নেশা - 24 Ghanta Bangla News
Home

নেশা

Spread the love

মূল গল্প: নেশা | লেখক: মুন্সি প্রেমচাঁদ

ভাষান্তর: বেবী সাউ

ঈশ্বরী জমিদারের ছেলে, আর আমি গরিব ক্লার্কের ছেলে। আমাদের মধ্যে প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক হতো। আমি জমিদারির বিরুদ্ধে কথা বলতাম, তাদের হিংস্র পশু, রক্তচোষা জোঁক বলে কটাক্ষ করতাম। ঈশ্বরী জমিদারদের পক্ষ নিত। কিন্তু তার যুক্তি সব সময়ে দুর্বল। সে বলত, সব মানুষ সমান হয় না, ছোট-বড়র পার্থক্য সব সময়ে ছিল এবং থাকবে। তর্কের উত্তেজনায় আমি প্রায়ই উত্তেজিত হয়ে তীব্র কথা বলে ফেলতাম, কিন্তু ঈশ্বরী পরাজিত হয়েও মুচকি হাসত। তাকে কখনও রেগে যেতে দেখিনি। সম্ভবত সে নিজের যুক্তির দুর্বলতা বুঝত।

ঈশ্বরী চাকরদের সঙ্গে উদ্ধত ভাবে কথা বলত, ধনীদের মধ্যে যা হয়। চাকর যদি বিছানা গোছাতে একটু দেরি করত, দুধ বেশি গরম বা ঠান্ডা হতো, অথবা সাইকেল ঠিকমতো পরিষ্কার না হতো, তা হলে সে রেগে আগুন হয়ে যেত। কিন্তু বন্ধুদের, বিশেষ করে আমার সঙ্গে, তার ব্যবহার ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ ও নম্র।

এবার দশেরার ছুটিতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বাড়ি যাব না। ভাড়ার জন্য টাকা ছিল না, আর বাড়ির লোকেদের কষ্ট দিতে চাইনি। আমি জানতাম, তারা আমাকে যা দেয়, তা তাদের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি। তা ছাড়া, পরীক্ষার প্রস্তুতিও ছিল। বোর্ডিং হাউসে ভূতের মতো একা পড়ে থাকতে মন চায়নি। তাই যখন ঈশ্বরী আমাকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাল, আমি বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে গেলাম। পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো ভাবেই হবে। সে ধনী হলেও পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান।

বলল, ‘ভাই, একটা কথা, ওখানে গিয়ে জমিদারদের নিন্দে করিস না। বাড়ির লোকেরা বিরক্ত হবে। তারা প্রজাদের এই বিশ্বাসে শাসন করে যে, ঈশ্বর তাদের প্রজাদের সেবার জন্য সৃষ্টি করেছেন। প্রজারাও তা-ই ভাবে। যদি বোঝানো হয় জমিদার আর প্রজার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নেই, জমিদারি ব্যবস্থা ভেঙে যাবে।’

বললাম, ‘ভাবছ, আমি ওখানে গিয়ে অন্য মানুষ হয়ে যাব?’

‘হ্যাঁ, আমি তা-ই মনে করি।’

‘ভুল ভাবছ।’

সে কিছু বলল না। সম্ভবত বিষয়টি আমার বিবেকের উপর ছেড়ে দিলো। আমি কখনও সেকেন্ড ক্লাসে, এমনকী ইন্টার ক্লাসেও চড়িনি। ঈশ্বরীর সঙ্গে সে সৌভাগ্য হলো। ট্রেন রাত ৯টায় ছিল, কিন্তু ভ্রমণের উত্তেজনায় আমরা সন্ধ্যায় স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। কিছু ক্ষণ ঘোরাঘুরির পর রিফ্রেশমেন্ট রুমে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করলাম। আমার পোশাক আর চালচলন দেখে খানসামারা সহজেই বুঝে গেল, কে মালিক আর কে পিছু-পিছু। সম্ভবত আমার বাবার মাইনের চেয়েও বেশি টাকা এই খানসামারা বখশিস হিসেবে পায়। ঈশ্বরী আট আনা বকশিস দিল তাদের।

ট্রেন এল, উঠলাম। তারা ঈশ্বরীকে সালাম করল, আমার দিকে ফিরে তাকালও না। সে বলল, ‘কী ভদ্র এরা! আমাদের চাকরদের কোনও কাজের ধরন নেই।’

বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘তুমি যদি তোমার চাকরদেরও প্রতিদিন আট আনা বখশিস দাও, তা হলে তারা এদের চেয়েও ভদ্র হয়ে যাবে।’

ঈশ্বরী বলল, ‘তুমি কি মনে করো, শুধু বখশিসের লোভে ভদ্র?’

বললাম, ‘না না— ভদ্রতা আর শিষ্টাচার তো এদের রক্তে মিশে গেছে!’

ট্রেন ছাড়ল। মেল ট্রেন। প্রয়াগ ছেড়ে প্রতাপগড়ে থামল। একজন যাত্রী আমাদের কামরার দরজা খুলল। আমি তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে উঠলাম, ‘এটা সেকেন্ড ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস!’

আমার দিকে সে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আমি জানি।’ তার পর মাঝের বার্থে বসল।

ভোরে মোরাদাবাদ পৌঁছলাম। স্টেশনে কয়েকজন আমাদের নিতে এসেছিল। দু’জন ভদ্রলোক ছিলেন— এক মুসলিম, রিয়াসত আলি, আর এক ব্রাহ্মণ, রামহরখ। পাঁচজন আমাদের মালপত্র বইল। সবাই যেন আমার দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘তুমি কাক হয়ে হাঁসের সঙ্গে কী ভাবে এলে?’

রিয়াসত আলি ঈশ্বরীকে জিজ্ঞেস করল, ‘একসঙ্গে পড়েন?’

ঈশ্বরী বলল, ‘হ্যাঁ, একসঙ্গে পড়ি, থাকি। বলতে পারো, এঁর জন্যই আমি এখনও এলাহাবাদে, না হলে লখনৌ চলে যেতাম।’ দু’জনেই অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল। রিয়াসত সন্দেহের সুরে বলল, ‘কিন্তু উনি তো খুব সাধারণ।’

ঈশ্বরী বলল, ‘মহাত্মা গান্ধীর ভক্ত। খদ্দর ছাড়া কিছুই পরেন না। বলতে পারো, রাজা। বছরে আড়াই লাখ টাকার জমিদারি, কিন্তু চেহারা দেখে মনে হয়, অনাথ আশ্রম থেকে এসেছেন।’

রামহরখ বললেন, ‘ধনীদের মধ্যে এমন খুব কম দেখা যায়।’

রিয়াসত বলল, ‘মহারাজা চাংলি-কে দেখলে আপনি দাঁতের নীচে আঙুল দিতেন। তিনি একটা মোটা কোট আর চামড়ার জুতো পরে বাজারে ঘুরতেন। একবার পাগল ভেবে ধরা পড়েছিলেন, অথচ তিনিই দশ লাখ টাকা দিয়ে কলেজ খুলেছিলেন।’

আমি মনে মনে লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম।

ছেলেবেলায় কয়েকবার খোঁড়া ঘোড়ায় চড়েছি। এখানে দেখলাম, দুটো সুন্দর ঘোড়া আমাদের জন্য প্রস্তুত। আমার তো ভয়ে প্রাণ বেরিয়ে গেল।

ঈশ্বরীর বাড়ি কোনও বাড়ি নয়, যেন দুর্গ। ইমামবড়ার মতো ফটক, দরজায় প্রহরী টহল দিচ্ছে, চাকরদের কোনও হিসেব নেই, একটা হাতি বাঁধা। ঈশ্বরী আমাকে তার বাবা, কাকা, জ্যাঠাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো— সেই অতি-রঞ্জিত বর্ণনা-সহ। কেউ কেউ আমাকে ‘হুজুর’ বলে ডাকতে লাগল।

একা পেয়ে আমি ঈশ্বরীকে বললাম, ‘তুমি বড় শয়তান, আমার মান-ইজ্জত কেন নষ্ট করছ?’

