Raghu Dakat: রঘু ডাকাত―কিংবদন্তি নাকি ইতিহাস? - Bengali News | West Bengal History: Raghu Dacoit and history of colonial india - 24 Ghanta Bangla News
Home

Raghu Dakat: রঘু ডাকাত―কিংবদন্তি নাকি ইতিহাস? – Bengali News | West Bengal History: Raghu Dacoit and history of colonial india

Spread the love

বড় গোঁফ, প্রকাণ্ড পাগড়ি, আর পেল্লায় দেহ। রাতের অন্ধকারে টগবগ টগবগ ঘোড়ার খুরের শব্দ, হাতে জ্বলন্ত মশাল। আজও এই ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠলে বাঙালির ছোটবেলার ভয়-মাখা গল্প মনে পড়ে—চরিত্রের নাম রঘু ডাকাত। বাঙালির লোককথা ও লোক-ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র এই রঘু, কিন্তু তিনি কি ব্রিটিশ-শাসিত বাংলায় দাপিয়ে বেড়ানো রক্ত-মাংসের একজন মানুষ ছিলেন? নাকি রঘু ডাকাত পাঁচকড়ি দে’র খোঁচায় জন্ম নেওয়া একজন কাল্পনিক চরিত্র মাত্র?

সালটা ২০২৫, হলে মুক্তি পেল ‘রঘু ডাকাত’। নাম ভূমিকায় দেব। রিল থেকে রিয়েলে যেতে একটু পিছিয়ে যেতে হবে। সময়টা অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ। একদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক শাসন, অন্যদিকে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার। এই সময়েই বাংলার মাঠে-ঘাটে একটি নাম আতঙ্কের জন্ম দিত—রঘু ডাকাত। রঘু ডাকাত কি শুধুই সাহিত্যের কল্পনায় বেঁচে আছেন, নাকি ইতিহাসের পাতায় তাঁর উপস্থিতি একেবারে স্পষ্ট?

গালগল্পে রঘু ডাকাতের আর এক পরিচয় ছিল, তিনি ছিলেন মা কালীর উপাসক, একজন মহাতান্ত্রিক। জনশ্রুতিতে, রঘু ডাকাত তাঁর তন্ত্রাচারের কালীপুজোর জন্য নরবলি দিতেন। সেই ভয়ঙ্কর বলিকাষ্ঠে একবার ধরে আনা হয়েছিল স্বয়ং শ্যামা-সংগীতের রচয়িতা রামপ্রসাদ সেনকে। বলি দেওয়ার ঠিক আগেই রামপ্রসাদ তাঁর শেষ ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন, গলা ছেড়ে তিনি গান ধরলেন—‘তিলেক দাঁড়া ওরে শমন বদন ভরে মাকে ডাকি…’! আর তখনই ঘটল চমৎকার। রঘু ডাকাত বলিকাষ্ঠে রামপ্রসাদের বদলে দেবীকে দর্শন করলেন! সেই মুহূর্তে তাঁর জীবনে আসে মহা পরিবর্তন, নরবলি বন্ধ করে পাঁঠাবলি শুরু করেন রঘু।

ছোটবেলার গল্পগুলিতে রঘু শুধুমাত্র একজন ডাকাত ছিলেন না। রবিনহুডের ধাঁচে রঘুর চরিত্র নির্মিত হয়েছে বারবার, আর এর ফলেই একজন সাধারণ ডাকাত থেকে একজন মিথিক্যাল হিরো-তে পরিণত হয়েছিলেন রঘু। কলকাতার পূর্ণদাস রোডের কালীমন্দির হোক বা বর্ধমান, হুগলির অসংখ্য কালীবাড়ি, বহু মন্দিরই তাঁর নামে চলে। অথচ ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, সেগুলির প্রতিষ্ঠাতা অন্য কেউ, কিংবা মন্দিরগুলি রঘুর সময়ের চেয়েও বহু পুরনো। এই উদাহরণগুলিই প্রমাণ করে যে, মানুষের কল্পনায় রঘু ডাকাত, আসল রঘু ঘোষকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন বহুলাংশে। এইবার ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায় রঘু ডাকাতের প্রয়োজনীয়তা। অধিকাংশ গবেষকের মতে, রঘু ডাকাত ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ। তাঁর আসল নাম ছিল রঘু ঘোষ। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর, অর্থাৎ প্রায় আড়াইশো বছর আগের মানুষ। সেই সময় বাংলা জুড়ে চলছিল নীলকর সাহেবদের সীমাহীন অত্যাচার। জোর করে কৃষকদের ধান ফলানোর সোনার জমিতে নীল চাষ করানো হতো। যারা প্রতিবাদ করত, তাদের ওপর চলত অকথ্য নির্যাতন, এমনকি হত্যাও।

