মাঠ থেকে কোচিংয়ে মেহতাব, অভিজ্ঞতা দিয়ে গড়তে চান নতুন প্রজন্ম - 24 Ghanta Bangla News
Home

মাঠ থেকে কোচিংয়ে মেহতাব, অভিজ্ঞতা দিয়ে গড়তে চান নতুন প্রজন্ম

Spread the love

Mehtab Hossain বললেন, মাঠই তাঁকে পরিচয় দিয়েছে, এখন অভিজ্ঞতা দিয়ে তরুণদের গড়াই লক্ষ্য, ভারতীয় ফুটবলের উন্নতি নিয়েও খোলামেলা মত

বিট্টু দত্ত, কলকাতা: ভারতীয় ফুটবলের পরিচিত মুখ মেহতাব হোসেন, কলকাতার দুই প্রধান ক্লাব থেকে জাতীয় দল, দীর্ঘ কেরিয়ারে নিজেকে প্রমাণ করেছেন লড়াকু মিডফিল্ডার হিসেবে। এখন কোচিংয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন তিনি। মাঠের স্মৃতি, সংগ্রাম, ভবিষ্যৎ ভাবনা ও ভারতীয় ফুটবল নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন মেহতাব।

প্রশ্ন ১: আপনার ফুটবল যাত্রার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা বলুন।

মেহতাব হোসেন: আমার ফুটবলের শুরুটা খুব সাধারণভাবেই। পাড়ার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলো, স্কুল শেষে বল নিয়ে ছুটে যাওয়া—এভাবেই ফুটবলের প্রেমে পড়ে যাই। তখন তো বুঝতাম না ভবিষ্যতে ফুটবলই পেশা হবে, শুধু খেলতে ভালো লাগত। বাড়িতে সবাই জানত আমি বল পেলেই অন্য জগতে চলে যাই। পরিবারের সমর্থন না থাকলে এতদূর আসা সম্ভব হতো না। ছোটবেলায় আইএফএ বেবি লিগে খেলার সুযোগ পাই, সেটা আমার জীবনের বড় মোড়। সেখানে প্রথম বুঝলাম ফুটবল শুধু আনন্দ নয়, এর মধ্যে নিয়ম, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম সব আছে। অনুশীলনে দেরি করা যাবে না, ফিটনেস ঠিক রাখতে হবে, কোচের কথা শুনতে হবে। অনেক সময় ক্লান্ত লাগত, কিন্তু মাঠে নামলেই সব ভুলে যেতাম। আজ যখন পিছনে তাকাই, মনে হয় সেই ছোট্ট ছেলেটার স্বপ্নটাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। বড় কিছু করতে চাইলে শুরুটা যত সাধারণই হোক, স্বপ্নটা বড় হওয়া দরকার।

Read More: ঘরের মাঠে গুজরাটের জয়, শীর্ষে উঠতে পারল না বেঙ্গালুরু

প্রশ্ন ২: কলকাতার দুই প্রধান ক্লাব ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মেহতাব হোসেন: সত্যি বলতে, কলকাতার দুই প্রধান ক্লাবে খেলা যেকোনো ফুটবলারের কাছে স্বপ্নের মতো। আমি ভাগ্যবান যে দু’দলেই খেলেছি। ইস্টবেঙ্গলে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, তাই সেখানে অনেক আবেগ জড়িয়ে আছে। সমর্থকদের ভালোবাসা, প্রত্যাশা, বড় ম্যাচের চাপ—সবকিছু আমাকে আরও পরিণত করেছে। মোহনবাগানে ফেরাটা অন্যরকম অনুভূতি ছিল। অনেক বছর পর আবার সেই জার্সি পরে মাঠে নামা মানে পুরনো স্মৃতি ফিরে পাওয়া। দুই ক্লাবের সমর্থক, ঐতিহ্য, আবেগ—সবই আলাদা, কিন্তু একটা জিনিস একই, সেটা হলো জিততেই হবে। ডার্বির সময় শহরের পরিবেশ বদলে যেত। রাস্তায়, চায়ের দোকানে, বাড়িতে—সব জায়গায় শুধু ম্যাচ নিয়ে আলোচনা। মাঠে নামার আগে চাপ থাকত, কিন্তু সেই চাপই অনুপ্রেরণা হয়ে যেত। আমি সবসময় মনে করি, এই দুই ক্লাব আমাকে শুধু ফুটবলার বানায়নি, মানসিকভাবে অনেক শক্ত করেছে।

প্রশ্ন ৩: ইস্টবেঙ্গলে দশ বছর কাটিয়েছেন। সেই অধ্যায়কে কীভাবে দেখেন?

মেহতাব হোসেন: ইস্টবেঙ্গলে কাটানো সময়টা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। দশ বছর একটা ক্লাবে থাকা মানে সেখানে শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও বেড়ে ওঠা। আমি যখন যোগ দিই, তখন অনেক স্বপ্ন ছিল। আর যখন বেরিয়েছি, তখন সঙ্গে ছিল অগণিত স্মৃতি। ইস্টবেঙ্গলে খেলতে গিয়ে শিখেছি বড় ক্লাবে চাপ কী জিনিস। এখানে ড্র করলেও সমর্থকেরা খুশি হন না, তারা জয় চান। সেই মানসিকতা আপনাকে প্রতিদিন আরও ভালো হতে বাধ্য করে। ট্রফি জিতেছি, বড় ম্যাচ খেলেছি, অসাধারণ কিছু সতীর্থ পেয়েছি—এসব তো আছেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল সমর্থকদের ভালোবাসা। তারা সবসময় পাশে থেকেছেন। ভালো খেললে প্রশংসা করেছেন, খারাপ খেললে প্রশ্নও করেছেন। সেটাই বড় ক্লাবের সংস্কৃতি। আজও ইস্টবেঙ্গলের কথা উঠলে মনে হয়, ওটা শুধু একটা ক্লাব নয়, আমার জীবনের একটা বড় অংশ।

প্রশ্ন ৪: ভারতীয় দলে খেলার অনুভূতি কেমন ছিল?

মেহতাব হোসেন: দেশের জার্সি গায়ে চাপানোর অনুভূতি কথায় বোঝানো খুব কঠিন। প্রথমবার যখন ভারতের হয়ে মাঠে নামি, মনে হচ্ছিল ছোটবেলার একটা স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেছে। ক্লাব ফুটবল আলাদা, কিন্তু দেশের হয়ে খেলাটা সম্পূর্ণ অন্যরকম আবেগ। তখন আপনি শুধু নিজের জন্য খেলছেন না, পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় শরীরে কাঁটা দিত। সেই মুহূর্তে মনে হতো, এই মুহূর্তটার জন্য এত পরিশ্রম করেছি। আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলে বুঝেছি ফুটবলের গতি, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা কতটা জরুরি। আমি ৩১টি ম্যাচ খেলেছি, দু’টি গোলও করেছি। সংখ্যার চেয়ে আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের জন্য নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আজও কেউ যদি জিজ্ঞেস করে জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত কী, আমি বলব ভারতের জার্সি পরে মাঠে নামা। সেটা কোনোদিন ভোলার নয়।

Read More: টানা ছয়টি উইকেট! জোড়া হ্যাটট্রিক করে ইতিহাস রচনা করলেন ডেভিস

প্রশ্ন ৫: একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে আপনার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

মেহতাব হোসেন: ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ অনেক সময় চোখে পড়ে না, কারণ আমরা গোল করি না, খুব বেশি শিরোনামেও থাকি না। কিন্তু দলের ভিত গড়ে ওঠে এই জায়গা থেকেই। আমার কাজ ছিল প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙা, বল কেড়ে নেওয়া, ডিফেন্সকে সাহায্য করা আর আক্রমণ তৈরি করা। অনেকে ভাবে এই পজিশনে শুধু শক্তি লাগবে, কিন্তু আসলে মাথাও খুব ঠান্ডা রাখতে হয়। কখন ট্যাকল করতে হবে, কখন পাস দিতে হবে, কখন খেলার গতি কমাতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত মুহূর্তে নিতে হয়।আমি সবসময় চেষ্টা করেছি নিঃশব্দে দলের জন্য কাজ করতে। যদি ম্যাচ শেষে কোচ বলেন “আজ মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে ছিল”, সেটাই আমার কাছে বড় প্রশংসা। সব খেলোয়াড় আলোয় থাকে না, কেউ কেউ আলোটা তৈরি করে দেয়। আমি মনে করি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা সেই কাজটাই করে।

প্রশ্ন ৬: কোচিংয়ে আসার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন? খেলোয়াড় থেকে কোচ হওয়ার পথটা কতটা কঠিন?

মেহতাব হোসেন: ফুটবল আমার জীবন থেকে আলাদা নয়। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে যতটা দিয়েছি, অবসরের পরে মনে হয়েছে এবার অন্য ভূমিকায় কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। সেই কারণেই কোচিংয়ে আসা। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, অভিজ্ঞতা যদি পরের প্রজন্মের কাজে না লাগে, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার মূল্য অনেকটাই কমে যায়। খেলোয়াড় থেকে কোচ হওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়। মাঠে একজন ফুটবলার নিজের খেলায় মন দেয়, কিন্তু কোচকে পুরো দল নিয়ে ভাবতে হয়। কার মানসিক অবস্থা কেমন, কে ফর্মে আছে, কে চাপে আছে, কোন ম্যাচে কী কৌশল লাগবে—সব দেখতে হয়। শুরুতে বুঝতে সময় লেগেছে যে কোচ হিসেবে ধৈর্য অনেক বেশি দরকার। একজন খেলোয়াড় ভুল করলে নিজে ঠিক করে নেওয়া যায়, কিন্তু কোচকে তাকে বোঝাতে হয়, পাশে দাঁড়াতে হয়। আজ আমি কোচিং উপভোগ করছি, কারণ এখানে নতুনভাবে ফুটবলকে দেখা যায়।

প্রশ্ন ৭: আজকের ভারতীয় ফুটবল আগের তুলনায় কতটা বদলেছে বলে মনে হয়?

মেহতাব হোসেন: ভারতীয় ফুটবল অনেকটাই বদলেছে, এটা মানতেই হবে। আমাদের সময়ে সুযোগ-সুবিধা এত ছিল না। এখন ফিটনেস, ডায়েট, রিকভারি, ডাটা অ্যানালিসিস, পেশাদার পরিকল্পনা—সবকিছু অনেক উন্নত হয়েছে। তরুণ ফুটবলাররা এখন ছোটবেলা থেকেই ভালো পরিবেশ পাচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো মানসিকতা। এখন ছেলেরা বড় স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। আগে অনেকেই শুধু ক্লাব ফুটবল পর্যন্ত ভাবত, এখন দেশের হয়ে খেলা, বিদেশে যাওয়া—এসব লক্ষ্য রাখছে। এটা খুব ইতিবাচক। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি। গ্রাসরুট স্তরে আরও উন্নতি দরকার, জেলা ও গ্রামাঞ্চল থেকে প্রতিভা তুলে আনার কাজ বাড়াতে হবে। কোচিং কাঠামোও শক্তিশালী করতে হবে। আমি সবসময় বলি, আমরা সঠিক পথে এগোচ্ছি, কিন্তু পথ এখনও অনেকটা বাকি। ধৈর্য আর পরিকল্পনা থাকলে ভারতীয় ফুটবল আরও বড় জায়গায় পৌঁছবে।

প্রশ্ন ৮: কলকাতা ডার্বির চাপ ও আবেগ কতটা আলাদা?

মেহতাব হোসেন: কলকাতা ডার্বি শুধু একটা ম্যাচ নয়, এটা একটা অনুভূতি। যারা বাইরে থেকে দেখে, তারা হয়তো বোঝে না এই ম্যাচ শহরের মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের কয়েকদিন আগে থেকেই উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। রাস্তায়, অফিসে, বাজারে—সব জায়গায় শুধু ডার্বির আলোচনা। খেলোয়াড় হিসেবে চাপটা অনেক বেশি থাকে। কারণ জানেন, একটা ভালো ম্যাচ আপনাকে নায়ক বানিয়ে দিতে পারে, আবার খারাপ ম্যাচ সমালোচনার মুখেও ফেলতে পারে। কিন্তু এই চাপটাই আসলে ডার্বির সৌন্দর্য। মাঠে নামার সময় গ্যালারির আওয়াজ, সমর্থকদের আবেগ, ব্যানার, স্লোগান—সবকিছু শরীরে আলাদা শক্তি এনে দেয়। তখন ক্লান্তি বলে কিছু থাকে না। আমি বহু ম্যাচ খেলেছি, কিন্তু ডার্বির অনুভূতি আলাদা। ফুটবলার জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোর একটি নিঃসন্দেহে কলকাতা ডার্বি।

প্রশ্ন ৯: তরুণ ফুটবলারদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?

মেহতাব হোসেন: সবচেয়ে প্রথম কথা, প্রতিভা থাকলেই হবে না—পরিশ্রম করতে হবে। অনেক ছেলেকে দেখি ভালো খেলতে পারে, কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন করে না, শৃঙ্খলা মানে না। এতে দীর্ঘ পথ যাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ধৈর্য রাখতে হবে। আজ ভালো খেললেই কাল বড় ক্লাবে সুযোগ মিলবে না। সময় লাগে, নিজেকে তৈরি করতে হয়। ব্যর্থতা আসবে, বাদ পড়বেন, সমালোচনা হবে—এসব মেনে নিয়ে এগোতে হবে। আর একটা কথা বলব, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রশংসায় ভেসে গেলে চলবে না। বাস্তব উন্নতি মাঠে হয়, মোবাইলে নয়। কোচের কথা শুনুন, সিনিয়রদের থেকে শিখুন, শরীরের যত্ন নিন। ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়, এটা জীবনযাপন। যারা সত্যি মন থেকে ভালোবাসে, তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।

প্রশ্ন ১০: মেহতাব হোসেনকে মানুষ কীভাবে মনে রাখুক, সেটা চান?

মেহতাব হোসেন: আমি চাই মানুষ আমাকে শুধু একজন ফুটবলার হিসেবে নয়, একজন সৎ পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে মনে রাখুক। আমি সবসময় মাঠে নিজের শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। হয়তো সবসময় আলোচনায় ছিলাম না, কিন্তু দলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে খেলেছি। আমার কাছে নামের চেয়ে সম্মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউ বলে, “মেহতাব মাঠে লড়াই করত, কখনও হার মানত না”—সেটাই আমার বড় প্রাপ্তি। আমি চাই তরুণরা দেখুক, সাধারণ পরিবার থেকেও পরিশ্রম করে বড় হওয়া যায়। সবসময় তারকা হতে হবে না, ধারাবাহিক হওয়াটাই বড় কথা।ফুটবল আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে—পরিচয়, ভালোবাসা, সম্মান। যদি আমি পরের প্রজন্মকে একটু অনুপ্রেরণা দিতে পারি, তাহলেই মনে করব আমার পথচলা সফল।

ভিডিও নিউজ দেখুন

https://www.youtube.com/watch?v=videoseries

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *