আইএসএল রেফারিং বিতর্কে মুখ খুললেন প্রাঞ্জল, বাংলার সংকট নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য
ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের বিতর্ক, VAR থেকে বাংলায় রেফারি কমে যাওয়া, সব ইস্যুতে সরাসরি মত দিলেন ফিফা প্যানেলের রেফারি প্রাঞ্জল ব্যানার্জি।
বিট্টু দত্ত, কলকাতা: ইস্টবেঙ্গল-বেঙ্গালুরু ম্যাচের বিতর্ক, মিগুয়েলের লাল কার্ড, আইএসএল এ রেফারিংয়ের মান, বৈষম্যমূলক মন্তব্যের অভিযোগ এবং বাংলা থেকে রেফারি কমে যাওয়ার কারণ, ভারতীয় ফুটবলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলামেলা মত জানালেন বাংলা থেকে ফিফার প্যানেলের একমাত্র রেফারি প্রাঞ্জল ব্যানার্জি।
প্রশ্ন ১: বর্তমানে আইএসএলের রেফারিংয়ের মান আপনি কীভাবে দেখছেন?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জি: সত্যি বলতে কী, আইএসএলের রেফারিং অনেকটা পথ এগিয়েছে। প্রথম দিকের সঙ্গে এখনকার তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়। এখন ম্যাচের গতি অনেক বেশি, খেলোয়াড়রা দ্রুত, কোচদের পরিকল্পনাও অনেক আধুনিক। ফলে রেফারিদেরও সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। আমি দেখছি, এখন ফিটনেসের ওপর অনেক জোর দেওয়া হচ্ছে, ম্যাচের আগে প্রস্তুতিও অনেক পেশাদারভাবে হচ্ছে। তবে এটাও মানতে হবে, এখনও উন্নতির জায়গা আছে। বিশেষ করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ধারাবাহিকতা দরকার। একই ধরনের ঘটনায় এক ম্যাচে একরকম, আরেক ম্যাচে অন্যরকম হলে বিতর্ক হবেই। দর্শক এখন অনেক সচেতন, তারা সব খুঁটিনাটি দেখে। তাই ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। আমি এটাকে খারাপ বলব না। চাপ থাকলে উন্নতিও হয়। আমার বিশ্বাস, সঠিক প্রশিক্ষণ আর নিয়মিত মূল্যায়ন চলতে থাকলে আইএসএলের রেফারিং আগামী দিনে আরও শক্ত জায়গায় পৌঁছবে।
প্রশ্ন ২: বাংলার একমাত্র ফিফা প্যানেলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব কতটা আলাদা?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জি: এটা আমার কাছে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, আবেগের বিষয়ও। বাংলা ফুটবল ভালোবাসে, ফুটবল বোঝে, আর এখানকার মানুষ সবসময় খেলাটাকে হৃদয় দিয়ে দেখে। সেই জায়গা থেকে বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করার সুযোগ পাওয়া খুবই গর্বের। কিন্তু গর্বের সঙ্গে দায়িত্বও আসে। কারণ মানুষ তখন আপনাকে শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখে না, একটা রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে দেখে। আমি যখন মাঠে নামি, তখন ভাবি আমার পারফরম্যান্স দেখে হয়তো কেউ অনুপ্রাণিত হবে। হয়তো কোনও তরুণ ভাববে, খেলোয়াড় না হয়েও ফুটবলে বড় জায়গায় পৌঁছনো যায়। সেই ভাবনাটা আমাকে আরও দায়িত্বশীল করে। নিজের ফিটনেস, নিয়ম জানা, মানসিক দৃঢ়তা—সবসময় ধরে রাখতে হয়। কারণ এখানে ঢিলে দেওয়ার সুযোগ নেই। আমি চাই আগামী দিনে বাংলা থেকে আরও অনেক রেফারি উঠে আসুক। আমি একা থাকলে চলবে না, ধারাটা তৈরি হওয়া জরুরি।
প্রশ্ন ৩: আইএসএলে সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায়—রেফারির ভুল, না চাপ?