Satyajit Ray’s Birthday: ফেলুদাকে নিয়ে সত্যজিতের ভ্রমণ, কাশ্মীর থেকে রাজস্থান জমজমাট – Bengali News | Satyajit ray locations cinematic journey
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের ফ্রেম কিংবা উপন্যাসের পাতা—সবখানেই স্থান বা ‘লোকেশন’ কেবল পটভূমি হিসেবে নয়, বরং এক একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাঁর পুত্র সন্দীপ রায় এক সাক্ষাৎকারে যথার্থই বলেছিলেন যে, সত্যজিৎ যেখানে যেখানে গিয়েছেন, তাঁর অমর সৃষ্টি ফেলুদাও ঠিক সেই পথেই হেঁটেছেন। এই ভ্রমণ পিপাসু মনই ছিল তাঁর সৃজনশীলতার অন্যতম চালিকাশক্তি।
ফিল্ম সমালোচকদের মতে, সত্যজিৎ কোনো চরিত্র কল্পনা করার সময় সেই নির্দিষ্ট স্থানের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত আচরণের ওপর ভিত্তি করেই তাকে রূপ দিতেন। ‘পথের পাঁচালী’র সেই বিখ্যাত কাশফুলের বন এবং রেলগাড়ি দেখার দৃশ্যটি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে গ্রাম্য প্রকৃতি আর যান্ত্রিক রেলগাড়িই যেন মূল হয়ে উঠেছিল, আর অপু-দুর্গা কেবল সেই দৃশ্যপটকে অনুসরণ করেছিল। মহানগরীর যান্ত্রিকতা হোক কিংবা নিশ্চিন্দিপুরের মেঠো পথ—সত্যজিতের নখদর্পণে থাকা প্রতিটি স্থানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাই চরিত্রগুলোকে রক্ত-মাংসের রূপ দিত।
ফেলুদার রহস্য রোমাঞ্চকে গবেষকরা দুটি ভাগে দেখেন। এক, যেখানে ফেলুদা সচেতনভাবে রহস্য সমাধানের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছন। দুই, যেখানে ফেলুদা কেবল ছুটি কাটাতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে কোনো অঘটনের জালে জড়িয়ে পড়েন।
বেনারস ছাড়া ‘জয় বাবা ফেলুদা’, রাজস্থান ছাড়া ‘সোনার কেল্লা’ কিংবা লখনউয়ের ভুল ভুলাইয়া ছাড়া ‘বাদশাহী আংটি’র কথা ভাবাই অসম্ভব। এই প্রতিটি জায়গাকে সত্যজিৎ এতটাই নিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন যে, অনেক সময় তা মূল রহস্যের চেয়েও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এবং গল্পের গতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
সত্যজিতের মুন্সিয়ানা ছিল দেখার চোখের ভিন্নতায়। সন্দীপ রায়ের বয়ানে উঠে আসে যে, ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এ জয়সলমীরের যে কেল্লাকে ‘হাল্লা রাজার কেল্লা’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেই একই কেল্লাই আবার ‘সোনার কেল্লা’য় ভিন্ন রূপে ধরা দিয়েছে। সাধারণ দর্শকের পক্ষে ধরাও সম্ভব ছিল না যে একই স্থাপত্যকে কীভাবে দুটি ভিন্ন মেজাজের গল্পে ব্যবহার করা হয়েছে।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘ভয়ঙ্কর ভূস্বর্গ’ গল্পটিতে কাশ্মীর এক অনন্য রূপ পায়। মজার বিষয় হলো, জীবনের শেষলগ্নে বসে এই গল্পটি যখন তিনি লিখছেন, তখন তাঁর অবলম্বন ছিল কেবল ছোটবেলার স্মৃতি আর সেই পুরোনো ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। শৈশবে ‘বয়েজ ওন পেপার’ ম্যাগাজিনে তাঁর পাঠানো কাশ্মীরের ছবিগুলো যেমন পুরস্কার জিতেছিল, তেমনি সেই কিশোরবেলার চোখের দেখাই পরবর্তীকালে তাঁর লেখনীতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
পরিশেষে বলা যায়, সত্যজিৎ রায়ের কাছে ভ্রমণ মানে কেবল দেখা নয়, বরং কোনো এক বিশেষ স্থানের সঙ্গে চরিত্রের দ্বন্দ্ব কিংবা সখ্যতাকে ফ্রেমবন্দি করা। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি যেন এক একটি মানচিত্র, যেখানে পাঠক বা দর্শক অনায়াসে হারিয়ে যেতে পারেন কোনো এক চেনা বা অচেনা জনপদে।