Zubeen Garg, Copyright Issue: জুবিনের ৩৮ হাজার গানের মালিক কে? বাড়ছে জটিলতা – Bengali News | Assam News: Copyright Issue related to Zubeen Garg’s songs
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। আমাদের ছেড়ে চিরতরে বিদায় নিলেন জুবিন গর্গ। ৩৩ বছরের সঙ্গীতজীবনে ৫২ বছর বয়সী গর্গ গেয়েছেন ৪০টিরও বেশি ভাষা ও উপভাষায়। আর জুবিনের গানের সংখ্যা? প্রায় ৩৮০০০-এর কাছাকাছি! সালটা ২০০৬, ‘গ্যাংস্টার’ ছবির ‘ইয়া আলি’ জুবিনকে দিল তাঁর প্রথম ব্রেক, বলিউডে ঢুকে পড়লেন অসমিয়া গায়ক! আর ঠিক ১৯ বছর পর এই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্নই বিচলিত করছে জুবিনের পরিবারকে, তাঁর এই বিপুল সঙ্গীতসম্ভারের স্বত্ত্ব কার? জুবিনের নিজের লেবেলের মালিকানায় রয়েছে প্রচুর গান। আবার ৯০-এর দশক ও ২০০০ সালের পর থেকে অনেক গান প্রযোজক বা পরিবেশকের আওতায় রয়েছে, তাঁরা রয়্যালটি দিতেন সঙ্গীতশিল্পীকে। চলে গিয়েছেন জুবিন, আর তার ফলেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত সমস্যা। এই ৩৮০০০ গানের স্বত্ত্ব সঠিক লোকের হাতে থাকবে তো?
জুবিন গর্গ চলে গিয়েছেন, তবে রেখে গিয়েছেন এই বিপুল রত্নসম্ভার। আর তাঁর গানের সবচেয়ে বড় কালেকশন রয়েছে কার কাছে জানেন? অসমের গুয়াহাটিতে জুবিন গর্গের নাম নিলে যে কেউ তাঁর বাড়ি দেখিয়ে দেবে। তবে এখন আর একজনের বাড়িও বেশ বিখ্যাত, সৌজন্যে জুবিন। বিশাল কালিতা নামে এক তরুণের বাড়ি এখন যেন এক ব্যক্তিগত সঙ্গীত জাদুঘর। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই তিনি দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে পুরনো ও অপ্রচলিত ক্যাসেট সংগ্রহ করেছেন, আর সেগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন নিজের ঘরে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়া সেই সংগ্রহশালায় রয়েছে শত শত সিডি, বিশ্বের নানা দেশের গায়কদের বিরল পোস্টার―কিন্তু এখানে আকর্ষণের কেন্দ্রে অসমের গায়ক ও সুরকার জুবিন গর্গের অমূল্য সঙ্গীতসম্ভার।
অসমের এক সাংস্কৃতিক প্রতীক হলেন জুবিন গর্গ। গত মাসে সিঙ্গাপুরে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে লাখো ভক্ত শোকাহত।তবে ভক্তদের সেই দুঃখ ঘোচাবে কালিতার সংগ্রহ। তাঁর কাছে রয়েছে গায়কের প্রায় ৩৮,০০০ গান—যার অনেকগুলিই আজ কোথাও আর শোনা যায় না। মৃত্যুর ক’দিন আগে অর্থাৎ ১৬ সেপ্টেম্বর, জুবিন গর্গ নিজেই গিয়েছিলেন কালিতার বাড়িতে। তিনি বলেছিলেন, এই সংগ্রহ দেখে তাঁর ‘অনেক পুরনো, ভুলে যাওয়া সৃষ্টিগুলো’র কথা মনে পড়ছে। বর্তমানে কালিতা যুক্ত হয়েছেন গর্গের বন্ধু ও ভক্তদের এক বৃহত্তর উদ্যোগে — যেখানে তাঁরা চেষ্টা করছেন তাঁর সৃষ্টিগুলোকে অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সহজলভ্য করতে এবং তাঁর পরিবার যাতে রয়্যালটি পায়, তা নিশ্চিত করতে। আর এখানেই আসছে সেই অমোঘ প্রশ্ন — কালিতা কি পারবেন?