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জি: আমি বলব, চাপটাই আসল বিষয়, আর সেই চাপ থেকেই অনেক ভুল হয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় একটা বাঁশি বাজানো বা কার্ড দেখানো খুব সহজ। কিন্তু মাঠে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিটা আলাদা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একদিকে খেলোয়াড়ের গতি, অন্যদিকে দর্শকের আওয়াজ, বেঞ্চের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে পরিবেশটা খুবই তীব্র থাকে। সেই মুহূর্তে ভুল হতেই পারে। তবে ভুল মানেই অযোগ্যতা নয়। ভুল কমানোর জন্যই তো অনুশীলন, ভিডিও বিশ্লেষণ, আলোচনা এসব দরকার। আমি সবসময় বলি, রেফারিরাও মানুষ। কিন্তু তাদের কাছ থেকে প্রায় যন্ত্রের মতো নিখুঁত সিদ্ধান্ত আশা করা হয়। সেটা সবসময় সম্ভব নয়। তাই সমালোচনা হোক, কিন্তু গঠনমূলক হোক। যদি আমরা রেফারিদের মানসিক প্রস্তুতি, ম্যাচ রিভিউ এবং প্রশিক্ষণে আরও বিনিয়োগ করি, তাহলে ভুলও কমবে, মানও বাড়বে।
প্রশ্ন ৪: দর্শকদের অভিযোগ থাকে, বড় দল অনেক সময় সুবিধা পায়। আপনি কী বলবেন?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জি: এই অভিযোগ নতুন নয়, পৃথিবীর সব লিগেই এটা শোনা যায়। কারণ বড় দলের সমর্থক বেশি, আলোচনাও বেশি। ফলে তাদের ম্যাচের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক হয়। কিন্তু একজন পেশাদার রেফারির কাছে বড় দল বা ছোট দল বলে কিছু থাকে না। মাঠে তখন শুধু দুই পক্ষ আর নিয়ম। সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেই মুহূর্তে যা দেখা গেল তার ভিত্তিতে। তবে এটাও সত্যি, বড় ম্যাচে আবেগ বেশি থাকে, ফলে প্রতিক্রিয়াও বেশি হয়। কোনও পেনাল্টি দিলে একদল বলবে ঠিক হয়েছে, আরেকদল বলবে ভুল। এটাই ফুটবল। আমি ব্যক্তিগতভাবে সবসময় বিশ্বাস করি, নিরপেক্ষতা ছাড়া রেফারিং সম্ভব নয়। মাঠে নামার আগে নিজের মন পরিষ্কার রাখতে হয়। আপনি কারও নাম, ইতিহাস বা জনপ্রিয়তা দেখে সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। দর্শকদের আবেগ আমি বুঝি, কিন্তু সব সিদ্ধান্তের পেছনে পক্ষপাত থাকে না—অনেক সময় সেটা শুধু মুহূর্তের বিচার।
প্রশ্ন ৫: var প্রযুক্তি আইএসএলে রেফারিং কতটা বদলাতে পারে?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জি: ভার অবশ্যই সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে। গোল হয়েছে কি না, পেনাল্টি ঠিক ছিল কি না, লাল কার্ড হওয়া উচিত কি না—এসব জায়গায় প্রযুক্তি রেফারিকে দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ দেয়। এতে ভুল কমে, ম্যাচের ন্যায্যতাও বাড়ে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার বলা দরকার, ভার কোনও জাদুর কাঠি নয়। শেষ সিদ্ধান্ত মানুষকেই নিতে হয়। তাই প্রযুক্তি এলেই সব সমস্যা মিটে যাবে, এটা ভাবা ঠিক নয়। বরং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানাটাও গুরুত্বপূর্ণ। রেফারিদের আলাদা প্রশিক্ষণ লাগে, যোগাযোগের দক্ষতা লাগে, চাপ সামলাতে হয়। আমি চাই আইএসএলেও ধীরে ধীরে আরও উন্নত প্রযুক্তি আসুক। তবে সঙ্গে মানবিক বিচারবুদ্ধিও থাকতে হবে। ফুটবল শুধু মেশিন দিয়ে চলে না, খেলার স্পিরিটও আছে। দুটো মিলেই সঠিক ফল পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৬: ম্যাচে মিগুয়েলের লাল কার্ড এবং পরবর্তী বিশৃঙ্খলা—রেফারির সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জী: রেফারির প্রথম কাজ হল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও বেঞ্চের আচরণ নিয়মের মধ্যে রাখা। যদি কোনও খেলোয়াড় বা স্টাফ আক্রমণাত্মক আচরণ করেন, ধাক্কাধাক্কি করেন, উত্তেজনা ছড়ান বা রেফারির নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে লাল কার্ড দেখানোর অধিকার রেফারির আছে। এই ঘটনাতেও মনে হচ্ছে মাঠের উত্তেজনা ডাগআউট পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, ফলে রেফারি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে এমন পরিস্থিতিতে শুধু শেষ মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া নয়, গোটা ঘটনার সূত্রপাতও বিচার করা জরুরি। যদি সত্যিই উস্কানিমূলক বা বৈষম্যমূলক মন্তব্য হয়ে থাকে, সেটাও ম্যাচ কমিশনার ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির তদন্তে দেখা উচিত। মাঠে রেফারি মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেন, তাই সব তথ্য তখন তাঁর কাছে নাও থাকতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে ভিডিও ফুটেজ, রিপোর্ট ও সাক্ষ্য দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। লাল কার্ড সঠিক না ভুল, তা নির্ভর করবে রেফারির রিপোর্ট এবং সম্পূর্ণ ঘটনার বিশ্লেষণের উপর।
প্রশ্ন ৭: যদি বৈষম্যমূলক মন্তব্যের অভিযোগ সত্যি হয়, তাহলে ফুটবলে এর শাস্তি কী হওয়া উচিত?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জী: ফুটবল এখন শুধু খেলা নয়, এটি সামাজিক মূল্যবোধেরও প্রতীক। তাই বর্ণবাদী, লিঙ্গবিদ্বেষী বা অপমানজনক মন্তব্যের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা থাকা দরকার। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কোনও কোচ, খেলোয়াড় বা স্টাফ ইচ্ছাকৃতভাবে বৈষম্যমূলক মন্তব্য করেছেন, তাহলে শুধু জরিমানা নয়, ম্যাচ নির্বাসনও হওয়া উচিত। কারণ এমন মন্তব্য প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে আঘাত করে এবং মাঠে উত্তেজনা বাড়ায়। অনেক সময় খেলোয়াড়ের প্রতিক্রিয়াকে শাস্তি দেওয়া হয়, কিন্তু উস্কানিদাতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়—এটা ঠিক নয়। ভারতীয় ফুটবলেও এই জায়গায় কঠোর নজির দরকার। ম্যাচ অফিসিয়ালদের রিপোর্ট, ভিডিও প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়ে দ্রুত তদন্ত হওয়া উচিত। পাশাপাশি দলগুলোকেও নিজেদের স্টাফদের আচরণের দায় নিতে হবে। ফুটবল মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু সম্মানবোধ হারালে খেলার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। তাই দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ও স্পষ্ট শাস্তিই হওয়া উচিত।
প্রশ্ন ৮: ভারতীয় ফুটবলে বাংলা থেকে এখন খুব কম রেফারি উঠে আসছেন। একসময় বাংলার রেফারিরা দেশের ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন। বর্তমানে এই সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ কী?
প্রাঞ্জল ব্যানার্জি: একসময় বাংলা ছিল ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম কেন্দ্র। শুধু খেলোয়াড় নয়, রেফারিং ক্ষেত্রেও বাংলার আলাদা পরিচিতি ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ধারাবাহিকতা অনেকটাই কমেছে। এর প্রধান কারণ হল গ্রাসরুট স্তরে পরিকল্পনার অভাব। নতুন ছেলেমেয়েদের রেফারিংকে পেশা হিসেবে দেখানোর মতো উদ্যোগ খুব কম হয়েছে। অনেকেই মনে করেন রেফারি হওয়া মানে শুধু মাঠে বাঁশি বাজানো, কিন্তু এর পিছনে ফিটনেস, নিয়মের জ্ঞান, মানসিক দৃঢ়তা এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ দরকার। সেই পরিকাঠামো সব জায়গায় নেই। আরও একটি বড় সমস্যা হল সম্মান ও নিরাপত্তা। অনেক সময় স্থানীয় ম্যাচে রেফারিদের অযথা চাপ, অপমান বা হুমকির মুখে পড়তে হয়। এতে নতুন প্রজন্ম আগ্রহ হারায়। বাংলা থেকে বেশি রেফারি তুলতে হলে জেলা স্তরে নিয়মিত কোর্স, ফিটনেস ক্যাম্প, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা, ক্যারিয়ার পথ এবং নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। তাহলেই আবার বাংলা দেশকে সেরা রেফারি উপহার দিতে পারবে।
Read More
ঘরের মাঠে গুজরাটের জয়, শীর্ষে উঠতে পারল না বেঙ্গালুরু
ফাস্ট বোলার গড়ার বড় উদ্যোগ ! প্রজেক্ট ‘গতিতে’ গতি পাবে বাংলার ক্রিকেট?
দুই ম্যাচেই খুলে যাবে বিশ্বকাপের দরজা? আশায় ভারতীয় ফুটবল দল !