Explained: হবেন গাজ়ার রাজা? ট্রাম্পের শান্তি চুক্তিতেই লুকিয়ে আসল খেলা – Bengali News | Gaza Peace Plan: How Trump Wants to Become the ‘King of Gaza
নয়াদিল্লি: অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু, অক্টোবরেই শেষ। মাঝে কেটে গিয়েছে দু’টো বছর। বদলেছে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ। বদলেছে দুই দেশের রূপ। সংঘাত বলা হোক বা যুদ্ধ, মোটের উপর ইতিহাস সাক্ষী থেকেছে আরও এক ভয়াবহ অধ্যায়ের। ইজরায়েল-প্যালেস্তাইনের এই যুদ্ধ মনে রাখবে বিশ্ববাসী। তবে অতীত হিসাবে। সোমবার তেল আভিভের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে ট্রাম্প বলে দিয়েছেন যুদ্ধ থেমে গিয়েছে। গাজা শান্তি চুক্তি মেনেই শুরু হয়ে গিয়েছে সংঘর্ষবিরতির কাজ। কিন্তু কোন শর্তে? আর সব সংঘাতগুলোর মতোই গাজ়ার যুদ্ধ থামাতে স্বাভাবিকভাবেই মধ্যস্থতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের প্রস্তাবে শুক্রবার সম্মতি জানিয়েছে দুই পক্ষই।
এক টুকরো ইতিহাস
ইজরায়েল-প্যালেস্তাইনের অতীত মোটেই অল্প কয়েকটা পর্বের নয়। বরং এটা একটা উপন্যাস-সম। যার মধ্য়ে রয়েছে অভ্য়ন্তরীণ সংঘাত, রাজনীতি, ক্ষমতা দখলের লড়াই ও সর্বোপরি ধর্মের লড়াই। যা আবার জিইয়ে রেখেছে অস্তিত্বের লড়াইকেও। সেই অস্তিত্বের খাতিরেই আবার বারংবার সংঘাত বেঁধেছে এই দুই দেশের মধ্যে। ১৯৯৪ সালে প্রথম গাজা স্ট্রিপের নিয়ন্ত্রণ পায় প্যালেস্তাইন প্রশাসক, পক্ষান্তরে হামাসরা। পরবর্তীতে সেই হামাসদের আধিপত্য় বৃদ্ধি মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল ইজরায়েলের কাছেও। এমনকি, ২০২৩ সালে ৭ অক্টোবর সেই আধিপত্যের আরও একটা নজির তৈরি করতেই ইজরায়েলের উপর হামলা চালিয়েছিল সশস্ত্র হামাসবাহিনী। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, প্যালেস্তিনীদের উপর ইজরায়েল বাহিনীর অত্যাচার, গাজার বিভিন্ন অংশ দখলকে রুখতেই সেই হামলা চালায় তাঁরা। যা পরবর্তীতে ডেকে আনে এক ভয়াবহ সংঘাতকে। ইজরায়েলের এক ভয়াল রূপ দেখে গোটা বিশ্ব। সেনার দাপটে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় বন্ধ হয়ে যায় ত্রাণ পাঠানো। গাজা সাক্ষী থাকে মন্বন্তরের। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, দু’বছর ব্যাপী এই সংঘাতে মোট ৬৬ হাজার প্যালেস্তিনীয়দের প্রাণ গিয়েছে। অন্য়দিকে, ইজরায়েল নিহত হয়েছে ১২০০ জন।
ট্রাম্পের ‘এন্ট্রি’
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে একটাই দাবি করে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর সময়কালে এই সব সংঘাত শুরু হলে কয়েক মাসের বেশি মোটেই টিকত না। সংঘাত তাঁর পছন্দ নয়। তাই মধ্যস্থতার মাধ্যমেই সব ঠিক করে দিতেন। ক্ষমতায় ফেরার পর সেটাই করার চেষ্টা চালিয়েছেন বললেই চলে। এই বছরের শুরুর দিক থেকে ইজরায়েল-গাজা যুদ্ধ থামাতে উদ্য়োগী হন ট্রাম্প। প্রথম চেষ্টা সাফল্য মেলে না। কিছুদিন সংঘর্ষবিরতি চলে। তারপর আবার যে কে সেই। উল্টে আরও ভয়াল রূপ দেখায় নেতানিয়াহুর সেনা। গাজাকে ঘিরে ধরে চলে তাঁদের অভিযান। নেতানিয়াহু সেনা দাপাদাপিতে নরকে পরিণত হয়েছে গাজ়া ভূখন্ড। কিন্তু সেই নরকে থেকেও এখনও বহু মানুষ স্বপ্ন দেখছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের। যে স্বপ্নের আবার ‘কারিগর’ হয়েছেন ট্রাম্প।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের তৈরি গাজ়া শান্তি চুক্তিতে সম্মতি জানিয়েছে হামাস বাহিনী। ইজরায়েল তরফে এই নিয়ে আগে সম্মতি জানান হলেও, সশস্ত্র হামাস গোষ্ঠী ছিল নীরব। অবশেষে রাজি হয়েছে তাঁরাও। কিন্তু কী কী শর্ত সেখানে ফিরছে শান্তি? জানা গিয়েছে, গাজ়া শান্তি চুক্তিতে মোট ২০ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কী সেই প্রস্তাবগুলি? জেনে নেওয়া যাক, এক নজরে।
- গাজা ভূমকে সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে।
- জনগণের স্বার্থে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে নতুন করে তৈরি করা হবে।
- এই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পর মুহুর্তেই উভয় পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে হবে। নেতানিয়াহু তাঁর সেনাকে মোতায়েন থাকা এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবে। কোনও রকম বোমাবাজি, গুলি চালানো যাবে না। পাশাপাশি, হামাসদের আটক থাকা সমস্ত ইজরায়েলি পণবন্দিকে মুক্ত করতে হবে।
- হামাসরা পণবন্দিদের মুক্ত করার ৭২ ঘণ্টার মধ্য়ে ইজরায়েলকেও সমস্ত হামাস ও প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের মুক্ত করে দিতে হবে।
- পণবন্দিরা যে যার দেশে ফিরে গেলে হামাস বাহিনীর সদস্যদের বন্দুক ছাড়তে হবে।
- পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই গাজ়াবাসীর স্বার্থে পৌঁছে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ত্রাণ, আবার খুলে দেওয়া হবে সমস্ত সড়ক পথ, তৈরি করে দেওয়া হবে হাসপাতাল, ঘর-বাড়ি।
- খুলে দেওয়া হবে মিশর ও গাজার মধ্যে সংযোগকারী পথ রাফা ক্রসিং। পাশাপাশি, এই ত্রাণবিলির কাজে কোনও ভাবে ইজরায়েল কিংবা হামাস বাহিনীর কোনও প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকতে পারবেন না। সম্পূর্ণ ভাবে রাষ্ট্রপুঞ্জের মাধ্যমে হবে সেই কাজ।
- গাজার তৈরি হবে নতুন কেয়ারটেকার সরকার। যাতে একদিকে থাকবে প্যালেস্তিনীয় প্রতিনিধি এবং অন্যদিকে থাকবে বেশ কয়েক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। এই সরকার ঠিক মতো কাজ করছে কিনা সেই সংক্রান্ত নজরদারি চালাবে বর্ডার অব পিস নামে একটি আন্তর্জাতিক বডি। যার আবার নেতৃত্বে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গাজার সকল উন্নয়নমূলকের কাজের অনুদান জোগাড়ের কাজ হবে এই বোর্ডটিরই।
- ট্রাম্পের বুদ্ধিতেই হবে উন্নয়ন ও গাজা পুনর্গঠনের কাজ।
- তৈরি করা হবে বিশেষ অর্থনৈতিক করিডর।
- যারা গাজায় থাকতে চান, তারা থাকতে পারবেন। কেউ আপত্তি দেখাবে না।
- গাজায় তৈরি কেয়ারটেকার সরকারে হামাসদের কোনও ভূমিকায় রাখা হবে না।
- হামাসরা যাতে গাজা ও পার্শবর্তী দেশগুলিতে কোনও ভাবে পুনরায় প্রভাব তৈরি করতে না পারে, সেটাই সুনিশ্চিত করবে কেয়ারটেকার সরকার।
- গাজার নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা হবে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স। আরব ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করে এই বাহিনী গঠন করবে আমেরিকা।
- গাজা দখলের স্বপ্ন ছাড়তে হবে নেতানিয়াহুকে।
এছাড়াও শান্তি ফেরাতে আরও বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকা। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কয়েক দফা। যার প্রথম দফার কাজ সম্পন্ন হয়েছে সোমবার। ইজরায়েলে গিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সমস্ত ইজরায়েলি পণবন্দিদের ছেড়ে দিয়েছে হামাস বাহিনী। শান্তি ফেরানোর এই চুক্তির প্রথম দফা নির্বিঘ্ন সম্পন্ন হলেও, বাকি সব ক’টি প্রস্তাবে যে হামাস বাহিনী সম্পূর্ণভাবে রাজি হয়েছে এমনটা নয়। কারণ, তাঁরা এতে সম্মতি দিলে তাঁদের ক্ষমতা একেবারে হারিয়ে যাবে বললেই চলে। আর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামাস-ইজরায়েল এসব কিছুই নয়। শান্তির দূত হয়ে গাজার মাথায় বসার স্বপ্ন দেখছেন ট্রাম্প। এক সঙ্গে শাসন করতে চান দু’টি দেশ।