পাশা উল্টে যেতেই দলের মুণ্ডপাত তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ নেতাদের
এই সময়: কেউ ছিলেন বিধায়ক, কেউ মন্ত্রী। কেউ দলের জন্মলগ্ন থেকে নেত্রীর ছায়াসঙ্গী ছিলেন। কিন্তু এবার বিধানসভা ভোটে তাঁদের টিকিট মেলেনি। ফলে গোসা করে ঘরে বসেছিলেন। ভোট ময়দানে তাঁরা সে ভাবে গা ঘামাননি। যদিও কেউই দলের বিরোধিতা করেননি। কিন্তু তৃণমূল ক্ষমতাচ্যুত হতেই এই সব ‘বিক্ষুব্ধ’রা একেবারে নখ-দাঁত বের করে দলের বিরুদ্ধে আক্রমণে নামলেন। অবশ্য দল ছাড়ার কথা কেউই বলেননি।
এই তালিকায় সবার উপরে থাকবেন প্রাক্তন মন্ত্রী কোচবিহারের ডাকসাইটে নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। তিনি কোচবিহার পুরসভার চেয়ারম্যানও ছিলেন। যদিও একপ্রকার জোর করে তাঁকে সেই পদ থেকে পদত্যাগ করানো হয়। এদিন ফল প্রকাশের পরেই নিজের বাড়িতে সাংবাদিক বৈঠক করে রবি বলেন, ‘জেলার কয়েকজন নেতার ঔদ্ধত্য এবং অহঙ্কারই ভরাডুবির কারণ। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে দলকে হাইজ্যাক করেছিল অন্য দল থেকে আসা লোকজন। আর তার জন্যই এই অবস্থা।’ এদিন কোনও রাখঢাক না করে তিনি বলেন, ‘বাবা-মা মারা যাওয়ার পরে যেমন কষ্ট পেয়েছিলাম, তার চাইতেও বেশি কষ্ট পেয়েছি ষড়যন্ত্র করে টিকিট কেটে দেওয়ার পর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক কষ্ট করে দলকে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু মানুষ স্বার্থ নিয়ে দলে আসে। দলকে তাঁরা হাইজ্যাক করে ফেলেছিল। দল সমাজবিরোধীদের হাতে চলে গিয়েছিল। আর তার ফলেই এই রেজাল্ট হয়েছে।’ নিজের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে অবশ্য খোলসা করে কিছু বলতে চাননি এই প্রবীণ নেতা। তিনি শুধু বলেন, ‘কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেব।’
তিনি হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক ছিলেন। পাশাপাশি রাজ্যের বস্ত্র ও সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরে রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তাঁকে টিকিট না দিয়ে এবার এই কেন্দ্রে নতুন মুখ আনা হয় মতিবুর রহমানকে। তিনি জিতলেও মালদায় সার্বিক ভাবে গত বিধানসভা নির্বাচন থেকে তৃণমূলের ফল খারাপ হয়েছে। গোটা রাজ্যে তৃণমূলের ভরাডুবি নিয়ে তাজমুল বলেন, ‘ভোটের ফলাফল দেখে মনে হচ্ছে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। প্রার্থী নিয়ে অনেক টানাপোড়েন চলেছে। এর বেশি আর কিছু বলতে পারব না।’ আগামীতে কী করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিদায়ী মন্ত্রীর জবাব, ‘সেটা ভাবনা চিন্তা করে দেখব।’ আলিপুরদুয়ার থেকে এবারও খালি হাতে ফিরতে হলো গেরুয়া বাহিনীকে। পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রেই বিজেপির কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে তৃণমূল। এই হারের পরেই দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী। সোমবার তৃণমূলের ভরাডুবির পর তিনি ‘এই সময়’ কে বলেন, ‘এটা তো প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ যে ভাবে দলের পুরোনো নেতা-কর্মীদের অবহেলা করা হয়েছে, তাতে সাধারণ দলীয় সমর্থকরা অত্যন্ত হতাশ ও বিরক্ত হয়েছিলেন। আমি চাই দল সব কিছুর বিশ্লেষণ করুক।’
গত বিধানসভা নির্বাচনে আলিপুরদুয়ারে বিজেপি প্রার্থী সুমন কাঞ্জিলালের কাছে পরাজিত হন সৌরভ। জিতেই তৃণমূলে নাম লেখান সুমন। তাঁকে গুরুত্ব দেওয়া হতে থাকে। জেলায় ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন সৌরভ। এ বার টিকিট চেয়েও পাননি। তাই দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভপুষে রেখেছিলেন। ফল প্রকাশের পর তা উগড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে কংগ্রেস ছেড়ে দিদির হাত ধরেছিলাম। ২০১৬-তে জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার মিলিয়ে ১৬টি আসন দলকে উপহার দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরেও আমাকে পিছন থেকে ছুরি মারা হয়েছে। কাউকে অবজ্ঞা করলে তার ফল যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, সেটাই আজ প্রমাণিত হলো।’
টিকিট পাননি রাজগঞ্জের বিদায়ী বিধায়ক খগেশ্বর রায়। অথচ, বাম জমানা থেকে তিনি এই কেন্দ্রের বিধায়ক। এবার রাজগঞ্জে টিকিট দেওয়া হয় এশিয়াডে সোনা জয়ী অ্যাথেলিট স্বপ্না বর্মনকে। প্রার্থী হতে না পেরে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন খগেশ্বর। পরে মমতার ফোন পেয়ে স্বপ্নার হয়ে গা ঘামান। এদিন হারের পরে তিনি বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই এই অবস্থা। দলের এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেননি, যার জন্য এই ফল।’