কালিতা এবং জুবিনের বন্ধু-ভক্তকুলের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অসাধারণ। তবে এক্ষেত্রে জটিলতা প্রচুর। গর্গের অনেক গানই বর্তমানে অনলাইনে আপলোড করা যায় না, কারণ কপিরাইট লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকে। মালিকানা ঘিরে বিস্তর ধোঁয়াশা রয়েছে—প্রযোজক, ডিস্ট্রিবিউটর, থেকে রেকর্ড লেবেল কোম্পানি, সকলেই গানের অধিকার দাবি করেন। তবে এই সমস্যা শুধু জুবিনের নয়—সঙ্গীতের মালিকানা নিয়ে লড়াইটা গোটা বিশ্বেই বেশ পুরনো। ১৪ বার গ্র্যামিজয়ী টেলর সুইফটকেও নিজের অ্যালবামগুলো নতুন করে রেকর্ড করতে হয়েছিল, কারণ হচ্ছে যাতে তিনি কপিরাইট না খান, তাঁর গানগুলির পূর্ণ মালিকানা বা স্বত্ত্ব যাতে সুইফটেরই থাকে। অনেক গায়কই এখন নিজেদের লেবেল খুলছেন, যাতে অন্তত আংশিক নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন নিজের কাজের উপর। আর ভারতেও বহুদিন ধরেই গানের সৃষ্টিকর্তাদের তুলনায় প্রযোজক ও লেবেলগুলির দিকেই চুক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকে থাকে―ফলে দেখা যায় গায়ক, সুরকার বা গীতিকাররা রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত হন।
এই কপিরাইট বিড়ম্বনা যে কি বিশ্ম বস্তু, জুবিন গর্গের মৃত্যুর পর তাঁর ভক্তরা সেটা বেশ টের পেয়েছেন। গায়ক চলে যাওয়ার পর তাঁর গানগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খুঁজছিলেন অনেকেই। তাঁর বিখ্যাত গান ‘মায়াবিনী রাতির বুকুত’ এক জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ছিল, তবে তা আর পাওয়া যাচ্ছিল না। একজন ব্যবহারকারী পরে গানটি আবার আপলোড করলেও, এক সপ্তাহের মধ্যে তা সরিয়ে দেওয়া হয় লাইসেন্স সংক্রান্ত কারণে। চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গর্গের বন্ধু মানস বরুয়া সংবাদমাধ্যমে সাফ জানিয়েছিলেন যে তাঁর শত শত গানের মালিকানা আজ খুঁজে পাওয়া যথেষ্ট কঠিন বা বেশ বিতর্কিত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গানের শব্দের উপর অধিকার থাকে গীতিকারের, সুরের অধিকার সুরকারের, আর রেকর্ডিংয়ের মালিক হন প্রযোজক। সহজ করে বলি? গানের রেকর্ডিংয়ের ‘প্রথম মালিক’ ধরা হয় প্রযোজককে। তাঁরা চাইলে এই মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন বা তৃতীয় পক্ষকে লাইসেন্স দিতে পারেন। এক্ষেত্রে সব নথি যদি ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হয়, তাহলে বছর কয়েকের মধ্যেই মালিকানার জট তৈরি হয়। ভারতের Copyright Act, 1957 অনুসারে গানের লিরিক্স বা গীতলেখ এবং মিউজিক্যাল কম্পোজিশন (সুর-লয়) লেখক-রচয়িতার হয়। সাউন্ড রেকর্ডিং-এর ক্ষেত্রে প্রযোজককে প্রথম আনুমানিক স্বত্বাধিকারী ধরা হয়। এরপর এই স্বত্ব বা এক্সক্লুসিভ/নন-এক্সক্লুসিভ লাইসেন্স দ্বারা তৃতীয়-পক্ষকে হস্তান্তর করা যেতে পারে। এই পক্ষে থাকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, ডিস্ট্রিবিউটর ও লেবেলধারীরা। ডিজিটাল যুগে স্ট্রিমিং-লাইসেন্সিং, রয়্যাল্টি সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে। বর্তমানে যেকোনও গান অনলাইনে আপলোড করতে স্বত্বাধিকারীদের স্পষ্ট স্বীকৃতি দিতে হয়, ঠিক রাখতে হয় রয়্যাল্টি চ্যানেল ও মেটাডেটা।
চলচ্চিত্র নির্মাতা মানস বরুয়ার মতে, ‘একসময় প্রযোজকরা কোনও অর্থ না নিয়েই কপিরাইট বিতরণকারীদের হাতে গান তুলে দিতেন। তখন গান বিক্রি মানে ছিল ক্যাসেট আর সিডি। তাই তারা বিতরণকারীদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।’ এইবার পরিস্থিতি পালটায় বেসরকারি রেডিও চালু হওয়ার পর। তখন রেডিও সংস্থাগুলোকে বড় অঙ্কের লাইসেন্স ফি দিতে হত। পরে অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম আসায় এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়ে, আরও বাড়ে রেভিনিউ। এসবের মাঝে পড়ে গর্গের অনেক গান আজও অনিশ্চিত মালিকানার জালে আটকে রয়েছে। কেউ কেউ অনলাইন মঞ্চে কোনও পুরনো গান আপলোড করলেও, বারবার তা সরিয়ে দেওয়া হয়। অনেক পুরনো ট্র্যাক তো কখনও ডিজিটাইজই করা হয়নি।
অসমের চলচ্চিত্র প্রযোজক ও গর্গের সহকর্মী শ্যামন্তক গৌতম একটি দল গঠন করেছেন। তাঁরা গর্গের লেখা, সুর করা ও গাওয়া সব গান নথিবদ্ধ করছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান যে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১,০৩৩টি গান ইন্ডিয়ান পারফর্মিং রাইট সোসাইটি অর্থাৎ IPRS-এ নথিভুক্ত করা হয়েছে। IPRS-এর CEO রাকেশ নিগম এই কপিরাইট প্রসঙ্গে সাফ জানান যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বেড়ে যাওয়ায় মালিকানা ট্র্যাক করা এখন আরও জটিল হয়ে উঠলেও গর্গের গানগুলো তাঁর মৃত্যুর পরও ৬০ বছর পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকবে। তবে এখানে সমস্যা অন্য জায়গায়! গর্গের গানগুলোর প্রযোজকরা অসমের, তাই তাঁদের চেনা সম্ভব। আসল সমস্যা শুরু হয় তারপর―শেষ পর্যন্ত কোন গানের লাইসেন্স হাতেকার হাতে, সেটা খুঁজতে বেরলেই সমস্যায় পড়ছে IRPS।
জুবিন গর্গের মৃত্যুর পর তাঁর সৃষ্টি ঘিরে এই যে ক্রমবর্ধমান জটিলতা, তাতে প্রশ্নের মুখে ভারতের আরও বহু গায়কের ভবিষ্যৎ। এখন বড় প্রশ্ন — তাঁদের সৃষ্টির প্রকৃত মালিকানা কার, আর সেই অনুযায়ী তাঁরা বা তাঁদের পরিবার কতটা ন্যায্য পারিশ্রমিক পান? এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম প্রায় ৪০,০০০ গানের গায়ক হয়েও একসময় ইলাইয়ারাজার সঙ্গে কপিরাইট টানাপোড়েনের জেরে আদালতে গিয়েছিলেন। লতা মঙ্গেশকরও শিল্পীদের রয়্যালটি নিয়ে আজীবন লড়াই করে গিয়েছেন। এর জন্য বহু প্রযোজক ও সহশিল্পীর সঙ্গে তাঁর একসময়ে মতবিরোধ হয়েছিল। গর্গ বা তাঁর সমসাময়িকদের অনেক আগেই, ১৯৮০ সালে কিংবদন্তি কেজে যেসুদাস নিজস্ব রেকর্ড লেবেল গড়ে তুলেছিলেন — উদ্দেশ্য ছিল একটাই, নিজের সৃষ্টির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা। যদিও একসময় অন্য গায়ক এবং লেখকের গান অনুমতি ছাড়াই রেকর্ড করার অভিযোগ উঠেছিল জুবিনের বিরুদ্ধে!
গুয়াহাটিতে বিশাল কালিতা এখন চেষ্টা করছেন জাপানি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে গর্গের কিছু বিরল টেপ ডিজিটাইজ করতে। গর্গের বহু গানই অনলাইনে কোথাও নেই। তাঁর এই গান নিয়ে কপিরাইটের এই যে টানাপোড়েন, তা কবে মিটবে? সংগ্রহে রাখার জন্য কালিতাকেও কি সমস্যায় পড়তে হবে? রয়্যালটি পেতে জুবিনের পরিবারের কি কোনও সমস্যা হবে? আগামীতে আইনের কি কোনও বড় রদবদল হবে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আপাতত অপেক্ষা করতেই হবে। জুবিনের গলা যাতে কেউ কপি করতে না পারেন বা AI অনুমতি ছাড়া ব্যবহার যাতে না করতে পারে, তার জন্য ইতিমধ্যেই ‘ভয়েস ডিজিটাল সিগনেচার’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দিনশেষে যেটা সত্যি, সেটা হল জুবিন আর নেই। এই বিশাল সৃষ্টি তিনি ছেড়ে গিয়েছেন আপামর জনতার জন্য। জীবদ্দশায় এইসব কপিরাইটটের ধার ধারতেন না খুব একটা, আর এখন আক্ষরিক অর্থেই জুবিনের খুব একটা যায় আসে না।