জৈশ-ই-মহম্মদের তোপের মুখে পাক সেনা, নিশানায় খোদ মুনিরই!
এই সময়: এ বার সরাসরি জৈশ-ই-মহম্মদের তোপের মুখে পড়ে গেল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী! নাম না-করে পাক সেনার সর্বাধিনায়ক আসিম মুনিরকেও বিঁধেছে এই জঙ্গি সংগঠন। জৈশের দাবি, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়ে তাদের পিছন থেকে ছুরি মেরেছে পাক সেনা। শুধু তা-ই নয়, যে দাবি ভারত বরাবর করে এসেছে, অর্থাৎ, জঙ্গি সংগঠনগুলিকে সামনে রেখে নাশকতার পরিকল্পনা চালাচ্ছে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এবং পাক সেনা, তাতেও সিলমোহর দিয়েছে জৈশের এই নয়া অনুযোগ এবং দাবি।
শনিবার জৈশের এই ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসতেই তুমুল সক্রিয়তা দেখা গিয়েছে পাক সরকারে। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া জৈশের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সেন্টার পুনর্গঠনের জন্য রাতারাতি বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। পাক সরকারের অর্থ এবং তদারকিতে সেই জায়গাগুলির সুরক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে সেনাও।
গত বছরের ১০ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ স্থগিত রেখে পাকিস্তানের তরফে আসা সিজ়ফায়ারের অনুরোধ মেনে নিয়েছিল ভারত। তার এক বছর পরে, শনিবার (৯ মে) সকালে তাদের নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যমে (বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করা হয়) জৈশ নেতৃত্ব একাধিক বিবৃতি দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর। তাতে বলা হয়েছে — যখন ভারতের মিসাইল বাহওয়ালপুরের সদর দপ্তর-সহ জৈশের একের পর এক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, তখন বিন্দুমাত্র সাহায্য করেনি পাক সেনা। অথচ, সাহায্যের জন্য বারবার আবেদন পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি জৈশের।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর শুরুতেই বাহওয়ালপুর এবং মুরিদকেতে যথাক্রমে জৈশ-ই-মহম্মদ এবং লস্কর-ই-তৈবার সদর দপ্তরকে টার্গেট করে ভারতের মিসাইল। তছনছ হয়ে যায় বাহওয়ালপুরে জৈশের মারকাজ় সুভান আল্লা এবং মুরিদকেতে লস্করের মারকাজ় তৈবা। মাসুদের পরিবারের ১৩ জন সদস্য নিহত হন। তাঁদের শেষকৃত্যে পাক সেনার অফিসারদেরও দেখা যায়। কিন্তু গোয়েন্দা সূত্রের খবর, কেন ২০০৫-এর ৬ মে (ক্যালেন্ডারের হিসেবে ৭ মে) ভারতের লাগাতার হামলার সময়ে পাক সেনার এক জনও নিদেনপক্ষে উদ্ধারকাজে এগিয়ে এলেন না, তা নিয়ে মাসুদের ক্ষোভ ছিল শুরু থেকেই। তবে এত দিন রাখঢাক ছিল। কিন্তু ‘সিঁদুর’-এর বর্ষপূর্তিতে পুরো ক্ষোভ উগরে দিলেন জৈশ নেতৃত্ব।
সংগঠনের বক্তব্য, সব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরে এসে কী লাভ যদি তাৎক্ষণাৎ সাহায্য চেয়ে না-ই পাওয়া যায়? সূত্রের দাবি, জৈশের আরও বক্তব্য, তাদের সদস্যদের সামনে রেখেই ভারত বা আফগানিস্তানে পাক সেনা এবং গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই নাশকতা চালানোর বিবিধ পরিকল্পনা তৈরি করে (প্রমাণ-সহ ভারত বরাবর এই দাবিই করে এসেছে)। তাতে শহিদ হয় জৈশের সদস্যরাই। পাক সেনা বা আইএসআই-এর অফিসাররা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু যখন জৈশের সামনে বিপদ এলো, তখন তাদের একা ছেড়ে সবাই চলে গিয়েছিল।
সূত্রের খবর, আসিম মুনিরের নাম না-করে বলা হয়েছে, ‘যিনি আমাদের নানা ভাবে কাজে লাগিয়েছেন, তাঁর একবারও মনে হলো না যে সেই বিপদের মুহূর্তে আমাদের সাহায্য দরকার?’ জৈশের মূল্যায়ন — ‘এই ধরনের আচরণ পিছন থেকে ছুরি মারারই সামিল।’
কেমন ছিল সেই রাত? সূত্রের খবর, জৈশের নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যমে উর্দুতে লেখা একটি পোস্টে বলা হয়েছে — ‘সেটা ছিল আতঙ্কে ঘেরা এক অদ্ভুত রাত। আকাশ থেকে যেন আগুনের বৃষ্টি হচ্ছিল। কান ফাটানো বিস্ফোরণের মধ্যে চতুর্দিকে আল্লা-হু-আকবর আর্তি শোনা যাচ্ছিল।’ আরও বলা হয়েছে, ‘জামিয়া মসজিদ সুভান আল্লার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি কোনও পুরোনো শহরের ধ্বংসস্তূপ।’ অন্য একটি পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘কারও সাহায্য চাই না। (অপারেশন সিঁদুরে) শহিদদের রক্তই আমাদের জিহাদকে জীবিত রাখবে।’
উল্লেখ করা হয়েছে জৈশের মহিলা উইং ‘জামাত-আল-মোমিনাত’-এর কথাও। সূত্রের খবর, এ বিষয়ে লেখা হয়েছে, ‘গত তিন দিনে আল্লা মোমিনাতের কাজের প্রতি বিশেষ সদয় হয়েছেন। এই সময়ে এই সংগঠনের মাধ্যমে ধর্মের বাণী পেয়েছেন হাজার হাজার মহিলা। তাঁদের মধ্যে ২,২০০ জন মোমিনাতের সদস্যও হয়েছেন।’ গোয়েন্দারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দিল্লি বিস্ফোরণের নেপথ্যে যে ‘ডক্টর্স মডিউল’ সক্রিয় ছিল, তার অন্যতম মাথা, মহিলা চিকিৎসক শাহিন সইদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল ‘মোমিনাত’-এর প্রধান, মাসুদের দিদি সাদিয়া আজ়হারের। ‘মোমিনাত’ যে ভারতেও রিক্রুটমেন্টের জাল ছড়াতে তৎপর, সে খবর তখনই গোয়েন্দাদের কাছে এসেছিল। মহিলা সংগঠনের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ নিয়ে জৈশের পোস্টের সর্বশেষ দাবি তাই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।
এ দিকে সূত্রের খবর, এই ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসার দিনই জৈশের দুই বড় ঘাঁটি — বাহওয়ালপুরের মারকাজ় সুভান আল্লা এবং মুজ়ফ্ফরাবাদের মারকাজ় বিলালের পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে জোরকদমে। আরও দাবি, ‘মসজিদ পুনর্নির্মাণ’-এর যুক্তিতে পাকিস্তান সরকারই অর্থসাহায্য করছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, শুধু বাহওয়ালপুরের জন্যই ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ় শরিফের স্পেশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রানা সানাউল্লাহকে এই কাজের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মুজ়ফ্ফরাবাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘মারকাজ় বিলাল রিডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট’। তার মাথাতেও রয়েছেন সানাউল্লাহ। তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জৈশের প্রথম সারির কম্যান্ডার, মুজ়ফ্ফরাবাদের ভারপ্রাপ্ত মহম্মদ আসগর খান কাশ্মীরিকে। এবং দু’টি কম্পাউন্ডই পাক সেনার কড়া পাহারায় ঘিরে ফেলা হয়েছে রাতারাতি।