EXPLAINED: ট্রাম্পের পরমাণু হামলার হুমকিতেও কেন চুপ মস্কো? পিছনে কোন রণকৌশল? – Bengali News | In Depth: why russia is still silent on Trump nuclear submarine threat?
স্রেফ সোশ্যাল মিডিয়ার গরমাগরম পোস্ট কি আর একটা বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনবে? যেখানে দুই মহাশক্তিধর দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে ভয়াবহ পরমাণু হামলা চালাবে?
প্রাক্তন রুশ প্রেসিডেন্ট, বর্তমানে রুশ নিরাপত্তা কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভের পোস্টে রুষ্ট হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবিলম্বে নির্দেশ দেন, রাশিয়ার দিকে অন্তত দুটি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন মোতায়েনের। এই পদক্ষেপ নাকি দেশবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে। ট্রাম্প এমনটাই জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের ঘাসে লনে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু মস্কো-র হল কী?
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ট্রাম্পের হুমকির পর প্রায় তিনদিন পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিক্রিয়া আসেনি পুতিন বা তাঁর দফতরের দিক থেকে। কেন এই নিস্তব্ধতা?
মস্কো থেকে প্রকাশিত একাধিক সংবাদপত্রে ট্রাম্পের এই হুমকির সমালোচনা করেছেন একাধিক রুশ সেনাকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেনাকর্তা ‘মস্কোভস্কি কমসমোলেটস’কে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের হুমকি-কে তাঁরা আপাতত ‘ট্যানট্রামস’ হিসাবেই দেখছেন। রাগের মাথায় ট্রাম্পের বেফাঁস মন্তব্য করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এটাও সেরকমই একটা। একজন প্রাক্তন রুশ সেনাকর্তা তো আর এক সংবাদপত্রকে এও জানিয়েছেন, ‘ট্রাম্পের এই দাবি অর্থহীন। এসব বলে ট্রাম্প একটু মানসিক শান্তি পান। যাকে মার্কিনিরা ‘কিক’ বলেন।
রুশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা তো এটাও বলছেন, ট্রাম্প আসলে কোনও সাবমেরিনকেই অবস্থান বদলের জন্য নির্দেশ দেননি। কেন এই কথা বলছেন মস্কো কেন্দ্রীক বিশেষজ্ঞরা?
আসলে তাঁদের এই দাবির পিছনে ট্রাম্পেরই ২০১৭-য় করা এক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ উঠে আসছে। তখন প্রথমবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের মসনদে বসেছেন ট্রাম্প। উত্তর কোরিয়াকে শায়েস্তা করতে কোরীয় উপদ্বীপে একইভাবে দুটি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন পাঠানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তার মাত্র এক বছরের মধ্যে সেই উত্তর কোরিয়ারই খ্যাপাটে যুদ্ধবাজ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকেও বসেন ট্রাম্প।
এবারও কি তাই করবেন ট্রাম্প?
মস্কোর বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যৎবাণী, এটা কি তাহলে আমেরিকা-রাশিয়া আলোচনার প্রেক্ষাপট প্রস্তুত করছে? এতটা না হলেও মস্কোর এই নিস্তব্ধতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের অবাক করছে।
তাঁদের বক্তব্য, এখনও পর্যন্ত না ক্রেমলিন, না খোদ পুতিন এমনকী রুশ বিদেশমন্ত্রক পর্যন্ত ট্রাম্পের পারমাণবিক হামলা নিয়ে কোনও বিবৃতি দেননি। যার অর্থ এখনও মস্কো ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ নীতিতাই এগিয়ে চলছে।
এমনিতে ট্রাম্প ও মেদভেদেভের মধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় গরমাগরম চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে রাশিয়াকে ৫০ দিনের ডেডলাইন দেন ট্রাম্প। পরে নিজেই সেটাকে কমিয়ে ২ হপ্তা করে দেন। মেদভেদেভ সেসময় নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে পোস্ট করেন, ট্রাম্প রাশিয়াকে যেন হালকাভাবে না নেন। এভাবে রাশিয়াকে হুঁশিয়ারি দিলে যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই জুটবে না আমেরিকার কপালে।
ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়াতেই জবাব দেন, মেদভেদেভ-কে বলে দিন, প্রাক্তন রুশ প্রেসিডেন্ট যেন ভেবে না বসেন তিনি এখনও মস্কোর গদিতে রয়েছেন। তিনি যেন সামলে কথা বলেন। তিনি বিপজ্জনক জায়গায় ঢুকে পড়ছেন।
পাল্টা থেমে না থেকে মেদভেদেভ আবার লেখেন, সোভিয়েত জমানার ডেড হ্যান্ডের কথা যেন ট্রাম্প ভুলে না যান। তাঁর এই কথাকে খুব একটা ভাল ভাবে নেয়নি হোয়াইট হাউস।
‘ডেড হ্যান্ড’, যার পোশাকি নাম ‘পেরিমিটার সিস্টেম’ সোভিয়েত জমানার ‘সেমি অটোমেটিক নিউক্লিয়ার রিটালিয়েশন সিস্টেম’। হামলায় রাশিয়ার শীর্ষ সেনাকর্তা, এমনকী প্রেসিডেন্ট মারা গেলে স্ময়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যাবে রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার। দেশজুড়ে একাধিক ‘টপ সিক্রেট লোকেশন’ থেকে বেরিয়ে আসবে একের পর এক পরমাণু অস্ত্রবোঝাই মিসাইল। ছুটে যাবে শত্রুর দিকে। তাকে আটকানোর ক্ষমতা তখন কারও থাকবে না। রাশিয়ার গোটা পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডারে যত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, সব ‘ফায়ার’ হতে থাকবে পরপর। এই হামলা তখনই গিয়ে থামবে, যখন রুশ পরমাণু অস্ত্রাগার একদম খালি হয়ে যাবে।
২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন মেদভেদেভ। এমনিতে শুরুর দিকে বেশ লিবারেল ছিলেন। কিন্তু রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে আচমকা কট্টর পশ্চিমী বিরোধী হয়ে ওঠেন মেদভেদেভ। নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় আমেরিকা, ইউরোপকে বিঁধে একের পর এক কড়া সমালোচনা করতে থাকেন। এমনিতে ক্রেমলিন তাঁর বক্তব্য নিয়ে খুব একটা ভাবিত হচ্ছিল না শুরু দিকে। কারণ, তিনি ক্রেমলিনের কোনও মুখপাত্র নন।
আচমকাই তাঁর ‘ডেড হ্যান্ড’ সংক্রান্ত পোস্টটি খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজরে চলে আসে। শুধু নজরে আসে তাই নয়, ট্রাম্প একেবারে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এই পোস্ট দেখে। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, ট্রাম্প-ই বা কেন একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দেখে এতটা রেগে গেলেন ও মার্কিন সাবমেরিন রাশিয়ার দিকে এগোনোর নির্দেশ দিলেন?
এর খানিকটা উত্তর মিলেছে ট্রাম্পেরই একটা সাক্ষাৎকারে। সেখানে ট্রাম্প বলেছেন, ‘মেদভেদেভ যা বলেছেন সেটা খুবই খারাপ কথা। তাঁর পারমাণবিক হামলার হুমকির কথাটা আমার নজরে এসেছে। আমাকে সতর্ক হতেই হত। তুমি আমেরিকাকে পরমাণু হামলার হুমকি দিতে পারো না!’
এদিকে ট্রাম্প রেগেমেগে যা বলেছেন, সেটারও বা কতটা যৌক্তিকতা রয়েছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠে গেছে। ট্রাম্পের পদক্ষেপের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন তাঁরই প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বলেছেন, ‘ট্রাম্প জানেনই না কীভাবে মার্কিন নৌসেনা কাজ করে। একজন দায়িত্বশীল প্রেসিডেন্টের এমন কোনও মন্তব্য করা উচিত নয়। কে কী বলল, সেটা নিয়ে আগে বাড়িয়ে মন্তব্য করা ট্রাম্পের উচিত হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় গরমাগরম ভাষণ আর নৌসেনার প্রকৃত কাজে ফারাক রয়েছে।’ সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বললেন জন বল্টন।
মোদ্দা কথা সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে গরমাগরম হুমকি দেওয়া চলছেই। কিন্তু এর মধ্যে দুই দেশের কেউ কোনও হঠকারী পদক্ষেপ করে বসলে দুনিয়া জুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের ৮৮% মজুত রয়েছে এই যুযুধান দুই দেশের কাছে। রাশিয়ার ভাঁড়ারে ৫,৪৫৯ ও আমেরিকার কাছে ৫,২৭৭টি পরমাণু বোমা রয়েছে এখনই নিক্ষেপের জন্য।
