শিল্পে বসতে লক্ষ্মী, বা ঋণ কমানোর সহজ উপায়
আগেই বলেছি, একটা সরকার ধার না করে চলতে পারে না, কারণ বাজেটে কিছু ঘাটতি থাকে। কিন্তু দেখতে হবে, ধার করে সরকার সেই টাকা কোথায় খরচ করছে। সেই টাকা কি রাজস্ব বাড়ানোর জন্যে খরচ হচ্ছে (যেমন, পরিকাঠামো বৃদ্ধিতে খরচ), না কি অনেকটাই ভোগ ব্যয়ের (বা রাজস্ব ব্যয়ের) জন্য খরচ হচ্ছে (যেমন, বেতন, পেনশন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনিক ব্যয়, ভাতা, ভর্তুকি, ধারের সুদ মেটানো ইত্যাদি)। যদি রাজস্ব বাড়ানোর জন্যে খরচ হয় তবে সে ঋণ ভালো, যদি ভোগের জন্যে খরচ হয় তবে সেই খারাপ ঋণ প্রতি বছর আর্থিক দেনার বোঝা বাড়াবে এবং রাজ্যটি ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়বে। রাজস্ব ব্যয়ের টাকা রাজস্ব আদায় করে তুলতে হবে, ধারের মাধ্যমে নয়।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। দু’জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে ব্যাঙ্ক থেকে আলাদা আলাদা ভাবে ঋণ নিল। সেই টাকা দিয়ে একজন উৎপাদন বাড়ানোর জন্যে একটা উন্নত মানের মেশিন কিনল। দ্বিতীয় জন কাঁচা টাকা হাতে পেয়ে প্রথমেই নিজের জন্য একটা বাইক এবং স্ত্রীর জন্য কিছু গয়না কিনল এবং ধারের বাকি অংশটুকু ব্যবসায় লগ্নি করল। দ্বিতীয় জন ঋণের টাকায় আয় বাড়াতে ততটা সক্ষম হবে না এবং সে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়বে। প্রথম জন ঋণের টাকায় আয় বাড়িয়ে তরতর করে এগিয়ে যাবে।
এ ব্যাপারে ভারতের রাজ্যগুলি কে কী করছে? তারা কি ঋণের টাকা পরিকাঠামোয় (মূলধনী খাতে) খরচ করছে, নাকি ভোগে (রাজস্ব খাতে)? পরিকাঠামোয় খরচ করলে সেটা ব্যবসা-বাণিজ্যকে চাঙ্গা করে। তাতে জিএসডিপি এবং রাজস্ব দুইই বাড়ে। যেমন, রাস্তাঘাট, বাঁধ, সেচ ব্যবস্থা, বন্দর, জল সরবরাহ, নিকাশি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্কুল, হাসপাতাল ইত্যাদি যত বাড়বে, ততই অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাবে (যার ফলে জিএসডিপি বাড়বে এবং বেকারত্ব কমবে) এবং তাতে রাজস্বও বাড়বে। এই কারণে রাজ্যগুলি ধারের টাকা কোন খাতে খরচ করছে, মূলধনী খাতে, না কি রাজস্ব খাতে, তা দেখা দরকার।
এটা জানতে এবার রাজ্যগুলির রাজকোষ ঘাটতির দিকে তাকাতে হবে। আগেই বলেছি যে, সেই সব রাজ্যের ঋণ বেশি হয় যাদের রাজকোষ ঘাটতি বেশি। কারণ ঘাটতি মেটাতে ঋণ নিতে হয়। ২০২৫-২৬’এ ঘাটতির পরিমাণ যাদের খুব বেশি, তারা হলো মহারাষ্ট্র (১ লক্ষ ৩৬ হাজার কোটি টাকা), তামিলনাড়ু (১ লক্ষ ৭ হাজার কোটি টাকা), উত্তরপ্রদেশ (৯১ হাজার কোটি টাকা) এবং কর্নাটক (৯০ হাজার কোটি টাকা)। আগেই দেখেছি যে, এই রাজ্যগুলির প্রচুর ঋণ। অন্য দিকে, পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গের রাজকোষ ঘাটতি তুলনামূলক ভাবে অনেক কম— যথাক্রমে, ৩৪ হাজার কোটি টাকা এবং ৭৩ হাজার কোটি টাকা। মজার বিষয় হচ্ছে, পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গের রাজকোষ ঘাটতি তথা ঋণ তুলনামূলক ভাবে উপর্যুক্ত অন্য চারটি রাজ্যের চেয়ে অনেক কম হলেও, তাদের জিএসডিপি-তে ঋণের ভাগ অন্যদের চেয়ে অনেকটা বেশি। এটাও দেখেছি যে, পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গের জিএসডিপি অপেক্ষাকৃত কম বলে এমনটা হচ্ছে। তা হলে একটা প্রশ্ন ওঠে, ধারের টাকা সঠিক খাতে খরচ হচ্ছে না বলেই কি এটা ঘটছে? অর্থাৎ, পরিকাঠামোয় খরচ (মূলধনী ব্যয়) কম করে, রাজস্ব ব্যয়ে বেশি খরচ হচ্ছে? অন্য ভাবে বললে, রাজ্য কি ধার নিচ্ছে পরিকাঠামোর জন্য, না কি রাজস্ব ব্যয় বা ভোগব্যয়ের জন্য?