ফিরছে ভোট, স্কুলপরিচালন সমিতিতে বদল, নির্দেশিকা জারি
এই সময়: স্কুল পরিচালন সমিতি বা ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে এ বার থেকে ৭৫ শতাংশ সদস্যপদ সংরক্ষিত থাকবে স্কুলে পাঠরত পড়ুয়াদের অভিভাবকদের জন্যে। আর বাকি ২৫ শতাংশ আসনে নির্বাচিত হবেন পঞ্চায়েত বা পুরসভার প্রতিনিধি, স্কুলের শিক্ষক–শিক্ষিকা এবং স্থানীয় শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি অঙ্গনওয়াড়ি, আশা ও এএনএম-এর মতো সামনের সারির স্বাস্থ্য ও সমাজকর্মীরা।
কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের ২০২৬–এর স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি গাইডলাইনে এমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্কুলে মোট পড়ুয়ার সংখ্যার নিরিখে কমিটিতে ১২ থেকে ২৫ জন সদস্য থাকবেন, যার মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্য মহিলা হওয়া বাধ্যতামূলক। সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি এবং বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের অভিভাবকদেরও আনুপাতিক হারে কমিটিতে রাখতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে তৈরি হবে কমিটি, যার মেয়াদ হবে দু’বছর।
নতুন নির্দেশিকাটি জাতীয় শিক্ষানীতি এবং শিক্ষার অধিকার আইনের সমন্বয়ে গঠিত। কমিটির কাঁধে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। স্কুলে কোনও শিশু যাতে শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক বৈষম্যের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা কমিটির অন্যতম প্রধান কাজ। সমাজের প্রান্তিক অংশের শিশুরা যাতে কোনও ভাবেই মাঝপথে পড়াশোনা না ছাড়ে, তার জন্য ড্রপ-আউট বা স্কুলছুট শিশুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চিহ্নিত করে তাদের শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কমিটিকে উদ্যোগী হতে হবে। মাসে অন্তত এক বার কমিটিকে বৈঠকে বসতে হবে এবং শিক্ষক–শিক্ষিকারা যাতে নিয়মিত স্কুলে আসেন ও সিলেবাস অনুযায়ী পঠনপাঠন ঠিকমতো হয়, তার তদারকিও করবে কমিটি। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিকাঠামো উন্নয়নে আগামী তিন বছরের বিস্তারিত রূপরেখা বা ‘স্কুল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ তৈরির দায়িত্বে থাকছে কমিটি।
শিশুদের স্বাস্থ্যের দিকেও সমান নজর দেওয়া হয়েছে নতুন গাইডলাইনে। পিএম পোষণ বা মিড-ডে মিলের খাবারের গুণগত মান শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও নিয়মিত যাচাই করতে হবে। এ ছাড়া উৎসব বা বিশেষ দিনে ‘তিথি ভোজন’-এর মতো কর্মসূচিকে উৎসাহিত করার কাজও করবে কমিটি।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর কথায়, ‘স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিগুলি যাতে সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা। এই ভাবে কমিটি তৈরি করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলিকেও।’ ধর্মেন্দ্র মনে করেন, কমিটিগুলি সমাজ ও স্কুলের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করবে। কারণ কমিটিতে স্থানীয় শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট মানুষ, প্রাক্তনীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এ বার রাজ্যে ফের একটি পালাবদলের পরে এখন ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। ফলে শিক্ষাবিদদের অনেকেই মনে করেন, কেন্দ্রীয় নীতি মানতে আর বাধা থাকল না।
ম্যানেজমেন্ট কমিটি তৈরির ক্ষেত্রে পুরোনো নির্বাচন পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সমস্ত অভিভাবককে একটি নোটিস পাঠিয়ে নির্বাচনের সময়সূচি ও পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করবেন স্কুলের প্রধান। অভিভাবকরা চাইলে নিজেদের নাম মনোনীত করতে পারেন, অথবা অন্য কোনও যোগ্য ও ইচ্ছুক অভিভাবককে প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করতে পারেন। ভোটগ্রহণের সময়ে স্কুলে অন্তত ৫০ শতাংশ অভিভাবকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
প্রধান শিক্ষকদের সংগঠন অ্যাডভান্স সোসাইটির তরফে চন্দন মাইতির কথায়, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার জন্য যেন স্কুলে গোলমাল না বাধে, সেটা দেখতে হবে। পাশাপাশি এত বড় ম্যানেজমেন্ট কমিটি নিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে আসা কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়বহুল।’
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, বহু জায়গাতেই এমন স্কুল পাওয়া যাবে যেখানে বেশির ভাগ বা প্রায় সব পড়ুয়াই প্রথম প্রজন্মের। সে ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা শিক্ষার প্রসারে কী ভাবে কাজে লাগতে পারে, তা নিয়ে সংশয় থাকছে। প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণাংশু মিশ্রর বক্তব্য, ‘বিগত রাজ্য সরকারের আমলেও নিয়ম করা হয়েছিল ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে যাঁরা সদস্য হবেন, তাঁরা অন্তত গ্র্যাজুয়েট হবেন। কিন্তু অনেক জায়গাতেই তা পাওয়া যেত না। ফলে প্রভাবশালীদের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো না ছাড়া উপায় তখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।’