Md Selim: ‘সন্তান হারালে একজনের যা হয়, আমার এখন সেই ফিলিংস হচ্ছে’, প্রতীক-উরকে নিয়ে আজ না বলা অনেক কথা বলে দিলেন সেলিম – Bengali News | Md Selim: ‘I am now feeling the same feelings that one feels when losing a child’, Md Salim opens up about Pratik Ur Rahman
মহম্মদ সেলিম, সিপিএমের রাজ্য কমিটির সম্পাদকImage Credit: TV9 Bangla
কলকাতা: রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের উদ্দেশে আক্রমণের ঝাঁজ গত দুদিনে আরও বেড়েছে প্রতীক-উরের। এই পরিস্থিতিতে সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠক শেষ হল। তরুণ সিপিএম নেতা প্রতীক উরকে নিয়ে কি কোনও কথা হল? শুক্রবার যখন সাংবাদিক বৈঠকে বসলেন মহম্মদ সেলিম, এই উত্তর পাওয়ার জন্য সাংবাদিকরা অত্যুৎসাহী ছিলেন। রাজ্য কমিটির বৈঠকে কী আলোচনা হল, প্রেস মিটের প্রথমার্ধে সেটাই বিস্তারিত বলেন সেলিম। এরপর দ্বিতীয়ার্ধ, যেখানে প্রশ্ন করার সুযোগ পান সাংবাদিকরা। স্বাভাবিকভাবেই ওঠে প্রতীক উর প্রসঙ্গ। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা উত্তরও দিলেন। তবে একবারও নাম করলেন না প্রতীক উরের। তবে যেভাবে একের পর এক উপমা, নাটকের চরিত্র, দৃষ্টান্ত কিংবা নীতিকথার উদাহরণ তুলে ধরলেন সাংবাদিকদের সামনে, তাতে রাজনীতির কুশলীরা বলছেন, নাম না করেও প্রতীক উর সম্পর্কে এদিন অনেক কথাই বলে দিলেন সেলিম। শেষমেশ এটাও বললেন, তাঁর এখন সন্তান হারানোর মতনই অনুভূতি হচ্ছে!
‘CPIM-এই অরগানিক লিডারশিপ’
প্রথমেই সেলিম বলেন অরগানিক লিডারশিপের কথা। সিপিএম-ই যে একমাত্র দল, যারা নেতা তৈরি করে, সেটাই এদিন সদর্পে বলেন সেলিম। তিনি বলেন, “নতুন প্রজন্মের কোন নেতা বিজেপি-তৃণমূলের কাছে নেই। যা আছে ভাড়া করা। একমাত্র সিপিএম এটা গর্ব করে বলতে পারে, অরগানিক লিডারশিপ! আমরা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে নতুন প্রজন্ম তৈরি করি, সর্বস্ব ত্যাগ করে লড়াই করে।” সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে প্রতীক উরের কথা না বলেও, কোথাও এটাই সেলিম বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, প্রতীক উরের মতো নতুন প্রজন্মের তরুণ নেতা সিপিএম-ই তৈরি করেছে।
‘টার্গেটেড’
বাংলায় যে একটা বিকল্প বাম তৈরির প্রয়াস চলছে, সে কথাও এদিন বারবার সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট করেছে সেলিম। আর সে প্রসঙ্গ বলতে গিয়েই সেলিম বললেন, “একজন দক্ষিণ ২৪ পরগনার নেতা সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। সবচেয়ে কম বয়সে জেলা সেক্রেটারি হয়েছিলেন, সিপিএমের ইতিহাসে।” উল্লেখ্য, এবারও তিনি নাম নিলেন না। কিন্তু সিপিএমের তরুণ নেতাদের যে টার্গেট করা হচ্ছে, সেটাও উল্লেখ করলেন। বললেন, “টার্গেটেড। কিন্তু ওগের টার্গেট ফুল ফিল হয়নি। অনশন মঞ্চে পায়ের তলায় বসেও হয়নি। এর মধ্যে কেউ কেউ অতি বাম, মমতার মধ্যে লেনিন খুঁজে পেয়েছিল। আর কেউ কেউ মমতার পয়সায় লেনিনের ছবি লাগিয়েছিল। সবই বিকল্প বাম তৈরির জন্য। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ।”
‘সিপিএমের নৈতিক জয়’
আসলে সিপিএমের তরুণ নেতাদের টার্গেট করা, আসলে যে সিপিএমের নৈতিক জয়, সেটারও ব্যাখ্যা করলেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমাতেই। কারণ এক্ষেত্রেও নাম নিলেন না প্রতীক-উরের। তাঁর বক্তব্য, আসলে তৃণমূল নিজের নীতি নৈতিকতার উত্তরণের জন্য সিপিএমের তরুণ নেতাদের টার্গেট করছে।
