Jalpaiguri: ছিল চিঁড়ে তৈরির মিল, হয়ে গেল পুকুর, বন্যার ভয়াবহ ছবি ময়নাগুড়িতে – Bengali News | People are in distress after flood in Jalpaiguri
ঘরবাড়ি হারিয়ে দিশাহারা ময়নাগুড়ির বাসিন্দারাImage Credit: TV9 Bangla
জলপাইগুড়ি: বন্যা এক মুহূর্তে বদলে গিয়েছে গ্রামের ছবি। জলঢাকা নদীর প্রবল জলোচ্ছ্বাসে কার্যত ধূলিসাৎ ময়নাগুড়ি আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের খাটোর বাড়ি-সহ একগুচ্ছ গ্রাম। অবশিষ্ট বলতে গ্রামে আর তেমন কিছুই নেই। ইতিউতি উঁকি মারছে কয়েকটি ভগ্নপ্রায় বাড়ি। ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ি গ্রামপঞ্চায়েতের খাটোর বাড়ি, তারার বাড়ি, চারের বাড়ি গ্রাম মিলিয়ে অন্তত এক হাজার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত। ৩ শতাধিক বাড়ি আর নেই।
গ্রামে ঢোকার পথ একাধিক জায়গায় কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। ভেঙে গিয়ে জলঢাকা নদীর মূল বাঁধ। তৈরি হয়েছে সুবিশাল গর্ত। সেখানে জল জমে রয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে গ্রামবাসীদের স্থান হয়েছে প্রশাসনের ত্রাণ শিবিরে। কেউ আবার রেললাইনের পাশে উঁচু জমিতে ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে আশ্রয় তৈরি করেছেন। গ্রামবাসীদের এখন সঙ্গী বলতে শুধুই চোখের জল আর প্রশাসনের আশ্বাস।
ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার জলঢাকা নদী ঘেঁষা দুটি গ্রাম খাটোর বাড়ি ও তারার বাড়ি। পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গুয়াহাটিগামী রেলের মূল লাইন। এলাকার সাধারণ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষিকাজ। রবিবার সকালটা তাঁদের কাছে শুরু হয়েছিল আর পাঁচটা দিনের মতই। সকালের দিকে বৃষ্টি চলছিল। জলঢাকা নদীতে জল ছিল তখন অন্যান্য দিনের তুলনায় খানিকটা বেশি।
আচমকাই ভুটানের থেকে জল আসে হাতি নালায়। সেই জল এসে পড়ে জলঢাকা নদীতে। মুহূর্তের মধ্যেই নদীতে জল বাড়তে শুরু করে। গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের উঁচু রেললাইনে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। মিনিট কুড়ির মধ্যে এক ধাক্কায় নদীর জল অনেকটা বেড়ে যায়। প্রথমে বাঁধ উপচে গ্রামে জল ঢুকতে শুরু করে। এরপর বাধ ভেঙে গিয়ে তীব্র শব্দে হু হু জল ঢুকতে শুরু করে খাটোর বাড়ি গ্রামে।
মুহূর্তের মধ্যে জলের প্রবল বেগে ঘরবাড়ি এক এক করে ভাঙতে শুরু করে। বাড়ির টিনের উপর দিয়ে জল বইতে থাকে। শুরু হয় ধ্বংসলীলা। গ্রামে প্রবেশের সব রাস্তা এক এক করে ভাঙতে থাকে। ভেসে যায় গবাদিপশু। অসহায়ের মতো গ্রামের ধ্বংসলীলা দেখা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না বাসিন্দাদের। কাঁচা বাড়ি তো বটেই, কংক্রিটের পিলার দেওয়া পাকা বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাশেই রয়েছে রেলের দুটি আন্ডারপাস। আন্ডারপাসের সমান উচ্চতায় জলের স্তর চলে যায়। জলের স্রোতে উপড়ে পড়ে বড় গাছ, গার্ড ওয়াল। ভেঙে গিয়েছে পাকা রাস্তা। দু জায়গাতে অত্যন্ত পক্ষে পনেরো ফুট গভীর ও ত্রিশ ফুট চওড়া বাঁধ ভেঙে রয়েছে।
অভিশপ্ত বন্যার ধ্বংসলীলার মধ্যে গিয়ে দেখা গেল, একের পর ঘর খেলনার মতো ভেঙে পড়ে রয়েছে। রাস্তার পাশে অনেকটা জায়গাজুড়ে জল জমে রয়েছে। দেখে মনে হবে পুকুর। বাস্তবে ওখানে একটি চিঁড়ে তৈরির মিল ছিল। বন্যার জলে সব ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে। চিঁড়ে তৈরির মিল পুকুরে পরিণত হয়েছে। ওই মিলের মালিক বিমল রায় বলেন, “আমার মিল ও বাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে। পরিবার নিয়ে রেললাইনের পাশে ত্রিপল টাঙিয়ে আশ্রয় নিয়েছি।” সরকার যদি তাঁদের সাহায্য করে এবং বাঁধটা ঠিকমতো মেরামত করে দেয়, তাহলে তাঁরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গ্রামে ঘুরে দেখা গেল, ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন অনেক। কেউ আবার রেলের উঁচু জমিতে পলিথিন দিয়ে অস্থায়ী আস্তানা বানিয়েছেন। এখনও তাঁরা সরকারি সাহায্য পাননি বলে অভিযোগ। রাজনৈতিক দল বা বিভিন্ন ক্লাব কিংবা সামাজিক সংগঠনগুলির দেওয়া ত্রাণের উপর নির্ভর করে আছেন। যদিও প্রশাসনের বক্তব্য, দুর্গতদের সবরকম সাহায্য করা হচ্ছে। ময়নাগুড়ির বিডিও প্রসেনজিৎ কুন্ডু বলেন, “বন্যা শুরু হওয়ার পরই আমরা উদ্ধারকাজ শুরু করি। তারপর তাঁদের ত্রাণশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। ত্রিপল, খাবার দেওয়া হয়েছে। অনেক গবাদিপশু মারা গিয়েছে। সেগুলো সরানো হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা হচ্ছে। রোগের প্রাদুর্ভাব যাতে না হয়, তার চেষ্টা চলছে। ”
বন্যার পর সার্বিক পরিস্থিতি খারাপ বলে এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন জলপাইগুড়ির যুব তৃণমূল জেলা সভাপতি রামমোহন রায়। তিনি বলেন, “এই অবস্থায় মানুষের আতঙ্ক ও ক্ষোভ থাকা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মানবিক। প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।”