এখানেই গল্পের টুইস্ট। রঘু ঘোষের বাবা ছিলেন এমনই একজন সাধারণ কৃষক। নীল চাষ করতে রাজি না হওয়ায় নীলকরের পেয়াদারা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় এবং নির্মম প্রহারে বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। ইতিপূর্বে রঘু বাবার সঙ্গেই খেতে কাজ করত। বাবা মারা যাওয়ার ফলে মাথার উপরের ছাদ হারালেন রঘু ঘোষ। পিতৃহত্যার সেই প্রতিশোধের আগুনই পথে নামায় পিতৃহারা সন্তানকে। তবে স্রেফ পেট ভরানোর জন্য নয়, অন্যান্য দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে ডাকাতির পেশা বেছে নিলেন রঘু! বাবার মৃত্যুর পর মরিয়া রঘু ঘোষ গ্রাম্য লাঠিয়ালদের থেকে লাঠিখেলা শেখেন এবং অল্প দিনেই লাঠির ব্যবহারে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। যেই লাঠি একসময় ছিল খেলার সরঞ্জাম, সেই লাঠিই তাঁর হাতে হয়ে ওঠে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার অস্ত্র। ইতিহাস বলছে, রঘু ঘোষ এরপর শুধু ডাকাতি করেননি। তিনি অত্যাচারিত মানুষদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে শত শত লাঠিয়াল তাঁর দলে যোগ দেয়।

রঘু ঘোষ প্রথম হামলা চালান নীলকুঠিগুলিতে। লুঠপাট করেন, জ্বালিয়ে দেন নীলকরদের আস্তানা। এরপর তাঁর লক্ষ্য হয় সেইসব জমিদার ও সামন্তদের বাড়ি, যারা কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাধারণ মানুষের সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছিল। আর এখানেই রঘু ডাকাতের সঙ্গে অন্যান্য ডাকাতদের পার্থক্য। লুঠ করার পর রঘু ঘোষ সেই সম্পদ নিয়ে কী করতেন? ইতিহাস বলে, তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই লুঠের মালপত্র ভাগ করে দিতেন বাংলার গরিব ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে। নামে ‘ডাকাত’ শব্দটি জুড়লেও সর্বহারাদের কাছে রঘু ডাকাত তখন ‘মসিহা’!

এইবার ফিরে আসা প্রথমের সেই প্রশ্নে―রঘু ডাকাত কি সত্যিই এ বাংলায় দাপিয়ে বেড়াতেন, নাকি তিনি শুধুই সাহিত্যের একজন চরিত্র? উত্তর হল—তিনি দুটিই! ইতিহাসের পাতায়, তিনি ছিলেন রঘু ঘোষ—একজন বাস্তবের বিদ্রোহী। নীলকরদের অত্যাচার আর পিতৃহত্যার প্রতিশোধের আগুনে জন্ম নেওয়া এক প্রতিবাদী নেতা, যিনি তৎকালীন শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে গর্জে উঠেছিলেন। সাহিত্যে ও লোককথায়, তিনি হয়ে উঠেছিলেন রঘু ডাকাত—একজন কিংবদন্তি। তাঁর সাহসিকতা, রামপ্রসাদ সেনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের গল্প, এবং কালী মায়ের প্রতি তাঁর ভক্তি—এ সবই তাঁকে একজন সাধারণ ডাকাত থেকে বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এক অমর চরিত্রে পরিণত করেছে।

আসলে বিষয়টা খুব সহজ, ঔপনিবেশিক শাসনে যখন সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের আর কোনো ভাষা ছিল না, তখন রঘু ডাকাতের গল্প হয়ে উঠেছিল বাঙালির সাহস ও প্রতিরোধের প্রতীকী ভাষা। তাই, রঘু ডাকাত ঐতিহাসিক সত্য এবং জনমানসের কল্পনার এক অপূর্ব মিশ্রণ। ইতিহাস সাক্ষী, অষ্টাদশ শতকের বাংলায় দাপিয়ে বেড়াত বহু ডাকাত। অনেকেই জমিদারশ্রেণীদের উপর লুঠতরাজ চালাত এবং সম্পদ ভাগ করে দিত গরিব মানুষের মধ্যে। তবে এই পন্থায় কি সমাজ বদল আদৌ সম্ভব?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *