EXPLAINED: সংশোধিত ওয়াকফ আইনের কোথায় স্থগিতাদেশ? কোথায় হস্তক্ষেপ করল না সুপ্রিম কোর্ট? – Bengali News | In depth: powers of collector stayed, Non Muslims on boards limited, Supreme Court temporarily halted key provisions in new Waqf laws
কলকাতা: ওয়াকফ আইন। এই আইন নিয়ে চর্চা- বিতর্কের শেষ নেই। ওয়াকফ আইনে সংশোধন হওয়ার পর সেই বিতর্ক যেন বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ। পশ্চিমবঙ্গ সহ একাধিক রাজ্যে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে। প্রতিবাদে পথে নামে মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা। বাংলায় পথে নেমেছিলেন ISF বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী-সহ অনেকে। ওয়াকফ সংশোধনী আইন পাশ হতেই বহু মানুষের প্রশ্ন ছিল, আগে থেকেই যেগুলি ওয়াকফ সম্পত্তি, তার কী হবে? এই সম্পত্তি কি কেড়ে নেবে সরকার? সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে বড় রায় দিল। আংশিক স্থগিতাদেশ দেওয়া হল ওয়াকফ সংশোধনী আইনে। নতুন আইনের ঠিক কোন কোন অংশের উপর স্থগিতাদেশ দিল শীর্ষ আদালত? পড়ুন টিভি৯ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন।
ওয়াকফ আইন নিয়ে আলোচনা করার আগে ওয়াকফ কী, সে সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অধিকার সুরক্ষিত করার জন্যই ওয়াকফ বোর্ড তৈরি করা হয়েছিল। ১৯১৩ সালে প্রথম ওয়াকফ বোর্ড গঠিত হয়। ১৯২৩ সালে প্রণয়ন হয় মুসলমান ওয়াকফ আইন।
ওয়াকফ ভ্যালিডেটিং অ্যাক্ট, ১৯১৩: এতে পারিবারিক ওয়াকফ (Waqf-alal-aulad) বৈধতা পায়।
মুসলমান ওয়াকফ অ্যাক্ট, ১৯২৩: ওয়াকফ সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন ও তদারকির ব্যবস্থা করা হয়।
ওয়াকফ অ্যাক্ট: ১৯৫৪ সালে স্বাধীনতার পরে প্রথম সমন্বিত ওয়াকফ আইন আনা হয়। যার অধীনে ওয়াকফ বোর্ড গঠন করা হয়।
পুরনো এই আইন নিয়ে একাধিক বিতর্ক ছিল। কোনগুলি ওয়াকফ সম্পত্তি, কোন সম্পত্তিকে ওয়াকফ বলে ঘোষণা করা যায়, সেই নিয়ে বেশ ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছিল। ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ করে। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল লোকসভায় ১২ ঘণ্টা আলোচনা চলার পর রাত দুটোয় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাশ হয়। বিলের পক্ষে ২৮৮ ভোট পড়ে, বিপক্ষে ২৩২। এর পরদিনই রাজ্যসভায় বিল পেশ করা হয়। ৪ এপ্রিল মধ্য রাতে সেখানেও ওয়াকফ বিল পাশ হয় ১২৮ বনাম ৯৫ ভোটে। সংসদের দুই কক্ষেই পাশ হয় ওয়াকফ বিল। সংসদে ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাশ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেই বিলে স্বাক্ষর করলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের ফলে আইনে পরিণত হয় ওয়াকফ সংশোধনী। ৫ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর স্বাক্ষরে তৈরি হয় সংশোধিত ওয়াকফ আইন, ২০২৫।
তবে এই আইন পাশ হতেই বিরোধিতা, বিতর্ক শুরু হয়। ওয়াকফ আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামলা হয় সুপ্রিম কোর্টে। এআইএমআইএম সাংসদ আসাউদ্দিন ওয়াইসি, দিল্লির বিধায়ক আমানাতুল্লাহ খান থেকে শুরু করে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র, আরজেডি সাংসদ মনোজ কুমার ঝা সহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও ইসলামিক সংগঠন মামলা করেন।
সুপ্রিম কোর্টে ৪ মাস ধরে এই মামলার শুনানি চলে। আর্জি জানানো হয়েছিল, এই আইনে সম্পূর্ণ স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক। গত ২২ মে ওই মামলায় রায়দান স্থগিত রেখেছিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিআর গভাইয়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। এদিন এই মামলায় রায় জানাল সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট ওয়াকফ আইনের উপরে সম্পূর্ণ স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করে। তবে কিছু কিছু বিধানের অন্তর্বর্তী সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলেই উল্লেখ করেছে শীর্ষ আদালত।
কী বলা হয়েছে রায়ে-
এদিনের রায়ে মূল যে বিষয়টির উপরে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে, তা হল ওয়াকফ সম্পত্তি দান নিয়ে যে সংশোধনী আইনে বিধান দেওয়া হয়েছিল, তার উপর। ওয়াকফ সংশোধনী আইনে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি পাঁচ বছর ইসলাম ধর্ম পালন না করলে তিনি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠা বা দান করতে পারবেন না। সরকার একজন (অমুসলিম) অফিসার নিয়োগ করবে, যিনি খতিয়ে দেখবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পাঁচ বছর ইসলাম ধর্ম পালন করেছেন কি না। এ বিষয়ে রিপোর্ট জমা না পড়া পর্যন্ত, ওই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন সম্পত্তি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না।
যদি তদন্তকারী অফিসার প্রমাণ পান যে ওয়াকফের নামে অধিকৃত সম্পত্তি বা জমি আদতে সরকারি সম্পত্তি, তাহলে রেভিনিউ রেকর্ডে তথ্য পরিবর্তন করার প্রস্তাব দিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে রিপোর্ট জমা দেবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর রাজ্য সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রেভিনিউ রেকর্ড পরিবর্তন করার নির্দেশ দেবে। এই ধারার উপরেই স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট ওয়াকফ সংশোধনী আইনের যে ধারাগুলির উপরে স্থগিতাদেশ দিয়েছে, সেগুলি হল-
কোনও সরকারি জমি ওয়াকফ অধিগ্রহণ করেছে কি না, তা বিচার করার জন্য সরকারের দ্বারা সরকারি অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্তের উপর স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
ওয়াকফ সংশোধনী আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তির ওয়াকফ সম্পত্তি দান করতে হলে, তাঁকে অন্তত পাঁচ বছর ইসলাম ধর্ম পালন করতে হবে। আইনের এই ক্ষেত্রের উপর স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। কোনও ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম পালন করেন কি না, তা ব্যাখ্যা করার জন্য সরকার যতদিন না আইন তৈরি করছে, ততদিন ওয়াকফ সংশোধনী আইনের এই ক্ষেত্রের উপর স্থগিতাদেশ থাকবে।
কেন্দ্রীয় স্তরে ওয়াকফ কমিটিতে অন্তত ৪ জন অ-মুসলিম এবং রাজ্যস্তরে ওয়াকফ কমিটিতে অন্তত ৩ জন অ-মুসলিম কে রাখার বিধান রয়েছে, তা আপাতত কার্যকর করতে বলা হয়েছে।
সংশোধনী অনুযায়ী, সরকার নিয়োজিত অফিসার ওয়াকফ বোর্ডের রেভিনিউ রেকর্ড খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এই আইনি সংস্থানের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ।
কেন চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল সংশোধনী আইন-
ওয়াকফ সংশোধনী আইন পাশ হওয়ার পরই ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বলেছিল, তাদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। নতুন আইনের বলে ওয়াকফ সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হবে। মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী কপিল সিব্বাল বলেছিলেন, “কোন ধর্মে উত্তরাধিকার কীভাবে হবে, তা বলার রাজ্য কে? ইসলামিক আইনে মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হয় সম্পত্তিতে। সরকার সেখানে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে।”
তবে এর বিপক্ষে যুক্তিও রয়েছে-
সংশোধনী বিলে বলা হয়েছে, ওয়াকফ আইন লাগু হওয়ার আগে পর্যন্ত যত ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্ত হবে বা হয়েছে, তার সব নথি একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে জমা করতে হবে। জমির মালিক ছাড়া কেউ ওয়াকফ হিসেবে কোনও সম্পত্তি নথিভুক্ত করতে পারবেন না।
এক্ষেত্রে জেনে রাখা দরকার, ওয়াকফ বোর্ডের হাতে ৮.৭২ লক্ষ রেজিস্টার্ড ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। দেশজুড়ে মোট ৩৮ লক্ষ একর জমি ছড়িয়ে রয়েছে ওয়াকফের। সব মিলিয়ে কম করেও দেড় লক্ষ কোটি টাকার সম্পত্তি।
‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ বিধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। ওয়াকফ কাউন্সিলে অ-মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েও প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত। কেন্দ্রের কাছে জানতে চায়, হিন্দু চ্যারিটি বোর্ডে কি মুসলিমদের অংশ হতে দেবে? তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না বলেন, “দিল্লি হাইকোর্ট নাকি ওয়াকফ জমিতে তৈরি। ওবেয়র হোটেলও ওয়াকফ জমির উপরে তৈরি…আমরা বলছি না যে সমস্ত ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ সম্পত্তি ভুয়ো রেজিস্টার করা, কিন্তু এটা নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে।”
কেন্দ্রের তরফে মামলা লড়েন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি বলেছিলেন, “ওয়াকফ সম্পত্তিতে মন্দির, দোকান রয়েছে। আইনে বলা হয়নি যে এই জমির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে। আইনে বলা হয়েছে কেন্দ্র সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত, ওয়াকফ এর সুযোগ-সুবিধা পাবে না।”
কোন জমি সরকারের, না ওয়াকফের তা কালেক্টেরের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে না। সংশোধনী আইনের নতুন এই ধারাটি মামলা বিচারাধীন থাকা পর্যন্ত কার্যকর করা যাবে না।
বারবার উঠে এসেছিল ওয়াকফ আইনের এই ৪০ নম্বর ধারার কথা। পুরনো ওয়াকফ আইনের ৪০ ধারায় ওয়াকফ সম্পত্তি নির্ধারণের ক্ষমতা নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। কোনও সম্পত্তি ওয়াকফের কি না, তা নির্ণয় করার ক্ষমতা আইনের এই ধারা। এই ধারায় বলা ছিল, কোনও জমি বা সম্পত্তি ওয়াকফের কি না, তা একমাত্র ওয়াকফ বোর্ডই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও ভূমিকা থাকে না। ৪০(২) ধারায় ওয়াকফ বোর্ডকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ কোনও জমিকে ওয়াকফের দাবি করা হলে, সেক্ষেত্রে রাজ্য বা কেন্দ্র চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। ৪০(১)(৪) ধারায় বলা ছিল, ওয়াকফ ট্রাইবুনাল ছাড়া অন্য কেউ এই সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে না।
নতুন সংশোধনী আইনে বলা হয়েছে, কোনও সম্পত্তি চাইলেই ওয়াকফ সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করা যাবে না। জেলাশাসকের হাতে এই অধিকার থাকবে। তিনি জমি পরিদর্শন ও যাবতীয় নথি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন যে ওই জমি ওয়াকফের নাকি সরকারের। সংশোধনী আইন অনুযায়ী নতুন ওয়াকফ কমিটিতে যে সরকারি অফিসার নিয়োগ হবেন, তাঁকে অবশ্যই অ-মুসলিম হতে হবে। আইনের এই ক্ষেত্রের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। নতুন আইনের ৩সি(৪) ধারায় জেলাশাসকের হাতে ক্ষমতা ছিল কোনও ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারি জমি কি না, তা পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করার। এই ধারায় স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি বিআর গভাই বলেন, “জেলাশাসকদের হাতে এই নির্ধারণ ক্ষমতা দিলে তা ক্ষমতার বিভাজনের বিরোধী। কোনও আধিকারিক নাগরিকদের অধিকার নির্ধারণ করতে পারেন না।”
ওয়াকফে মহিলাদের সংযোজন করার কথাও বলা হয়েছে। ওয়াকফ বোর্ড ও কাউন্সিলে অমুসলিম প্রতিনিধি রাখতে বলা হয়েছে নতুন আইনে। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, ওয়াকফ বোর্ডে সর্বোচ্চ ৪ জন অ-মুসলিম সদস্য থাকতে পারবেন, রাজ্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ জন থাকবেন।