‘হিংসা বরদাস্ত নয়’, স্পষ্ট বার্তা শমীকের, গান্ধীগিরি সজলদের
এই সময়: বাংলায় পদ্ম ফোটার পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দিল্লি থেকে বার্তা দিয়েছেন— ‘বদলা নয়, বদল হবে’। প্রধানমন্ত্রীর সেই বার্তা মাথায় রেখে ভোট-পরবর্তী হিংসা রুখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসন পেয়ে বিজেপি দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবর আসতে শুরু করে। সেই প্রেক্ষিতে সোমবার রাত থেকেই পদক্ষেপ শুরু করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার–সহ বিধানসভা ভোটে জয়ী একাধিক পদ্ম–প্রার্থী। দলীয় কর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, তৃণমূলের কায়দায় সন্ত্রাস করলে দল থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হবে।
মঙ্গলবার কালীঘাটে সাংবাদিক বৈঠকে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে সরব হন। তিনি বলেন,‘ওরা আমাদের সব পার্টি অফিস দখল করে নিয়েছে। সোমবার তৃণমূল ভবনও দখল করার চেষ্টা করেছিল। অভিষেকের অফিসে ইট–ঢিল ছোড়া হয়েছে। আমাদের কিন্তু যথেষ্ট সংখ্যায় বিধায়ক রয়েছে। এই ভাবে অত্যাচার করতে পারবেন না। এই ভাবে যদি অত্যাচার করেন, তা হলে যে দিন আপনারা কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকবেন না সে দিন একই ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে।’ মমতা দাবি করেন, ‘প্রথম যখন জিতেছিলাম সিপিএমের একটা পার্টি অফিসে হাত দিইনি, কোনও অত্যাচার করিনি।’ রাজ্যে ভোটের কাজে এসে এখনও থেকে যাওয়া আধাসামরিক বাহিনী গুন্ডাদের বাহিনী কি না—সে প্রশ্নও তোলেন তৃণমূলনেত্রী।
কালীঘাটের দপ্তর থেকে বেরোনোর সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ‘বীরভূমের নানুর ও কলকাতার বেলেঘাটায় আমাদের কর্মীদের খুন করা হয়েছে। ভয় আউট ভরসা ইন— এই স্লোগান দিয়ে যারা এসেছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেখা যাচ্ছে ৩০০–৪০০ পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। দেড়শোর মতো প্রার্থীর বাড়িতে ঢুকে হামলা হয়েছে। এটাই বিজেপির ভরসার মডেল!’ দলের কর্মীদের প্রতি অভিষেকের বার্তা, ‘তৃণমূলের সৈনিকরা শক্ত থাকুন। দল পাশে রয়েছে। যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন সেখানে যাব। এ কারণে ১২ সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনটি পৃথক টিম হয়েছে। চার জন করে সদস্য রয়েছেন। এই টিম বৃহস্পতিবার থেকে সফর শুরু করবে।’
মমতা–অভিষেকের অভিযোগের আগেই অবশ্য রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলের কর্মীদের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিজেপির পতাকা হাতে নিয়ে যদি কেউ কোনও তৃণমূল কার্যালয়ে হামলা চালায় বা তৃণমূলকর্মীদের গায়ে হাত দেয়, তবে তাকে তৎক্ষণাৎ দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’ এমনকী বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর পরিবার নিয়ে কদর্য ভাষা ব্যবহার করলেও রেয়াত করা হবে না, শৃঙ্খলাভঙ্গে বিজেপি পাশে দাঁড়াবে না বলে বার্তা দিয়েছেন শমীক। একই সুর শোনা গিয়েছে প্রাক্তন রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের গলাতেও। তিনি বলেন, ‘তৃণমূলকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন তাদের আচরণের জন্যে। আমরা তৃণমূল হতে চাই না। আমাদের কর্মীরা গত কয়েক বছরে অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু এখন সময় ধৈর্য ধরার। আইন নিজের হাতে নেবেন না, পুলিশকে কাজ করতে দিন।’
বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের কড়া বার্তার প্রভাব দেখা গিয়ে কলকাতা এবং জেলায়। সোমবার ভোটের ফলপ্রকাশ হতেই বরাহনগরে একাধিক অফিস দখলের অভিযোগ তোলে তৃণমূল। ওই কেন্দ্রের জয়ী বিজেপি প্রার্থী সজল ঘোষ বলেন, ‘বিজেপি জেতার পরে কিছু লোক কপালে গেরুয়া তিলক কেটে এলাকায় শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করেছে। এরা বিজেপির লোক নয়। বন্ধ করে দেওয়া তৃণমূলের অন্তত ১২টা অফিস খুলে দিয়েছি।’ একই পথে হেঁটেছেন দমদমের বিজেপির জয়ী প্রার্থী অরিজিৎ বক্সীও। এলাকার কাউকে হুমকি দেওয়া হলে বা বিশৃঙ্খলা হলে সরাসরি যাতে তাঁর সঙ্গে লোকে যোগাযোগ করতে পারেন, সে জন্যে হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছেন রাজারহাট–গোপালপুরের নির্বাচিত বিজেপি প্রার্থী তরুণজ্যোতি তেওয়ারি।
বীরভূমের সিউড়িতে জয়ী বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুরের খবর পেয়ে সেখানে যান এবং বিজেপি–কর্মীদের দিয়ে দলীয় পতাকা খুলিয়ে দেন। এক সংখ্যালঘু পরিবার আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে তাঁদের বাড়িতেও যান জগন্নাথ, হাতজোড় করে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, ‘আমরা তৃণমূল নই যে তাণ্ডব করব। আমি পুলিশ সুপারকে বলেছি কড়া ব্যবস্থা নিতে।’ ঝাড়গ্রামে বিজেপির বিজয়ী প্রার্থী লক্ষ্মীকান্ত সাউ পুরসভার গেটে ঝোলানো তালা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খুলিয়ে দেন। কর্মীদের মিষ্টিমুখ করিয়ে তিনি বলেন, ‘পুরসভার দুর্নীতি নিয়ে লড়াই চলবে ঠিকই, কিন্তু নাগরিক পরিষেবা বন্ধ করা বা নিরীহ মানুষের গায়ে হাত তোলা বিজেপির সংস্কৃতি নয়।’ আবার পূর্ব বর্ধমানের ভাতার এলাকায় হ্যান্ডমাইক নিয়ে টোটোয় চড়ে শান্তির বার্তা প্রচার করেন বিজেপির বিজয়ী প্রার্থী সৌমেন কার্ফা। পশ্চিম মেদিনীপুরের বিজেপি নেতৃত্বও স্পষ্ট করেছেন, যারা গোলমাল করছে তারা ‘সুবিধাবাদী’ এবং ‘নব্য বিজেপি’, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপে পূর্ণ সমর্থন জানাবে দল।
২০২১–এর বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসার স্মৃতি এখনও বাংলার জনমানসে টাটকা। সেই সময়ে বিজেপি বার বার অভিযোগ করেছিল, শাসকদলের অত্যাচারে তাদের হাজার হাজার কর্মী ঘর ছাড়া হয়েছেন। বেশ কয়েক জন নিহতও হন। ২০২৬-এ ক্ষমতা পরিবর্তনের পরে বিজেপি নেতৃত্ব প্রমাণ করতে চাইছেন, তাঁরা প্রকৃতই ‘পরিবর্তন’ আনতে বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রীর বদলের মন্ত্রকে হাতিয়ার করে দলীয় কর্মীদের সংযত রাখার প্রয়াস বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে কি না, তা অবশ্য সময়ই বলবে।