সাংবাদিক বৈঠকে সেলিম বলেন, “একটা নাটক হয়েছিল, চরিত্রের সন্ধানে। তৃণমূলের নীতি নৈতিকতার প্রতিদিন যখন এত অধঃপতন, এত ধর্ষণ, খুন, গোলাগুলি, টাকা, বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকা, কাজেই নীতি নৈতিকতা রক্ষার জন্য এখন সিপিআইএম থেকে কারোর দরকার হয়ে পড়েছে। এটা সিপিআইএম আর সিপিআইএমের নতুন প্রজন্মের জয়।” তবে কি প্রতীক উরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তারই কিছুটা আভাস দিলেন সেলিম? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা, সেলিম প্রতীক-উরের নাম না করেও, তাঁকে ঘিরে এটা গোটা বিতর্ককে স্ক্রিপ্টেড বলে আখ্যায়িত করছেন, তখন বিষয়টি সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘পেশাদার সংস্থার স্ক্রিপ্টেড’
সেলিম বলেন, “তাবড় তাবড় নেতা যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের দলত্যাগে সিপিএম শেষ হয় না। কয়েকটা ইন্টারভিউ, কয়েকটা স্ক্রিপ্ট, কয়েকটা পেশাদার সংস্থা (যাঁদের ফাইল নিয়ে মমতা ছোটাছুটি করেন), তাঁদের স্ক্রিপ্টে সিপিআইএম হেরে যাবে! এটা হতে পারে না।”
তবে সেলিম একটা উদাহরণ দেন। কলার খোসায় পা পড়লে, কিংবা অতল গহ্বরে স্বজনদের কেউ তলিয়ে গেলে, অবশ্যই তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু এটাও ঠিক, তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও যাতে, সেই গহ্বরে তলিয়ে না যান, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, তবে কি প্রতীকের নাম না করেও বাকি তরুণ নেতাদের প্রচ্ছন্ন কোনও বার্তা দিলেন সেলিম?
‘সন্তান-হারানোর অনুভূতি’
এবার শেষমেশ সাংবাদিকরাই প্রশ্ন করেন সরাসরি। রাজ্য কমিটির বৈঠকে আদৌ প্রতীক উরকে নিয়ে কোনও কথা হয়েছে? উত্তর দেন সেলিম। এবার খানিকটা সরাসরি। আর তখনই বললেন সন্তান হারা হওয়ার অনুভূতির কথা! বললেন, “রাজ্য কমিটির বৈঠকে প্রসঙ্গ সেভাবে আসেনি, আমি উত্থাপন করেছি। এটা খুবই বেদনাদায়ক। আমার কাছে নতুন প্রজন্মের একটা ছেলে-মেয়ে অনেক আন্দোলনের ফল, যাতে সেই নেতার থেকে দল যাতে ডিভিডেন্ট তোলে, এই ধরনের কর্মীকে হারানোর প্রশ্ন উঠলেও, সন্তান হারা হওয়ার সমতুল্য। সন্তান হারালে একজন লোকের যে অনুভূতি হয়, আমার সেই ফিলিংস।” সঙ্গে এটাও বললেন, “দেড় দুমাস ধরে কয়েকটা অভিযোগ আসে। সাধারণত অভিযোগ এলে, নিজস্ব টিমের কাছে পাঠাই। যে মুহূর্তে পেয়েছিলাম, আমরা এটাকে দেখে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমিই চেষ্টা করছিলাম। তাঁর থেকে রেসপন্স নিতে হবে, কিন্তু তখন থেকে কনট্যাক্ট লুজ হয়ে যায়। তখন অন্য সূত্র থেকেই খবর পাই, ওদিকে, আরও কিছু কনট্যাক্ট ডেভলপ করছে। তখন আমাদের পার্টির রুল অনুযায়ী, কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।”
সরাসরি প্রতীক উরের নাম না করা কিংবা ‘অন্য কিছু কনটাক্ট ডেভলপ’ এহেন শব্দবন্ধ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সেলিম আদৌ কোনও ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন কি? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ উত্তর খুঁজছেন। যদিও সেলিম নিজের প্রসঙ্গও এক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন। তাঁকেও দল কীভাবে ব্যবহার করেছে, কীভাবে দল তাঁর থেকে ‘ডিভিডেন্ট’ তুলেছে! রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, প্রতীক উর যে দলের এক দক্ষ নেতা, সেটা হাবেভাবেই বুঝিয়ে দিলেন সেলিম, কিন্তু প্রশ্ন থাকছেই ‘পিছলে যাওয়া’টা আটকানো গেল না কেন? সেলিমের কথা মতো কি তাহলে, কখনও আত্মরক্ষায় ‘পিছলে যাওয়ার’ হাত ছাড়তে হয়!