বুথে গিয়ে স্লোগান শুনে EC-কে ফোন শুভেন্দুর, জোড়াফুল শিবিরের সফ্ট ড্রিঙ্কে চুমুক ‘দাদা’র
এই সময়: বুধবার সকালটা শুরু করেছিলেন চরণামৃত খেয়ে, শেষ করলেন কোল্ড ড্রিংকে চুমুক দিয়ে। তাও আবার ‘চরম শত্রু’ তৃণমূলের দেওয়া কোল্ড ড্রিংকে গলা ভেজালেন ভবানীপুর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম হোক বা ভবানীপুর— খেলার মাঠ ছাড়তে নারাজ তিনি। ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটে যেমন নন্দীগ্রামে নিজের গড়ে প্রার্থী শুভেন্দু দৌড়ে বেরিয়েছেন, তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড়েও একেবারে দাঁতে দাঁত চেপে ক্রিজ়ে টিকে থাকলেন শেষ পর্যন্ত।
ডি-ডে’র শুরুটা শুভেন্দু করেছিলেন খিদিরপুরের মন্দিরে পুজো দিয়ে। সাতসকালেই তিনি ঘোষণা করে দেন, ভবানীপুরে জিতছেন। কিন্তু তার পরেও দিনভর তাঁকে কার্যত ছুটতে হলো এই বুথ থেকে সেই বুথ। একবার পথ চলতে চলতে দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ মিডিয়া কর্মীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমাকে কাজ করতে দিন। আমি অলরেডি ২৮টা বুথ ঘুরে ফেলেছি, ইচ্ছে আছে ৮০-৯০টা বুথে ঘুরব।’ মিত্র ইনস্টিটিউশন স্কুলেও ভোট কেমন হচ্ছে দেখতে ছুটে গিয়েছিলেন শুভেন্দু — যে বুথে ভোট দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুরের ৭০ নম্বর ওয়ার্ডে বেশ খানিক ক্ষণ তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বসে আছেন জেনে সেখানেও পৌঁছে যান শুভেন্দু। অভিযোগ করেন, ওয়ার্ডে বসে মমতা ভোটারদের প্রভাবিত করছেন। শুভেন্দু ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর ঠিক আগে এলাকা কার্যত ছেয়ে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীতে।
দিনভর ঘুরেছেন ঠিকই, তবে ভবানীপুরে প্রার্থী শুভেন্দুর পথে ফুল বিছানো ছিল, এমনও নয়। একাধিক জায়গায় তাঁকে তৃণমূল কর্মীদের বাধার মুখেও পড়তে হয়। বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন ভাবে শুনতে হয়, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও। চক্রবেড়িয়ার কাছেই একটি পাড়ায় শুভেন্দু হেঁটে যাচ্ছেন দেখে বাড়ির ভিতর থেকে কয়েকজন বলে ওঠেন, ‘দাদা… দাদা… খুব ভালো ভোট হচ্ছে।’ শুভেন্দু তখন তাঁদের নমস্কার জানাতে যান। আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বলে ওঠেন, ‘জয় বাংলা দাদা, জয় বাংলা… খুব ভালো ভোট হচ্ছে।’
দুপুর নাগাদ কালীঘাট রোডের মুখে পুরসভার একটি কমিউনিটি হল–এর বুথে পৌঁছন বিজেপি প্রার্থী। বুথে পৌঁছতেই তাঁকে দেখে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু তৃণমূল কর্মী ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। প্রথমে শুভেন্দু শান্ত ভাবেই তাঁদের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘এইগুলো বুথের সামনে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে করবেন না। আমি রিকোয়েস্ট করছি।’ কিন্তু তাতে স্লোগানের ঝাঁজ যায় বেড়ে। কয়েকশো তৃণমূল কর্মী জড়ো হয়ে শুভেন্দু এবং তাঁর বাবার নাম (প্রাক্তন সাংসদ শিশির অধিকারী) ধরে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তখন ঘটনাস্থলে বিজেপি কর্মীরা সংখ্যায় বেশি না থাকলেও তাঁরা পাল্টা ‘জয় শ্রীরাম’ এবং ‘চোর’ স্লোগান তুলতে শুরু করেন।
সেখানে দাঁড়িয়েই শুভেন্দু ফোনে ঘটনার কথা জানান কমিশন ও কুইক রেসপন্স টিমকে। তবে সেই টিম পৌঁছনোর আগেই তৃণমূলের সেই জমায়েতের দিকে তেড়ে যান শুভেন্দু। তাঁর রুদ্রমূর্তি দেখে পিছিয়ে যান স্লোগান দেওয়া তৃণমূল কর্মীরাও। ততক্ষণে লাঠি উঁচিয়ে এগিয়ে যায় শুভেন্দুর নিরাপত্তায় থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীও। তখনই স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কার্যত মুখোমুখি দেখা হয়েছিল শুভেন্দুর। তবে কাজরীকে পাশ কাটিয়ে বিক্ষোভের মধ্যেই ঘটনাস্থল ছাড়েন তিনি।
মাঝে একবার লাঞ্চ ব্রেক, ঘণ্টাখানেকও নয়। ফের বেরিয়ে পড়েন শুভেন্দু। এই পর্বেই একটি বুথ পরিদর্শনে যাওয়ার সময়ে তৃণমূলের ক্যাম্পের পাশে চলে আসেন তিনি। নিজেই এগিয়ে যান সেখানে, থতমত খেয়ে যান তৃণমূল কর্মীরা। কিন্তু হাতজোড় করে নমস্কার করতেই যেন বহুদিনের জমা বরফ গলে জল। তৃণমূল কর্মীরাই কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল এগিয়ে দেন শুভেন্দুকে। সেই নরম পানীয়ে চুমুক দেন শুভেন্দু। এক মহিলা তৃণমূল কর্মী তখন বলেন, ‘দাদা তো দাদাই থাকেন। আপনিও তো আমাদেরই ছিলেন।’ শুভেন্দু তাঁকে নমস্কার করে বলেন, ‘একসঙ্গে থাকতে হবে!’ তার পরেই অবশ্য বুথ ঘুরে দেখে বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে সেলফি।
বেলাশেষে গাড়িতে উঠতে উঠতে প্রত্যয়ের সুরে বিজেপি প্রার্থীর মন্তব্য, ‘এখানে মাননীয়া হারছেন। আমরা ৩০ হাজার ভোটের জিতছি। অপেক্ষা করুন হিন্দু সরকার আসছে।’