Hindol Majumdar: যাদবপুরের ছেলে নাকি জঙ্গি? আলিপুর আদালতে উঠে এল বিস্ফোরক তথ্য – Bengali News | Why Ex JU Student and Researcher Hindol Majumdar Arrested?
কলকাতা: হিন্দোল মজুমদার। এই মুহূর্তে বাংলায় এই নামটা হিন্দোল তৈরি করেছে। বুধবার মধ্যরাতে স্পেন থেকে বিমানে চেপে দিল্লিতে আসেন। যাচ্ছিলেন দিদির বাড়ি। তারপর সেখান থেকে সরাসরি যাওয়ার কথা ছিল কলকাতায়। নিজের বাড়ি। কিন্তু তার আগেই তাঁকে ঘিরে ফেলে কলকাতা পুলিশ। কিছু বোঝার আগেই প্রিজন ভ্যানে তুলে সোজা থানায়। তারপর দিল্লির পটিয়ালা কোর্ট। পরে সেখান থেকে সরাসরি কলকাতার আলিপুর আদালত। যেখানে হিন্দোলকে কার্যত জঙ্গির সঙ্গে তুলনা করে রাজ্য সরকার। জঙ্গি! বিদেশে পাঠরত মেধাবী বাঙালি গবেষক, যাদবপুরের প্রাক্তনী হিন্দোল মজুমদার, জঙ্গি? কী করেছেন তিনি? তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
এই হিন্দোল মজুমদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর গাড়ির হামলায় অন্যতম যড়যন্ত্রকারী হচ্ছেন তিনি। সুদূর স্পেনে বসে ছক কষেছিলেন, কীভাবে যাদবপুরে অরজাকতা তৈরি করা যায়? আর তার প্রমাণ পুলিশের হাতে আছে বলে আদালতে দাবি করা হয়।
যাদবপুরে সেদিন কী ঘটেছিল?
পয়লা মার্চ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেছে ওয়েবকুপার বার্ষিক সাধারণ সভা। আসবেন সংগঠনের সভাপতি তথা রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন এয়ার থিয়েটারেই আয়োজন হয়েছিল সেই সম্মেলনের। শিক্ষামন্ত্রী প্রবেশের আগে থেকে একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ঝড়ের আগে যেমন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়, যাদবপুরকেও সেদিন যেন ঘিরে ধরেছিল কোনও এক ‘নিস্তব্ধতা’। একদিকে ওএটি-তে সম্মেলনের আয়োজনে ব্যস্ত শাসকদল ঘনিষ্ঠ অধ্য়াপকরা। অন্যদিকে, ব্রাত্যরই ছবি দিয়ে লাগানো GET OUT পোস্টার। শোনা গেল, তা নাকি ক্যাম্পাসেরই কিছু বাম-অতিবাম সংগঠনগুলির কাজ।
দুপুর গড়াতেই পৌঁছলেন ব্রাত্য। ততক্ষণে স্লোগান তুলতে শুরু করেছে এসএফআই, আইসা, ডিএসএফের মতো সংগঠনগুলি। তবে সেই ‘বাধা’ পেরিয়েও মন্ত্রী পৌঁছেছেন নিজের গন্তব্যস্থলে। যোগ দিয়েছেন শাসক ঘনিষ্ঠ অধ্যাপকদের বৈঠকে। আর সেখানে পৌঁছতেই কটাক্ষের সুরে নিশানা করেছেন বামপন্থী ছাত্রদলগুলিকে। যার জেরে পারদ চড়তে আর সময় লাগেনি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সম্মেলন পরিণত হল সংঘর্ষে।
এবার প্রশ্ন হল কেন এই সব ছাত্রনেতারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছে? তাদের একটাই দাবি ছাত্র সংসদ নির্বাচন করাতে হবে। আর এই দাবি নিয়ে মিছিল, বিক্ষোভ। সেখান হিংসাত্মক পরিস্থিতি। বামপন্থী সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্মেলনের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভাঙচুর চালায় তারা। ব্রাত্য বসুর গাড়ির টায়ার পাংচার করে দেওয়া হয়। এমনকি সম্মেলন সেরে শিক্ষামন্ত্রী বের হওয়ার সময় দফায় দফায় উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠে যায়। একটি ভিডিয়োয় দেখা যায়, শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি ঘিরে ধরেছেন বাম-অতিবাম ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা। কিছু পড়ুয়া আবার গাড়ির সামনেই বসে বিক্ষোভ দেখায়। আর এই সময় তালে-গোলে ঘটে যায় বিপদ।
অভিযোগ ওঠে, শিক্ষামন্ত্রীর গাড়িতে ‘চাপা’ পড়ে আহত হয় প্রথম বর্ষের ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায়। যা ঘিরে সেই গোটা দিনে শাসক-বিরোধী তরজা পায় মাইলেজ। অন্যদিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী। দেখা যায় হাসপাতালে যেতে। এই ঘটনার পর কেটে গিয়েছে পাঁচ মাস। শিক্ষামন্ত্রীর গাড়িতে হামলায় তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে পরবর্তীতে তারা জামিন পেয়ে যান। এবার হিন্দোল হচ্ছেন সেই তালিকার চতূর্থ গ্রেফতারি।
কে এই হিন্দোল? কী তাঁর পরিচয়?
হিন্দোল মজুমদার যাদবপুর বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে ফার্মেসিতে বি-টেক করেন। জানা যায়, উচ্চ মাধ্যমিকে চোখ ধাঁধানো নম্বর ছিল। ২০১৬ সালে পড়াশোনা শেষের পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে গবেষণার কাজ শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ফেলোশিপ পেয়ে চলে যান স্পেনের গ্রানাডায়। মারি কুরি ফেলোশিপ পেয়েছেন তিনি। যা অত্যন্ত সম্মানজনক এবং খুব কম ছাত্রই পেয়ে থাকেন। তাঁর সতীর্থরা বলছেন, সাহিত্যপ্রেমী, খুব ভাল গিটার বাজান। রাজনীতি তাঁর রক্তে। একজন প্রাণোচ্ছল, মেধাবী এবং সিরিয়াস মানুষ হিন্দোল। তাঁর বাবা চন্দন মজুমদার যাদবপুরের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। এই মানুষটির সঙ্গে জঙ্গির তুলনা? মানতেই পারছেন না তাঁর বাবা।
তিনি বলেন, “এটা কষ্ট কল্পনা, ও ওখান থেকে বলে দিল, এখানে সবাই করে ফেলল। এটা হতে পারে বলে মনে হয় না।” এই নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকেও। তিনি অবশ্য বলেন, “এই সংক্রান্ত কোনও খবর তাঁর কাছে ছিল না। তিনি কিছু জানেনও না।” তবে ব্রাত্য কিছু না জানলেও কুণাল কিন্তু বেশ কনফিডেন্ট। তাঁর সাফ কথা, “বেশ করেছে। পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, সেই ভিত্তিতে যা করেছে ঠিক করেছে।”
আদলতে হিন্দোল
এবার ফিরে আসা যাক আদালত চত্বরে। বুধবার রাতে গ্রেফতারি। বৃহস্পতিবার তোলা হয় দিল্লি পটিয়ালা কোর্টে। তারপর শুক্রবার তাঁকে দিল্লি থেকে সরাসরি নিয়ে আসা কলকাতায়। তারপর এখানে এনে তোলা হয় আলিপুর আদালতে।
অভিযুক্তকে ১০ দিনের হেফাজতে চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন জানায় পুলিশ। পাল্টা হিন্দোলের জামিন চেয়ে আবেদন জানায় তাঁর পক্ষের আইনজীবী।
আদালত সূত্রে খবর, এদিন অভিযুক্তের আইনজীবী কোর্টে দাবি করেন, পয়লা মার্চ অর্থাৎ ঘটনার দিন থেকে ৯ই মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন মামলা দায়ের হয়েছে। আদালতেও উঠেছে। সেই সময়কালে মোট ১৮ জনের নাম ছিল। কিন্তু তাতে তাঁর কোনও নাম ছিল না। এরপরেও কোন ভিত্তিতে লুক আউট নোটিস জারি করা হয়েছে? এটা একজন গবেষকের সাংবিধানিক অধিকার খর্বের সমান।
প্রশ্ন ওঠে লুক আউট নোটিস নিয়েও। অভিযুক্তের আইনজীবী আরও বলেন, “লুক আউট নোটিস জারি করে দিল, কাউকে জানান হল না। কাউকে নোটিস দেওয়া হল না। কাকে গ্রেফতার করছেন উনি তো কোনও অপরাধী নন। যার এখানে বাড়ি, তিনি তো পালিয়ে যেতে পারবে না। যদি তদন্তে ওনাকে প্রয়োজন ছিল, তা হলে নোটিস পাঠাতে পারত। তিনি বিদেশে থাকেন। তারপরেও কীভাবে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ?”
অবশ্য এই সমস্ত দাবিকে নস্যাৎ করে রাজ্যের পক্ষের আইনজীবীর যুক্তি, লুক আউট নোটিস আদালত নয়, পুলিশ সুপার জারি করে। পাশাপাশি, আদালতের মধ্যেই উঠে আসে উত্তেজনার দিন জাতীয় পতাকা পোড়ানোর কথাও। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে জাতীয় পতাকা অবমাননার প্রমাণ রয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন রাজ্যের পক্ষের আইনজীবী। সেই ভিত্তিতে বেশ কিছু হোয়াটসঅ্য়াপের চ্য়াটের কথাও বলেন তিনি। অবশ্য, অভিযুক্তের দাবি, “জাতীয় পতাকা পোড়ানোর মত রুচি আমার নেই।”
এরপর যা হল, তা সাধারণকেও নাড়া দিতে পারে। বাঙালির গবেষকের জামিন বিরোধিতায় রাজ্য়ের হয়ে আইনজীবী তুললেন জঙ্গি প্রসঙ্গ। বললেন, কলকাতায় আমেরিকা সেন্টারে হামলায় সশরীরে আফতাব আনসারি স্পটে ছিলেন না। দুবাইয়ে বসে ষড়যন্ত্র করেন। এখানে এক্সজিকিউট হয়েছিল। আমরা ঝাড়খন্ড থেকে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করি। বেরিয়ে এসেছিল ষড়যন্ত্রের তথ্য। পরে দুবাই থেকে গ্রেফতার হয়েছিল আফতাব।
আপাতত ১৮ই অগস্ট পর্যন্ত মূল অভিযুক্ত হিন্দোল মজুমদারকে পুলিশি হেফাজতেই রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এদিন তার পক্ষের আইনজীবী বিনয় রায় বলেন, “হিন্দোল তো স্পেনে ছিল। ও কী করে এমন ষড়যন্ত্র করবে। গল্প তৈরি করা হচ্ছে।” অন্যদিকে রাজ্যের পক্ষের আইনজীবী সৌরিন ঘোষাল বলেন, “উনি মাস্টারমাইন্ড, ওনার সঙ্গে আরও অনেকেই রয়েছে। তদন্ত চলছে।”
প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, একজন বাঙালি গবেষক ছাত্রের বিরুদ্ধে এভাবে সরাসরি জঙ্গির সঙ্গে তুলনা করা যায় কিনা! শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক বিতর্ক।
তবে, ছেলের গ্রেফতারি ‘বাঙালি অস্মিতায়’ আঘাত বলে মনে করছেন হিন্দোলের বাবা চন্দন মজুমদার। ব্রাত্য বসুর গাড়ির হামলায় এতদিন পর্যন্ত একটা ইনসিডেন্ট হিসাবেই দেখছিলেন ওয়াকিবহাল মহল। কয়েক জন গ্রেফতার হয়েছে। জামিনও পেয়েছে। কিন্তু ঘটনার পাঁচ মাসের মাথায় স্পেন ফেরত বাঙালি গবেষক ছাত্রকে গ্রেফতার করে জঙ্গির সঙ্গে তুলনা করা অবশ্যই নতুন মাত্রা পেয়েছে। সত্যিই কি বিদেশের মাটি থেকে বাংলার শিক্ষামন্ত্রী গাড়িতে হামলার ছক কষেছিলেন হিন্দোল? নাকি যাদবপুর বলেই বৃহত্তর রাজনীতির শিকার হচ্ছেন এই বাঙালি গবেষক ছাত্র? সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলবে।
