বাংলা ছবিতে যুদ্ধ হাজার! বাঁচাতে পা তাই পড়ল ‘রাজা’র – Bengali News | Read the review of the film Vijaynagarer Hire
বাংলা ছবি বড় কাঁদছে। গুণগত মান হোক বা ব্যবসা, সময়টা বিশেষ ভালো নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্র কাকাবাবুর পায়ে যেমন চোট। যে চোট কখনও পুরোপুরি সারেনি। কিন্তু শারীরিক ক্ষত রয়ে গেলেও, মনের ক্ষত আর নেই। কাকাবাবুর যে হাতে ক্রাচ, সেই হাতে তিনি বন্দুক চালিয়ে দুষ্টু লোকদের দমন করতে পারেন। এটা ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। এই বছরের গোড়ায় বড়পর্দায় ‘বিজয়নগরের হীরে’-র আসাটাও, কোথাও মিলে যায় এর সঙ্গে।
রাজাবাবু বড়পর্দায় এলেন। দর্শকদের কষ্ট অনুভব করলেন। তারপর একটা ভালো ছবি উপহার দিয়ে, তাঁদের মন জয় করলেন, বা বলা যায়, বাংলা ছবির আর একটা টিকিট কাটার জন্য উত্সাহিত করলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে সৃষ্ট গল্পটা ধরিয়ে দিই। কাকাবাবু (প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়) প্রিয় সন্তু আর জোজোকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করলেন। গন্তব্যে তাদের সঙ্গে জুড়ে যায় এক দম্পতি। মোট পাঁচজনের টিম এবার হাম্পিতে বেড়ানোর জন্য তৈরি। কিন্তু কাকাবাবু কোথাও পৌঁছলে কেরামতি না দেখিয়ে ফেরেন কি?
গন্তব্যে গিয়ে রাজা দেখা করেন তাঁর সিনিয়রের সঙ্গে। এই চরিত্রে চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। সে একটা হীরে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। যে হীরের উপর আবার কিছু দুষ্টু লোকের লোভ। ঘটনার ঘনঘটায় কাকাবাবুর উপর এই হীরে খোঁজার দায়িত্ব বর্তায়। কীভাবে সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক কষে শেষ হাসি হাসবে কাকাবাবুর টিম, সেটাই দেখতে হবে ছবি জুড়ে। এই ছবিও এক অর্থে ‘মিউজিক্যাল’। সেটা উপভোগ্য।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায় দু’টো স্তর থাকে। বাচ্চারা যেমন এটাকে একটা হীরে খোঁজার গল্প হিসাবে দেখতে পারে, তেমনই বড়রা এই ছবির দর্শনের সঙ্গে একাত্ম বোধ করবে। প্রকৃতি মানুষের স্বেচ্ছাচার সহ্য করে না, অতিরিক্ত লোভে সবটাই হারাতে হয়, বা কোনও ক্ষত জীবনের যুদ্ধে হার নিশ্চিত করতে পারে না, ঘুরে দাঁড়ানো যায়, এমনই বিভিন্ন টুকরো-টুকরো বার্তায় ভরপুর এই ছবির চিত্রনাট্য। কাকাবাবুর মুখে কিছু সংলাপ যেন টনিক! ছবির সম্পাদনা নজর কাড়ল। পরিচালক চন্দ্রাশিসের ডেবিউ ছবি ছিল প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি বিভিন্ন কাজে হাত পাকানোর পর একটা স্মার্ট ছবি নিয়ে এবার বড় সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছলেন।
ছবির জোরের আর একটা জায়গা কাস্টিং। প্রসেনজিত্-আরিয়ান জুটি পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের হাতে তৈরি। ছবির নতুন সংযোজন জোজোর চরিত্রে পূষণ দাশগুপ্তকে বেশ ভালো লাগল। অনুজয় চট্টোপাধ্যায় প্রত্যাশামতোই নজর কাড়লেন। রাজনন্দিনী পালকে এই ছবিতে এত সুন্দর দেখতে লেগেছে, যে চরিত্রটার সঙ্গে ভারি মানানসই মনে হলো। রসায়ন নিয়ে কথা বলতে হলে, দীপক-বুম্বা জুটির কথা আসবে। তাঁদের কথোপকথন, হাতের উপর হাত রাখা, আবেগ-বিনিময়ে দর্শকের আবেগপ্রবণ হওয়া ছাড়া উপায় নেই! ব্যক্তিগত জীবনে এখন দু’ জনের ভালোবাসার সম্পর্ক, এদিকে পেশাগত ক্ষেত্রে একটা সময়ে তাঁদেরই তীব্র লড়াইয়ের সাক্ষী টলিপাড়া। সেই দুই মহারথী যখন এভাবে বড়পর্দায় আসেন, বাংলা ছবির ইতিহাস গুলে খাওয়া দর্শকের শিহরণ হয়।
প্রসেনজিত্ আর কাকাবাবু এখন সমার্থক। তবু বলব, এই ছবিতে প্রসেনজিত্ আলাদা করে নজর কাড়লেন। নুন সামান্য বেশি নয়, সামান্য কমও নয়, এমন যে গুন না গেয়ে উপায় নেই। এই ছবি এমন টানটান যে মনে হয়, আবার কাকাবাবু বড়পর্দায় ফিরে এলে বেশ হয়। বাংলার অন্যতম নামী পরিচালক সৃজিতের হাতে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্ম। তাই ‘বিজয়নগরের হীরে’ এই রিলে রেসে কতটা ভালো ফল করে, তার দিকে নজর ছিল। ছবিটি নিখুঁত, তা বলা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, এই নবীন পাকা হাতেই, বাংলা ছবির মরাবাঙে বছরের গোড়াতেই বাণ আনতে সক্ষম হলেন।