিষ্কার যে, ইরানের ৪০০ কেজি এনরিচড ইউরেনিয়াম কব্জায় আনা আর ইরাকের মতো ইরানের শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করে দেশটাকে কব্জা করার মার্কিন উদ্দেশ্য তো সফল হয়নিই, উল্টে হরমুজ় প্রণালীর লাগাম কার্যত তেহরানের হাতে চলে গিয়েছে। এর উপরে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে স্পষ্ট যে, আমেরিকানদের বহুমূল্য আকাশ প্রতিরক্ষার ভাঁড়ারে যখন টান পড়েছে, তখনও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের ৭০ ভাগ অক্ষত।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি আমিরশাহির ছায়া ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। সম্প্রতি তারা তেল উৎপাদন গোষ্ঠী ওপেক ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, আবু ধাবির দিনপ্রতি গড়ে ৪০ লক্ষ ৮৫ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও ওপেক-এর কোটা অনুসারে তারা ৩০ লক্ষ ২০ হাজার ব্যারেল উৎপাদনে সীমিত থাকতে বাধ্য হতো। ভারতের যেহেতু দিনে গড়ে ৫০ লক্ষ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল দরকার হয়, তাই আমিরশাহির বাড়তি উৎপাদন দিল্লির পক্ষে সুসমাচার। উপরন্তু, হরমুজ় প্রণালী এড়িয়ে এই তেল রপ্তানির জন্য আবু ধাবি পাইপলাইনও পাতছে।

জিসিসি-তে সৌদির দাদাগিরি না মেনে আবু ধাবি যে স্বাধীন ভাবে দিল্লির সঙ্গে সামরিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে, এটাও সাউথ ব্লকের কাছে স্বস্তিদায়ক। কারণ জিসিসি-তে সৌদির প্রভাব কমায় এক দিকে যেমন ইসলামাবাদ-রিয়াধ-আঙ্কারা-কায়রো জোট ধাক্কা খাবে, অন্য দিকে দিল্লি-আবু ধাবি-তেল আভিভ-ওয়াশিংটন জোট মজবুত হবে। পশ্চিম এশিয়ায় বন্ধুহীন তেহরানকেও কিন্তু শেষে দিল্লির দিকেই তাকাতে হতে পারে।

লেখক সাংবাদিক

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *