Explained: নয়াদিল্লির ‘রুশ-শক্তি’, পুতিন ঘনিষ্ঠতা দূরে ঠেলল মোদী-ট্রাম্পকে? – Bengali News | How Trump 25 Percent Tariffs Impact Future India US Trade Negotiations
নয়াদিল্লি: দর কষাকষি এখনও থামেনি। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়ে দিয়েছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দেশের স্বার্থেই। আর এই কথা প্রথমবার নয়। এর আগেও কেন্দ্র স্পষ্ট করেছিল দর কষাকষি তখনই থামবে, যতক্ষণ না ভারতের স্বার্থ পূরণ হচ্ছে। কিন্তু এই দর কষাকষির জেরে ট্যারিফ-বিলম্ব আর সহ্য হচ্ছিল না ট্রাম্পের। তাই বুধবার অবশেষে সমস্ত বাঁধ ভেঙে শুল্কবাণ ছুড়ে দিলেন তিনি।
এদিন ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে অনির্দিষ্ট একটি জরিমানার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। তবে জরিমানা করলেও ট্রাম্পও স্পষ্ট করেছেন এই দর কষাকষি এখনই থামছে না। তবে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের মাশুল কিছুটা হলে গুনতে হবে ভারতকে। গুনতে দর কষাকষিকে সিদ্ধান্তে পরিণত না করতে পারার ফলও।
চিন পাবে বাড়তি গুরুত্ব
এই শুল্ক-যুদ্ধ শুরুর থেকেই একটা প্রসঙ্গ বারংবার উঠে আসছিল, তা হল এবার হয়তো চিনকে পেরিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে পায়ের তলায় মাটি পাবে ভারত। ওয়াশিংটন-বেজিংয়ের সম্পর্কের রসায়নটাও এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে চিনকে পেরিয়ে ভারতেই গুরুত্ব দিচ্ছিল বহু সংস্থা। কারণ, বেজিং হয়ে পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো শুল্কের কারণে কার্যত অবাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে সেই সমস্যা অনেকটাই মিটেছে। বিশেষ করে সম্প্রতি জেনেভাতে হওয়া বেজিং এবং ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর চিনা পণ্যে আমেরিকার চাপানো শুল্ক ১৪৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে পড়ে গিয়েছে। আগামী ১২ই অগস্টের মধ্যে আরও বড় চুক্তি স্বাক্ষর করতে চলেছে এই দুই দেশ। এই সময়কালে দর কষাকষি করে নেওয়ার কথা ছিল ভারতেরও। কিন্তু পারস্পরিক স্বার্থ পূরণ না হওয়ার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। বাড়ছে ট্যারিফ চাপ।
কোথায় লক্ষণ রেখা?
আলোচনা চলছে। কয়েক মাস কেটে গিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটা সমঝোতার পথে আসতে পারছে না নয়াদিল্লি। কেন এমন পরিস্থিতি? একদিকে যখন চিনের মতো দেশও বাণিজ্যের স্বার্থে নিজেদের পায়ের তলার হারানো জমি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, সেখানে নয়াদিল্লির সমস্যাটা কোথায়?
- এই আলোচনা ধাক্কা খাওয়ার একটা অন্যতম কারণ স্টিল বা ইস্পাতের ব্যবসা। ভারত বিশ্বে স্টিল উৎপাদনে অন্যতম। প্রতিবছর এই দেশ থেকে প্র্রচুর পরিমাণ ইস্পাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা হয়ে থাকে। যাতে ট্রাম্প আসার পর থেকে ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে। কারণ, একটাই তাদের দেশেও স্টিল উৎপাদনের মাত্রা অনেকটাই। তাই সেক্ষেত্রে দেশের চাহিদা দেশের অন্দরে থাকা উৎপাদনকারীদের দিয়েই মেটাতে চান ট্রাম্প। সেই কারণে বিদেশ থেকে আসা স্টিলে চাপিয়েছেন ২৫ শতাংশ শুল্ক।
- সমঝোতা হোঁচট খাচ্ছে কৃষি পণ্য়েও। ট্রাম্প চান ভারতে মার্কিন কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের অবাধ প্রবেশ ঘটাতে। কিন্তু নয়াদিল্লি তাতে রাজি নয়। ওয়াকিবহাল বলছে, সমঝোতায় জটেরও এটাই সবচেয়ে বড় কারণ। এ দেশের ৪০ শতাংশ জনগণ কৃষিকাজ ও দুগ্ধজাতীয় পণ্য উৎপাদনের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আমেরিকার কৃষকদের মতো ভারতীয় চাষিরা আকাশছোঁয়া ভর্তুকি পান না। কিন্তু সরকার সহযোগিতাতেও কমতি রাখে না। আর সেখানেই আসল খেলাটা খেলতে চায় আমেরিকা। এছাড়াও চামড়ার পণ্য, বস্ত্র, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী ও অটো-মোবাইল যন্ত্রাংশ-সহ ইত্যাদি পণ্য শুল্ক-মুক্ত এন্ট্রি চায় ভারত। যাতে আবার রাজি নয় ওয়াশিংটন।
- রাশিয়ার সঙ্গে নয়াদিল্লির সখ্যতা ভাল চোখে দেখছেন না ট্রাম্প। আর এই আগে তত্ত্ব ‘উড়ে বেড়ালেও’, এখন এটা একেবারে স্পষ্ট। কারণ, বুধবারই ২৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণার পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে ভারত তেল ও প্রতিরক্ষা সামগ্রীর বাণিজ্য করায় এ দেশের উপর ‘জরিমানা’ চাপিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অবশ্য, সেই জরিমানা কত টাকার তা নিয়ে মুখ খোলেননি তিনি। ওয়াকিবহাল মহলে ধারণা, জরিমানার ঠেলা ভারতকে ভালই পেতে হবে। পাশাপাশি, পারস্পরিক শুল্ক নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তাতেও এর প্রভাব পড়বে।
২৫ শতাংশের উদ্বেগ
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, ২৫ শতাংশ শুল্ক যে খুব একটা চিন্তার বিষয় এমনটা নয়। কারণ, চারপাশে তাকিয়ে দেখলে লক্ষ্য করা যাবে চিনের উপর শুল্ক চাপানো ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশের উপর ৩৫ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ায় চাপানো ১৯ শতাংশ। বাকি সব দেশেও গড়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ। যে গোষ্ঠীতে এখন ভারতও ‘এন্ট্রি’ নিয়েছে।
তা হলে চিন্তায় জায়গাটা কোথায়? বিশেষজ্ঞদের দাবি, শুল্কের পরিমাণ সহ্য করা গেলেও, তার সঙ্গে চাপানো বাড়তি কর জর্জরিত করতে পারে ভারতকে। যেমনটা করেছিল চিনকেও। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাতে এখন সেই বাড়তি কর চাপানোর মূল উপাদানটাই পেয়ে গিয়েছে, যা হল মস্কো-নয়াদিল্লি বাণিজ্য। সেটাকেই হাতিয়ার করতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যার জেরে সমস্যায় পড়বে নয়াদিল্লি।
কারণ, আমেরিকার বাজার ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের হিসাব অনুযায়ী, ভারত-আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ওই এক বছরে ১৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রতি বছর ভারত গড়ে ৮৬০ কোটি টাকার পণ্য পাঠিয়ে থাকে। এই পরিস্থিতিতে শুল্ক আলোচনা নিশ্চিত কোনও রূপ না পাওয়া পর্যন্ত বাণিজ্য মহলের আকাশে অনিশ্চয়তা অবশ্যম্ভাবী। আর এই শুল্ক বৃদ্ধির ফলে যে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য শুধু মার্কিন বাজার নষ্ট হয়েছে এমন নয়। ইউরোপ-সহ অন্য দেশের বাজারে ঠাঁই পাচ্ছে না দেশের ব্যবসায়ীরা। কারণ, শুল্ক চাপে সেখানে গিয়ে ভিড়েছে সস্তা চিনা পণ্য।