ঈশ্বরী হেসে বলল, ‘এই গাধাগুলোর জন্য এটা দরকার ছিল, নইলে তোমার সঙ্গে কথাও বলত না।’

কিছু ক্ষণ পর নাপিত এল আমাদের পা টিপে দিতে। ঈশ্বরী আমার দিকে ইশারা করে বলল, ‘আগে কুঁড়ো সাহেবের পা টিপে দে।’ আমি এ সবকে ধনীদের ফ্যাশন, জমিদারদের বোকামি বলে ঈশ্বরীর সঙ্গে ঠাট্টা করতাম। আর আজ আমি নিজেই সেই ধনী কুঁড়ো সেজে বসে আছি।

রাত ১০টা। ভেতর থেকে খাবারের ডাক এল। আমরা চান করলাম। সব সময়ে নিজের ধুতি নিজে ধুয়ে ফেলি, কিন্তু এখানে তা করলাম না।

ভেবেছিলাম, গ্রামে গিয়ে একমনে পড়াশোনা করব, কিন্তু সারা দিন সেখানে ঘোরাঘুরি আর আমোদ-প্রমোদেই কেটে গেল। কখনও নদীতে নৌকায় চড়ে বেড়াই, কখনও মাছ বা পাখি শিকার করি, কখনও মল্লযুদ্ধ দেখি, কখনও দাবা খেলায় মেতে থাকি। ঈশ্বরী প্রচুর ডিম আনত, আর ঘরে স্টোভে অমলেট তৈরি হতো। চাকরদের একটা দল সব সময়ে আমাদের ঘিরে থাকত। হাত-পা নাড়ার কোনও দরকার ছিল না, শুধু মুখ চালালেই চলত। আমি মহাত্মা গান্ধীর কুঁড়ো চেলা হিসেবে বিখ্যাত হলাম।

একদিন সত্যিই এমন ঘটল। ঈশ্বরী বাড়িতেই ছিল, সম্ভবত তার মায়ের সঙ্গে কথা বলছিল। এ দিকে রাত ১০টা বেজে গেল। আমার চোখ ঘুমে ঢুলছে, কিন্তু বিছানা পাতব কী ভাবে? আমি তো কুঁড়ো। সাড়ে ১১টায় একজন চাকর এল। বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকায় আমার বিছানা পাতার কথা মনেই ছিল না তার। এখন মনে পড়তেই ছুটে এসেছে। আমি তাকে এমন বকাঝকা করলাম, সে বোধ হয় জীবনে ভুলবে না।

ঈশ্বরী আমার বকুনি শুনে বাইরে এসে বলল, ‘খুব ভালো করেছ। এই হারামজাদারা এমন ব্যবহারেরই যোগ্য।’

একদিন ঈশ্বরী এক জায়গায় ভোজে গিয়েছিল। সন্ধ্যা হয়ে গেল, কিন্তু ল্যাম্প টেবিলে পড়ে রইল। দেশলাই ছিল, কিন্তু ঈশ্বরী কখনও নিজে ল্যাম্প জ্বালায় না। তা হলে কুঁড়ো সাহেব কী ভাবে জ্বালাবেন? আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম। হঠাৎ মুহূর্তে রিয়াসত আলি এসে পড়লেন। আমি তাকেই ধমক দিলাম, ‘তোমাদের এতটুকু ফিকির নেই যে ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দাও! জানি না, এমন অলস লোকেরা এখানে কী ভাবে চলে।’ রিয়াসত আলি কাঁপতে কাঁপতে ল্যাম্প জ্বালালেন।

একজন ঠাকুর প্রায়ই আসতেন। অদ্ভুত মানুষ, মহাত্মা গান্ধীর পরম ভক্ত। আমাকে গান্ধীজির চেলা ভেবে খুব সম্মান করতেন, কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতে সঙ্কোচ করতেন। একদিন আমাকে একা পেয়ে এসে হাত জোড় করে বললেন, ‘সবাই বলে, এখানে স্বরাজ হলে নাকি জমিদারেরা থাকবে না।’

গম্ভীর মুখে বললাম, ‘জমিদারদের থাকার দরকারই বা কী? এরা গরিবদের রক্ত চোষা ছাড়া আর কী করে?’

‘তা হলে কি জমিদারের জমি কেড়ে নেওয়া হবে?’

