নামেই লুকিয়ে ‘রহস্য’! রামায়ণ মহাভারতের স্মৃতি বিজড়িত, পাহাড়ে ঘেরা এই মন্দিরের ইতিহাস শুনলে চমকে উঠবেন – Bengali News | Gupteswar Temple: The Hidden Shiva Shrine Where History Meets Myth in Assam
পাহাড়ের বুকে আছে এমন এক রহস্যময় মন্দির যেখানে পৌঁছাতে হলে পেরোতে হয় সবুজ চা বাগানের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তা, পাহাড়ি বনপথ। এমনই এক নির্জন, নীরব ও রহস্যময় স্থানে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন শিবধাম। যার গল্প শুনলে এখনও অনেকের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
এই পবিত্র তীর্থটির নাম গুপ্তেশ্বর শিবমন্দির। অসমের শোণিতপুর জেলার ঢেকিয়াজুলি অঞ্চলে, সিঙ্গরি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই মন্দির প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলনস্থল। এই মন্দিরের শিবলিঙ্গটি রয়েছে একটি প্রাকৃতিক গুহার ভিতরে জলের নিচে। প্রাচীন এই শিবধামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক কাহিনী।
Archaeological Survey of India (ASI)-এর তথ্য অনুযায়ী, সপ্তম শতকে এই শিব মন্দির তৈরি হয়। অর্থাৎ এটি প্রায় দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এই মন্দির। বহু বছর ধরে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করেন এই মন্দিরে।
মন্দিরটি সিঙ্গরি এলাকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। যেখানে প্রায় ৪৮৫ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত সেগুন, গামারি, শাল ও অন্যান্য বনজ উদ্ভিদ রয়েছে। এখানে এখনও দেখা যায় বার্কিং ডিয়ার, লাজুকি হনুমান, বন কুকুর, দারিক পাখিসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। তাই এখানে এলে মন্দিরের সঙ্গে প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
এই স্থানের গল্প শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয় পুরাণেও এই মন্দিরের নাম রয়েছে। মহাভারত অনুসারে, শিবের ভক্ত বানাসুরের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধের সময় মহাদেব গুপ্ত অবস্থায় থেকে বানাসুরকে সাহায্য করেছিলেন। কথিত আছে, সেই সময় তিনি এই পাহাড়ি গুহার আড়ালেই অবস্থান করতেন দেবাদিদেব। সেই থেকেই এই স্থানের নাম হয়েছে ‘গুপ্তেশ্বর’ অর্থাৎ গোপনে অবস্থানকারী ঈশ্বর।
রামায়ণ-এও এই অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশ্বাস করা হয়, ঋষি শৃঙ্গ-এর জন্ম এই পুণ্যভূমিতেই। তাঁর আশীর্বাদেই একসময় খরাপীড়িত রাজ্যে বর্ষা নেমেছিল এবং অযোধ্যার রাজা দশরথ তাঁর আশীর্বাদে চার পুত্র লাভ করেছিলেন। যদিও এগুলো ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়, তবে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসছে।
বছরের বেশিরভাগ সময় এই স্থান শান্ত, নির্জন আর স্তব্ধ থাকে। কিন্তু শিবরাত্রি এলেই বদলে যায় জায়গাটির ছবি। সাত দিন ধরে চলে উৎসব, মেলা, গান, ভজন আর ভক্তদের ঢল। শুধু অসম নয় ভারতের নানা প্রান্ত, এমনকি ভুটান ও নেপাল থেকেও মানুষ এখানে আসেন শিবের দর্শনে।
শ্রাবণ পূর্ণিমা, মকর সংক্রান্তি, অশোকাষ্টমী, নববর্ষ এই সব দিনগুলোতেও হাজার হাজার ভক্ত ভিড় জমান। গেরুয়া বসনে সেজে, বাঁকে জল নিয়ে শিবলিঙ্গে অর্ঘ্য নিবেদন করেন পুণ্যার্থীরা। তখন নীরব অরণ্য ভরে ওঠে মন্ত্র, ঘণ্টাধ্বনি আর মানুষের প্রার্থনায়।
কীভাবে পৌঁছবেন এই স্বপ্নের ঠিকানায়?
প্রথমে গুয়াহাটি পৌঁছে সেখান থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার সড়কপথে তেজপুর হয়ে গুপ্তেশ্বর শিবমন্দিরে যাওয়া যায়। তেজপুরে বনবাংলো ও বিভিন্ন প্রাইভেট হোটেল রয়েছে সেখানেই থাকতে পারেন