Fatakesto, Kali Pujo 2025: কেষ্ট থেকে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন 'ফাটাকেষ্ট'? - Bengali News | Kali Puja 2025: How Krishnachandra Dutta became Fatakesto? - 24 Ghanta Bangla News
Home

Fatakesto, Kali Pujo 2025: কেষ্ট থেকে কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন ‘ফাটাকেষ্ট’? – Bengali News | Kali Puja 2025: How Krishnachandra Dutta became Fatakesto?

Spread the love

মারব এখানে লাশ পড়বে শ্মশানে! ডায়লগটা মিঠুন চক্রবর্তীর। চরিত্রের নাম? কেষ্ট, ফাটাকেষ্ট! বাংলার প্রথম মিথ থেকে মস্তান হয়ে দেখিয়েছিলেন। ছোটখাটো নয়, একেবারে রাশভারী প্রতাপশালী গুণ্ডা। আজ কালীপুজো। বাংলার ঘরে ঘরে আজ আলোর উৎসব। তবে প্রদীপের নিচের অন্ধকারটাও তো বেশ গাঢ়, তাই না? সেই অন্ধকারে থেকেও আলোর জগতের সঙ্গে খাপ খাইয়েছিলেন নিজেকে, শুরু করেছিলেন ফাটাকেষ্টর কালীপুজো!

সময়টা স্বাধীনতার ৮-৯ বছর আগের। কলেজ স্ট্রিটে একটা ছোট্ট পানের গুমটি, বাবার কাজকর্ম দেখতে দেখতে একটা ছোট্ট ছেলে ভাবছে অনেক কিছু। ঠনঠনিয়ার কালীপুজোর আলো ফুটপাথের ঠিক উল্টোদিকে যে কোণে পৌঁছায় না, সেখানে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ভাবছে একদিন এর থেকে বড় পুজো করব, লোকে তাকিয়ে দেখবে। কাট টু ১৯৫৫, উত্তর কলকাতার কলেজ স্ট্রিট লাগোয়া গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনের একটা কালীপুজো। যে ছেলেটা শুরু করল পুজো, বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্য হতেই পুজো সরিয়ে আনল সীতারাম স্ট্রিটের একটা ঘরে। পুলিশ-প্রশাসনের অনুমতি পেতেই যা নেমে এল রাস্তায়! শরীরচর্চায় বুঁদ সেই ছেলে তখন হয়ে উঠছে এলাকার সম্রাট, নাম? কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। পরবর্তীতে যা হয়ে গিয়েছিল ‘ফাটাকেষ্ট’!

১৯৫০ সালের শেষদিকের কথা। মনোহর আইচের পাঠশালায় নাম লেখালেন কৃষ্ণচন্দ্র। ডাম্বল ভেঁজে, পালোয়ানি করার পর পাঁউরুটি আর পাঁঠার গুরদা সেদ্ধ করে খেতেন। দুধের সঙ্গে গুলে নিতেন কাঁচা ডিম, ঢকঢক করে খেয়ে নিতেন। দশাসই চেহারার কৃষ্ণচন্দ্র তখন কুখ্যাতি কুড়োচ্ছেন ক্রমশ। গুণ্ডাদের জগতেও তো প্রবল কম্পিটিশন, এরই মাঝে বরাহনগরের মস্তান নীলুকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণের উপর চড়াও হলেন পাড়ার আর এক মস্তান নকুল। ছুরিতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও হাল ছাড়েননি। ছুরির ডুয়েলে জয়ী হয়ে মেডিক্যালে ভর্তি হলেন। যমে-মানুষে টানাটানির পর মুক্তি পেলেন হাসপাতাল থেকে। কাটাকুটি ভরা শরীর নিয়ে কেষ্ট যখন বেরোলেন, তাঁর খ্যাতি ছড়াল ‘ফাটাকেষ্ট’ নামে।

এরপর ফাটাকেষ্টর জীবনের গ্রাফ শুধুই ঊর্ধ্বমুখী। নকশালদের আক্রমণ সামলে স্ট্র্যাটেজি সাজিয়ে নিলামের কারবার সামলাতেন দাপট বজায় রেখে। নকশাল আমলে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। মির্জাপুর স্ট্রিটের তখনকার এক ছোটখাটো গুণ্ডার নাম শুনলে হাসবেন, গণ্ডার! সেই গণ্ডার একটা বোমা ছুড়ে মারে ফাটাকেষ্টর গায়ে, তবে ফাটলই না সেই বোমা। সেই বোমা হাতে তুলে পাল্টা কেষ্টই নাকি ছুড়ে মারেন! এ তো গেল ডাকাবুকো ফাটাকেষ্টর কথা। পড়াশোনার দৌড় বেশি দূর না হওয়ায় কারবার সামলাতে বেশ সমস্যা হত ফাটাকেষ্টর। চেকে পর্যন্ত সই করতেন বাংলায়। তবে কলকাতার কোনও ব্যাঙ্কের ঘাড়ে ক’টা মাথা যে ফাটাকেষ্টর চেক গ্রহণ করবে না?

ফাটাকেষ্টর কালীপুজোর নাম তখন ছড়িয়ে গিয়েছিল স্বমহিমায়। যাঁদের কাছে কখনও পৌঁছনোর মতো ক্ষমতা ছিল না কেষ্টর, তাঁরাই পাড়ার মাচা শো’য়ে আসতেন ফাটাকেষ্টর এক ডাকে। পুজোমণ্ডপের একটু দূরেই ফাটাকেষ্টর নবযুবক সঙ্ঘের ক্লাবঘর। রাজেশ খান্না, অমিতাভ, বিনোদ খান্না থেকে আশা ভোঁসলে, জিতেন্দ্র বা মালা সিনহা―কে আসেননি ওই সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে! সালটা ১৯৭৩, রাজেশ খান্না-অমিতাভ আর রেখা, এই ত্রয়ী কাঁপন ধরিয়েছে গোটা ভারতে। ‘নমকহারাম’ তখন হলে হলে। অমিতাভ তখনও বিগ-বি হননি। ফাটাকেষ্টর এক ডাকে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের ছোট্ট মঞ্চে হাজির হলেন ৬ ফুটের অভিনেতা, ছুড়ে দিলেন ডায়লগ। অভিভূত হয়ে শুনল গোটা কলকাতা। পরবর্তীতে হিরে বসানো একটা নাকছাবি পাঠান অমিতাভ, সোনার সেই গয়না চুরি হয়ে গেলেও পুনরুদ্ধার করে ফাটাকেষ্টর দলবল।

কালীপুজোর তখন সেই রমরমা, দাপট বাড়ছে একটু একটু করে। একবার তো সেই কাণ্ড ঘটল! কলকাতা ইতিপূর্বে এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি। যোগীগুরু ওঙ্কারনাথ কাশী থেকে কলকাতা এলেন। সে সময়ে দীপান্বিতার মুহূর্ত। এক বার মায়ের দর্শন করতে চাইলেন ওঙ্কারনাথ। কথাটা পৌঁছল ফাটাকেষ্টর কানে, যদুনাথ বোস লেন থেকে নিজের কাঁধে করে গুরুদেবকে মায়ের মণ্ডপে নিয়ে গিয়েছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ কেষ্ট! নকশাল আমলের সেই কলকাতা শহর অমন হইহই বহুকাল করেনি।

সালটা ১৯৮২। একটা কালো গাড়িতে করে এলেন সেলিব্রিটিরা। কালো কাচের কালো গাড়ি! ভিতরে কে? খবর ছিলই। আশা ভোঁসলে নামলেন। তবে সঙ্গে করে যে স্বয়ং আরডি বর্মন সাহেব এসেছেন, তা কে জানত। হইহই পড়ে গেল। সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের মাচার অনুষ্ঠানে তখন পাশাপাশি দুই কিংবদন্তি। মোহমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল গোটা কলকাতা। নাম ছড়িয়ে গেল ফাটাকেষ্টর।

উত্তমকুমারও মৃত্যুর আগের বছর পর্যন্ত একটানা এসেছেন এই দীপান্বিতা কালীপুজোয়। ফাটাকেষ্ট যখন নেমন্তন্ন করতে যেতেন, উত্তমবাবু বলতেন, ‘শুটিং না পড়লে পুজোর সময়ে যাব, না হলে আগেভাগেই যাব।’ জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রণাম সেরে প্রতিবারই মঞ্চে কিছু না কিছু বলে যেতেন উত্তমকুমার। কোনও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেজ নেই, খোলা রাস্তায় ম্যারাপ বাঁধা, সেখানেই অনুষ্ঠান করে গিয়েছেন একের পর এক নামজাদা সেলেব। তনুশ্রীশংকর-আনন্দশংকর যখন এসেছিলেন, তাঁদের অনুরোধেই মঞ্চের একটা দিক শুধু ঘিরে দেওয়া হয়েছিল।

১৯৯২ সালে প্রয়াত হন ফাটাকেষ্ট। তবে আজও সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের ওই দশ ফুটের গলি জুড়ে ঘননীল বরণ শ্যামা মা আসেন দীপান্বিতা তিথিতে। বাংলার প্রথম সিলমোহরপ্রাপ্ত ডনের লিগাসি আজও ফাটাকেষ্টর পুজো নামেই চলছে বহাল তবিয়তে। তার গরিমা কোথাও ম্লান হয়নি এতটুকু…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *