‘আজ জানে কি জিদ না করো’, আট দশকের সুরেলা যাত্রার সমাপ্তি - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘আজ জানে কি জিদ না করো’, আট দশকের সুরেলা যাত্রার সমাপ্তি

Spread the love

‘আজ জানে কি জিদ না করো’, আট দশকের সুরেলা যাত্রার সমাপ্তি

ভারতীয় সংগীতের আকাশ যদি নক্ষত্রপুঞ্জ হয়, তবে আশা ভোঁসলে সেই উজ্জ্বলতম ধ্রুবতারা, যা গত আট দশক ধরে নিজের দ্যুতিতে আসমুদ্র হিমাচলকে মুগ্ধ করে রেখেছে। লতা মঙ্গেশকরের ধ্রুপদী গাম্ভীর্যের সমান্তরালে আশা তৈরি করেছিলেন এক নিজস্ব ঘরানা, যেখানে ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়।

১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের এক সংগীত পরিবারে জন্ম আশার। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও নাট্যব্যক্তিত্ব। বাবার অকাল প্রয়াণের পর মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই দিদি লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরে পরিবারের হাল ধরতে পেশাদার সংগীত জগতে পা রাখেন তিনি। দিদির বিপুল খ্যাতির আড়ালে নিজের জায়গা তৈরি করাটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। ১৯৪৮ সালে ‘চুনরিয়া’ ছবিতে প্রথম হিন্দি গান গাওয়ার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ও পি নায়ার, খৈয়াম কিংবা শচীন দেব বর্মনের সুরে তিনি একের পর এক কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। বাদ পড়েনি নতুন প্রজন্মের সুরকারও। নদিম-শ্রাবণ, যতীন-ললিত, এ আর রহমানের সুরে আশার গানগুলো বলিউডের নিউ জেনারেশনকেও বুঁদ করে রেখেছিল।

রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে আশা ভোঁসলের জুটি ভারতীয় সংগীতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ক্যাবারে থেকে পপ, জ্যাজ থেকে ব্লুজ— সব মাধ্যমেই তাঁর কণ্ঠ ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘দম মারো দম’ বা ‘পিয়া তু আব তো আজা’-র মতো গানে যেমন তিনি শ্রোতাদের নাচিয়েছেন, তেমনই আবার ‘উমরাও জান’ ছবিতে তাঁর গজল বুঝিয়ে দিয়েছে ধ্রুপদী সংগীতে তাঁর দখল কতটা গভীর। তবে শুধু গান নয়, চর্চিত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও। বিশেষ করে রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তাঁর প্রেম, বিয়ে। নিন্দুকরা বলত, আরডির প্রেমই তাঁকে কেরিয়ার গড়তে সাহায্য করেছিল। তবে এই ধরনের গুঞ্জনকে আশা ফুৎকারে উড়িয়েছেন তাঁর কালজয়ী পারফরম্যান্সের মধ্যে দিয়ে।

আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত অধ্যায় তাঁর প্রথম বিবাহ। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পরিবারের অমতে গিয়ে লতা মঙ্গেশকরের সেক্রেটারি ৩১ বছর বয়সী গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁর সাময়িক দূরত্বও তৈরি হয়েছিল। তবে সেই দাম্পত্য সুখের হয়নি। দুই সন্তানসহ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্বামীর ঘর ছেড়ে তাঁকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল চরম লাঞ্ছনা সহ্য করে। সেই কঠিন সময়ে গানই ছিল তাঁর একমাত্র আশ্রয় এবং তিন সন্তানকে মানুষ করার হাতিয়ার।

দীর্ঘ বিরতির পর আশার জীবনে বসন্ত হয়ে আসেন সুরের জাদুকর রাহুল দেব বর্মন । বয়সে আশার চেয়ে ৬ বছরের ছোট রাহুল ছিলেন তাঁর গানের গুণমুগ্ধ। ১৯৮০ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সুরের এই জুটি ভারতীয় সংগীতকে আধুনিকতার নতুন দিশা দেখিয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৪ সালে আর ডি বর্মনের অকাল প্রয়াণ আশাকে ফের একা করে দেয়। স্বামীর মৃত্যুর পর গানকেই ফের নিজের বেঁচে থাকার রসদ বানিয়ে নেন তিনি। কিন্তু নিয়তির লেখার কাছে বার বার হার মানতে হয় আশাকে। তাঁর জীবন কেবল সাফল্যের আলোয় ভরা নয়, তাতে বারবার হানা দিয়েছে প্রিয়জন হারানোর শোক। ২০১২ সালে তাঁর একমাত্র কন্যা বর্ষা ভোঁসলে আত্মহত্যা করেন। এরপর ২০১৫ সালে তাঁর বড় ছেলে হেমন্ত ভোঁসলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। একের পর এক এমন ব্যক্তিগত শোক সত্ত্বেও তিনি ভেঙে পড়েননি। মঞ্চে উঠেছেন, দর্শকদের গান শুনিয়েছেন এবং নিজের পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছেন।

বাঙালি শ্রোতাদের কাছে আশা ভোঁসলে এক আলাদা আবেগের নাম। বাংলা আধুনিক গান এবং চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। সুধীন দাশগুপ্ত থেকে নচিকেতা ঘোষ— তাবড় বাঙালি সুরকারদের পছন্দের তালিকায় তিনি ছিলেন শীর্ষে। ‘মন মেতেছে মন ময়ূরী’ বা ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে’ আজও প্রত্যেক বাঙালির মনের মণিকোঠায় অমলিন হয়ে আছে। আর ডি বর্মনের সঙ্গে জুটি বেঁধে একের পর এক বাংলা আধুনিক গানে ঝড় তোলেন আশা। ‘এনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালও’ আজও দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে আবহ বদলে দেয়। একের পর এক বাংলা ছবিতেও আশার গান মন জয় করে অনুরাগীদের।

সংগীতে তাঁর এই বিশাল অবদানের জন্য ২০০৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ প্রদান করে। এর আগে ২০০০ সালে তিনি পান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার। এ ছাড়াও গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

গানের বাইরে আশার অন্যতম প্যাশন হল রান্না। তিনি নিজেই স্বীকার করেন, গান না গাইলে তিনি রাঁধুনি হতেন। এই ভালোবাসা থেকেই তিনি দুবাই ও কুয়েতসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ‘Asha’s’ নামে একটি সফল রেস্তোরাঁ চেইন গড়ে তুলেছেন। সেখানে অনেক সময় তিনি নিজেই রান্নার তদারকি করেন। নব্বই পেরিয়েও তাঁর কণ্ঠের সতেজতা এবং সংগীতে তাঁর নিবেদন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। সুরের আকাশে তিনি সেই চিরযৌবনা কণ্ঠস্বর, যা যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *