মাইসোর প্যালেস, হেমা মালিনীর নাচ আর গা ছমছমে অনুভূতি
মূল প্রাসাদটি শ্বেতপাথরের গম্বুজ-সহ তিন তলাবিশিষ্ট। রয়েছে ১৪৫ ফুট উঁচু পাঁচতলা টাওয়ার। প্রাসাদের সাতটি গেট আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পূর্বের জয় মার্তণ্ড গেট, উত্তরের জয়রাম-বলরাম গেট এবং দক্ষিণের বরাহ ও অম্বা বিলাস গেট। প্রাসাদের মধ্যস্থলে যে ধনুকাকৃতি খিলান রয়েছে তার উপরে রয়েছে সম্পদ, ভাগ্য ও প্রাচুর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী গজলক্ষ্মীর ভাস্কর্য। পুরোনো দুর্গের মধ্যে রয়েছে তিনটি মন্দির, আর মূল প্রাসাদের মধ্যে ১৮টি মন্দির। মহীশূরের রাজারা চামুণ্ডিদেবীর ভক্ত ছিলেন। তাই প্রাসাদটি চামুণ্ডি হিল্স অভিমুখী। প্রাসাদে দু’টি দরবার হলঘর আছে। রবিবার ও সরকারি ছুটির দিন বাদে প্রাসাদে দর্শক সাধারণের জন্য লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো হয়। সেই সাউন্ড শো দেখলে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন। তবে সেখানে এক সময়ে বেশ কিছু দেশের জাতীয় সঙ্গীতও বাজানো হতো। সন্ধের পরে প্রাসাদের বাইরে এর আয়োজন করা হতো। এখন সেটা আর হয় কি না জানা নেই।
মাইসোর প্যালেস বিখ্যাত হলেও, একে ঘিরে কিছু রহস্যময় এবং অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, এই প্রাসাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু অতৃপ্ত আত্মা বা অভিশাপ। এই রাজবংশকে নিয়ে সব থেকে বিখ্যাত গল্পটি হলো ‘তালকাড়ুর অভিশাপ।’ কথিত আছে, ১৬১২-য় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতনের পরে রাজা ওয়াদিয়ার যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন তৎকালীন রানির কাছে কিছু বহুমূল্য রত্ন ছিল। রাজকীয় সৈন্যরা জোর করে সেই অলঙ্কার নিতে যান, তখন রানি কাবেরী নদীতে ঝাঁপ দেন। মৃত্যুর আগে তিনি অভিশাপ দিয়েছিলেন, ‘মহীশূরের রাজারা যেন কোনও দিন উত্তরাধিকারী না পায়।’ আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৪০০ বছর ধরে মহীশূর রাজপরিবারে সরাসরি কোনও রাজার নিজের সন্তান হয়নি। তাঁরা সবসময় দত্তক নিয়ে বংশ রক্ষা করেছেন। অনেকে মনে করেন, প্রাসাদের অন্দরে আজও সেই রানির অতৃপ্ত আত্মার প্রভাব রয়েছে। আবার অনেকে বলেন, গভীর রাতে রাজ-দরবার বা করিডোরগুলোয় মাঝেমধ্যে নূপুরের শব্দ শোনা যায়। লোককথা অনুযায়ী, এক সময়ে রাজদরবারের কোনও এক সুন্দরী নর্তকী অকালে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর আত্মা আজও প্রাসাদের হলঘরে ঘুরে বেড়ায়। পর্যটকদের জন্য রাতে প্রবেশ নিষেধ থাকলেও, প্রহরীদের অনেকেই অদ্ভুত কিছু শব্দ শোনার দাবি করেন।
কিছু পর্যটক এবং গাইড আবার দাবি করেছেন যে, প্রাসাদের ডল অডিটোরিয়াম বা যেখানে পুরোনো আমলের অস্ত্রশস্ত্র রাখা আছে, সেখানে কেউ যেন সব লক্ষ্য রাখেন— এমন অনুভূতিও হয়। কিন্তু সকালের প্রাসাদ আর রাতের প্রাসাদের মধ্যে আমি আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করেছি। আমার মতে, সকালে যখন প্রাসাদের ভিতরে ঢোকা হয় তখন অনেক লোকজন থাকেন। সবাই মিলে শৃঙ্খলা মেনে প্রাসাদ ঘুরে দেখেন। অস্ত্র থেকে রাজাদের পোশাক, নানা ধরনের ছবি— সবই চোখে পড়ে। মাইসোর প্যালেসে আমি প্রথম অন্য ধরনের একটি ছবি দেখেছি। আমি যে দিকেই যাচ্ছি, ছবিটা সে দিকেই তাকাচ্ছে। খুব সম্ভবত সেটা ঘোড়ার ছিল। রাতে প্রাসাদের মূল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। সকালে গমগম করা ট্যুরিস্ট স্পট বদলে যায় শূন্যতায়। ফলে কেউ থাকুক আর না থাকুক, শূন্যতা তো মানুষকে গ্রাস করেই। গা ছমছমে ভাব থেকে নিজের পায়ের শব্দ শুনলেও মনে হয়, কেউ বুঝি পিছু নিয়েছে!