Bhawanipur History: ভবানীপুরের নাম কীভাবে হল জানেন! – Bengali News | Bhawanipur: From Ancient History to the Political Shift of 2026
চলুন, গল্পের মতো করে চিনে নিই এই এলাকাকে।
Image Credit: chat gpt
২০২৬ সালের বিধানসভা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ভবানীপুর কেন্দ্রের ফলাফল দেখে সারা রাজ্যবাসী তাজ্জব বনে গিয়েছে। এই কেন্দ্রটিকে সবাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অজেয় দুর্গ বলেই জানতেন। কিন্তু এবার সেখানে জয়ের শেষ হাসি হাসলেন কাঁথির ছেলে শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুরের মাটিতেও তিনি নিজের আধিপত্য প্রমাণ করেছেন। বিপুল ভোটে জমিতেছেন এবং বাংলার নবম মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেছেন শুভেন্দু। রাজনীতির এই হার-জিত ভবানীপুরের বহু বছরের ইতিহাসে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। তবে এই উত্তাল রাজনীতির বাইরেও ভবানীপুরের এক শান্ত, স্নিগ্ধ আর সুপ্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। চলুন, গল্পের মতো করে চিনে নিই এই এলাকাকে।
‘ভবানীপুর’ নামকরণ ঠিক কোথা থেকে এল, তা নিয়ে আজও অনেক রহস্য রয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, এক সময় এই এলাকায় দেবী ভবানীর এক বিশাল মন্দির ছিল। সেই মন্দিরের নাম থেকেই পুরো এলাকার নাম হয়ে যায় ভবানীপুর। আবার অনেকে বলেন, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিলেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তি- ভবানীদাস ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন কালীঘাটের সেবায়েত ভুবনেশ্বর চক্রবর্তীর জামাই।
ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে এই এলাকাটা ছিল একদমই সাধারণ। এখানে বাস করতেন শুধু কুমোর, তাঁতি আর চাষিরা। কিন্তু ভবানীদাস ভট্টাচার্যের উদ্যোগে ধীরে ধীরে গ্রামটি এক অভিজাত জনপদে রূপ নিতে শুরু করে। তাঁর সম্মানেই গ্রামের নাম রাখা হয় ভবানীপুর। তবে কারও কারও মতে, ভুরসুট পরগনার রাজধানী ‘গড় ভবানীপুর’-এর সঙ্গেও এই জায়গার পুরনো যোগসূত্র আছে। একসময় এই এলাকা আদি গঙ্গার তীরে হওয়ায় প্রায়ই বন্যায় ভাসত, তাই এই এলাকা কে ‘বানভাসি’ এলাকাও বলতেন অনেকে।
লেখিকা কেয়া দাসগুপ্তর লেখা ‘জেনেসিস অব আ নেবারহুড: দ্য ম্যাপিং অব ভবানীপুর’ (Genesis of a Neighborhood: The Mapping of Bhawanipur) বইতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আদি গঙ্গার ধারে বসবাসের প্রধান কারণ ছিল বাণিজ্যের সুবিধা। এই নদীর তীর ঘিরেই গড়ে উঠেছিল নানা ছোট ছোট পাড়া। নামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকত সেই পাড়ার পরিচয়। যেমন কাঁসারিপাড়া, তেলিয়াপাড়া, শাঁখারিপাড়া আর পটুয়াপাড়া। এখানে যেমন কাঁসার বাসন তৈরি হত, তেমনি বাস করতেন পটুয়া বা চিত্রশিল্পীরা।
এই এলাকার প্রাণ ছিল এর বাজারগুলো। ১৮২৫ সালের মানচিত্রে সিতারাম ঘোষ বা গঙ্গারাম সরকারের বাজারের নাম পাওয়া যায়। তবে সবথেকে বিখ্যাত হল যদুবাবুর বাজার। এর পেছনেও এক ইতিহাস রয়েছে। ১৭৭৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের উকিল স্যার রবার্ট চেম্বারসের কাছ থেকে জমি কিনে এখানে বাজার বসিয়েছিলেন যোগেশ্বর লাহা। পরবর্তীকালে রানি রাসমণি সেই বাজারটি কিনে নেন এবং তাঁর নাতি যদুনাথ চৌধুরীকে উপহার দেন। সেই থেকেই এর নাম যদুবাবুর বাজার।
ভবানীপুরের মাটিতে কান পাতলে অনেক কিংবদন্তির কথা শোনা যায়। ১৮১৭ সালে এখানে অযোধ্যার নবাব ওয়াজির আলি খানকে সমাহিত করা হয়েছিল। পরে লেফটেন্যান্ট গভর্নর জন উডবার্ন সেই মুসলমান গোরস্থান নিশ্চিহ্ন করে তৈরি করেন আজকের উডবার্ন পার্ক।
উনিশ শতকের দিকে ভবানীপুর হয়ে ওঠে স্বনামধন্য শিক্ষিত মানুষের ঠিকানা। ১৮৬৩ সালে কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় বিচারপতি শম্ভুনাথ পণ্ডিত এখানে থাকতে শুরু করেন। ১৮৬০-এর দশকে বিখ্যাত ডাক্তার গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাবা) এখানেই বাড়ি বানিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হল, ১৮৭৬ সালে যখন প্রিন্স অব ওয়েলস কলকাতায় আসেন, তিনি ভবানীপুরের উকিল জগদানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে চা খেতে গিয়েছিলেন। সেই আমলের পর্দা প্রথা ভেঙে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে বসে আড্ডা দেন তিনি, যা নিয়ে বেশ জল্পনা তৈরি হয়েছিল সেই সময়।
ভবানীপুর মানেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ নায়ক উত্তম কুমারের আস্তানা। গিরিশ মুখার্জি রোডের সেই বাড়ি আজও স্মৃতি আগলে দাঁড়িয়ে আছে। আবার এলগিন রোডে জানকীনাথ বসুর বাড়ি থেকেই ১৯৪১ সালের এক শীতের রাতে সবার অলক্ষ্যে দেশ ছেড়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। বাঙালির লড়াই আর সাহসের এই ইতিহাস আজও ভবানীপুরের গর্ব।
হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি নীল চাষের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, তাঁর স্মৃতিও এই এলাকায় জড়িয়ে আছে। আর সেই হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান হয়।
২০২৬-এর নির্বাচন ভবানীপুরকে নতুন এক পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছে। তবে জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, এই প্রাচীন জনপদ তার ইতিহাসের ধুলো আর গৌরবের স্মৃতি নিয়ে বাংলার বুকে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।