পড়াশোনা করতে শেষে কিনা পাকিস্তানে! ‘সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে’ কী শিখবে বাংলাদেশিরা?
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার যে খুব নামডাক, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মান যে গগনচুম্বী— কেউই তেমন শোনেনি। কিন্তু বাংলাদেশের তারেক রহমানের সরকার এখন বিস্তর ঢাকঢোল বাজিয়ে সে দেশে ছাত্রদের পড়তে পাঠাতে লেগেছে পাকিস্তানে। ইতিমধ্যেই ৭৪ জন বাংলাদেশি পড়ুয়া বৃত্তি নিয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। ছাত্র টানতে বাংলাদেশ জুড়ে এক্সপো করছে পাকিস্তানি দূতাবাস।
ইতিহাস ভুলে ভাবমূর্তি ফেরানোর চেষ্টা?
পাকিস্তানের অর্থনীতির হাল খুবই করুণ, কিন্তু এমন একটি পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা সুযোগ তারা কেন ছাড়ে? এই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। একাত্তরে বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলায় পাকিস্তানি সেনারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল, আজও বাংলাদেশ জুড়ে তার ঘা দগদগে হয়ে রয়েছে।
সেই বাংলাদেশের শাসকেরা যদি তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানে পড়তে পাঠায়, ভাবমূর্তি ফেরানোর একটা রাস্তা তৈরি হয় বইকি!
এই সব দেখে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সহাস্য মন্তব্য, ‘সত্যিই পাকিস্তানের পড়ুয়াদের আন্তর্জাতিক মহলে দারুন সুনাম। গোটা পৃথিবী তাদের চেনে, জানে। তবে, তাদের একটাই সাবজেক্ট— তা হল সন্ত্রাসবাদ। পাকিস্তানের মাদ্রাসায় ‘শিক্ষিত’ তালিবান এখন পড়শি একটি দেশ (আফগানিস্তান)-এর শাসকও বটে! পাকিস্তান ফেরত বাংলাদেশের পড়ুয়ারাও হয়তো তাই করবে!’
পাকিস্তানি শিক্ষায় ‘বিস্মিত’ মন্ত্রী
তবে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, পাকিস্তানের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা জেনে তিনি ‘গভীর বিস্ময়ে হতবাক’ হয়েছেন। দিন কয়েক আগে ঢাকার একটি হোটেলে ‘শিক্ষা মেলা’ বা এক্সপো করে নিজেদের পঠনপাঠনের সুযোগসুবিধাগুলি বাংলাদেশের পড়ুয়াদের কাছে জানিয়েছে পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
সেই এক্সপোর উদ্বোধন করে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, আমরা স্বাধীন হয়েছি ৫৫ বছর আগে আর পাকিস্তান ৭০ বছর আগে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তারা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। সেখানকার শিক্ষার মান দেখে আমি বিস্মিত, চমকিত!’
মন্ত্রী জানান, ৫০০ জন বাংলাদেশি পড়ুয়াকে পূর্ণ বৃত্তি দিতে এগিয়ে এসেছে পাকিস্তান। এর ফলে বাংলাদেশের ছাত্রদের সামনে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার ভুবন খুলে গেল বলে তিনি মনে করেন। মন্ত্রী জানান, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও খাবারের অভ্যস্ততার মিল থাকায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে খুব সুন্দর মানিয়ে নিতে পারবে বলে আমি মনে করি।’
‘নলেজ করিডর’ ও ইউনূস আমলের নীতি
শেখ হাসিনার আমলে আওয়ামি লিগ সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ একরকম বিচ্ছিন্নই করে রেখেছিল। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় আসীন হল, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে বোঝাপড়া ও যোগাযোগ নিবিড় করার নীতি নিল।
বস্তুত ইউনূসের আমলেই ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান নলেজ করিডর’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। নির্বাচনে জিতে আসা বিএনপি সরকার এখন সেই উদ্যোগকেই এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
স্কলারশিপের সুবিধা?
নলেজ করিডরের অংশ হিসাবে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং স্কলারশিপ দেওয়া হচ্ছে। বৃত্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল স্কলারশিপ’। ৫ বছরে মোট ৫০০ জন বাংলাদেশি ছাত্রকে এই বৃত্তি দেবে বলে ঘোষণা করেছে পাকিস্তান।
এই বৃত্তির আওতায় সম্পূর্ণ টিউশন ফি, আবাসন, মাসিক অর্থসাহায্য, এককালীন আর্থিক সহায়তা এবং পরিবহণ খরচ পাকিস্তান সরকার বহন করবে। অর্থাৎ বাংলাদেশি ছাত্ররা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারবে, যা নিয়ে উল্লাসের সীমা নেই বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী মিলনের।
দেশজুড়ে মেলা ও বিতর্ক
ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশন ও পাকিস্তানের হায়ার এডুকেশন কমিশনের যৌথ উদ্যোগে ‘এডুকেশন এক্সপো ২০২৬’ আয়োজিত হয়েছে, যেখানে পাকিস্তানের ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় অংশগ্রহণ করেছে। ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও চট্টগ্রামেও এই এক্সপো আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে পাকিস্তান দূতাবাসের।
সরকারের এই প্রয়াস এবং পাকিস্তানি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রী মিলনের দরাজ সার্টফিকেট নিয়ে সমাজমাধ্যমে ঝড় উঠেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির চেয়ে যে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলিও এগিয়ে, অনেকে নানা তথ্য দিয়ে তা প্রমাণ করছেন। মন্ত্রী পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের মিলের কথা বললেও, আসমান-জমিন ফারাক খুঁজে বার করছেন অনেকে। কিন্তু তারেক রহমান সরকার অবিচল।