আমি বললাম, ‘অনেকে তো খুশি মনে দিয়ে দেবে। যারা খুশি মনে না দেবে, তাদের জমি কেড়ে নিতেই হবে। আমি তো প্রস্তুত হয়ে বসে আছি। স্বরাজ হলেই আমার এলাকা প্রজাদের নামে হস্তান্তর করে দেব।’

আমি চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসেছিলাম। ঠাকুর আমার পা টিপতে লাগল। তার পর বলল, ‘আজকাল জমিদারেরা খুব অত্যাচার করে! আমাকেও, হুজুর, আপনার এলাকায় একটু জমি দিন, আমি সেখানে গিয়ে আপনার সেবা করব।’

আমি বললাম, ‘এখনও আমার কোনও ক্ষমতা নেই, ভাই। কিন্তু যেই ক্ষমতা পাব, প্রথমে তোমাকে ডাকব। তোমাকে মোটর ড্রাইভিং শিখিয়ে আমার ড্রাইভার বানাব।’

শুনেছি, সে দিন ঠাকুর খুব ভাং খেয়েছিল, তার স্ত্রীকে খুব মেরেছিল, আর গ্রামের মহাজনের সঙ্গে ঝগড়া করতেও প্রস্তুত হয়ে গেছিল।

ছুটি এ ভাবে শেষ হলো, আমরা প্রয়াগ ফিরলাম। গ্রামের অনেকে আমাদের পৌঁছে দিতে এল। ঠাকুর তো স্টেশন পর্যন্ত এল। আমিও আমার ভূমিকা খুব সুন্দর ভাবে পালন করলাম, আমার কুঁড়ো-সুলভ নম্রতা ও দেবত্ব প্রতিটি হৃদয়ে ছাপ ফেলল। ফিরতি টিকিট ছিল, শুধু ট্রেনে উঠতে হলো। কিন্তু ট্রেন এল, দেখি তিল ধরার জায়গা নেই। দুর্গাপূজার ছুটির শেষে সবাই ফিরছে। সেকেন্ড ক্লাসে জায়গা নেই, ইন্টার ক্লাসের অবস্থা আরও খারাপ। এটা ছিল শেষ ট্রেন। কোনও মতে থার্ড ক্লাসে জায়গা পেলাম।

কয়েকজন পড়াশোনা করা লোকও ছিল। তারা ইংরেজ শাসনের প্রশংসা করছিল। একজন বললেন, ‘এমন ন্যায়বিচার অন্য কোনও শাসনে দেখা যায় না। ছোট-বড় সবাই সমান। রাজাও অন্যায় করলে আদালত তার গলা টিপে দেয়।’

আর একজন বললেন, ‘আরে সাহেব, আপনি চাইলে সম্রাটের বিরুদ্ধেও মামলা করতে পারেন। আদালতে সম্রাটের বিরুদ্ধেও রায় হয়।’

একজন লোক, যার পিঠে বড় একটা বোঝা বাঁধা ছিল, কলকাতায় যাচ্ছিল। বোঝা রাখার জায়গা না পেয়ে পিঠেই বেঁধে রেখেছিল। আমি দরজার পাশে বসেছিলাম। বারবার সে দরজার কাছে আসছিল। আমি কিছু ক্ষণ ধৈর্য ধরে রইলাম। হঠাৎ আমার রাগ হলো। তাকে ধাক্কা দিয়ে পিছনে সরিয়ে দুটো জোরে থাপ্পড় মারলাম।

সে চোখ বড় করে বলল, ‘কেন মারছেন বাবুজি, আমিও তো ভাড়া দিয়েছি!’

আমি উঠে আরও দু’-তিনটে থাপ্পড় মারলাম।

ট্রেনে তুমুল হইচই শুরু হলো। চারদিক থেকে আমার উপর আক্রমণ শুরু হলো।

‘যদি এত নাজুক মেজাজ, তা হলে ফার্স্ট ক্লাসে বসেননি কেন?’

‘বড়লোক হলে নিজের বাড়িতে হন। আমাকে এ ভাবে মারলে দেখিয়ে দিতাম।’

‘বেচারা কী দোষ করেছে? ট্রেনে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই, দরজার কাছে একটু হাওয়ার জন্য গেছিল, তাতে এত রাগ?’

ঈশ্বরী ইংরেজিতে বলল, ‘হোয়াট অ্যান ইডিয়ট ইউ আর, বীর!’

আমার নেশা তখন ক্রমশ কেটে যাচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *