Swami Vivekananda: আজই সেই তারিখ! মৃত্যুর দিন সকাল থেকে কী কী করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ? – Bengali News | What was the last day of Vivekananda’s life like, know the secrets of 4th July 1902
আজই সেই অভিশপ্ত ৪ঠা জুলাই। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ১৯০২ সালে এই দিন দেহ ত্যাগ করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। কেমন ছিল স্বামীজির জীবনের শেষ দিনটা? রসিক মানুষ স্বামীজি, বড় ভালবাসতেন ইলিশ খেতে। নিজের শেষ দিনে ইলিশ দিয়েই সেরেছিলেন দুপুরের খাওয়া দাওয়া। আর কী করেছিলেন তিনি? চলুন ফিরে দেখি কেমন ছিল ৪ জুলাই ১৯০২ দিনটা?
ভোরবেলা ঘড়ির কাঁটায় তখন সবে সাতটা বেজেছে। ঘুম ভাঙল স্বামীজির। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ৪ঠা জুলাই। স্বাধীন হয়েছিল আমেরিকা। এই জগতের মায়ার বাঁধন, জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে তাঁরও তো আজ মুক্ত হওয়ার দিন। সেটা বোধহয় জানতেনই বিবেকানন্দ। মা ভুবনেশ্বরী দেবীর মুখটা বড় মনে পড়ছে। খানিকটা ভারাক্রান্ত মন। ধ্যান করলেন, মনটা যেন একটু ভাল হল।
এর আগে ক’দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন বিবেকানন্দ। আজ যেন কেমন উৎফুল্ল বোধ করছেন। শরীরে যেন কোনও কষ্ট নেই। মন্দিরে গেলেন। বাকিদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতে করতেই ফল আর গরম দুধ। অনান্য দিন পুজোর ঘরে বসে ধ্যান করেন তিনি। আজ বললেন ঠাকুরের শোওয়ার ঘরে বসেই ধ্যান করবেন। প্রেমানন্দ পেতে দিলেন আসন। দরজা-জানলা বন্ধ করে ধ্যানে বসলেন। দরজা যখন খুলল প্রায় বেলা এগারোটা। মুখে হাসি, ঠোঁটে গুনগুন করছেন ‘শ্যামা মা কি আমার কালো রে…’।
ধ্যান থেকে বেরিয়ে বললেন দুপুরের খাওয়াটা সেরে নেবেন। ওঃ, একটা কথা তো বলাই হয়নি। ধ্যান করতে যাওয়ার আগেই সকালে ফল-দুধ খাওয়ার সময় কথায় কথায় স্বামীজি জানতে পারেন বেলুড় ঘাটে নাকি জেলেদের নৌকো ভিড়েছে। খবর পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে লোক পাঠিয়ে নিয়ে আসেন ভাল ইলিশ। আসলে এই মাছটি স্বামীজির দুর্বলতাও বলা যেতে পারে। দুপুরে ইলিশের নানা পদ দিয়েই সারলেন ভাত খাওয়া। ইলিশের ঝোল, ভাজা, অম্বল! আহাঃ! সকল গুরুভাইয়ের সঙ্গে এক সঙ্গে সেদিন খাওয়া দাওয়া করেন স্বামীজি।
খেয়ে দেয়ে উঠে দুপুরে মিনিট পনেরো বিছানায় গড়িয়ে নিলেন। প্রেমানন্দকে বললেন, সন্ন্যাসীর দিবানিদ্রা পাপ। চল, একটু লেখাপড়া করা যাক। বিবেকানন্দ শুদ্ধানন্দকে বললেন‚ লাইব্রেরি থেকে শুক্ল যজুর্বেদটি নিয়ে আসতে।
দুপুর একটা থেকে চারটে, তিনঘন্টা স্বামীজি করলেন পড়াশনা। লাইব্রেরী ঘরে ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে চলল ব্যাকরণ চর্চা। পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলির সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগলেন নানা মজার গল্প।
ব্যাকরণে ক্লাস শেষে এক কাপ গরম দুধ খেয়ে প্রেমানন্দকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন। পায়ে হেঁটে ঘুরে এলেন বেলুড় বাজার পর্যন্ত প্রায় দু মাইল পথ। এতটা হাঁটা তাঁর শরীর ইদানিং নিতে পারে না। যদিও আজ তিনি অক্লেশে।
পাঁচটা নাগাদ মঠে ফিরে বিবেকানন্দ আমগাছের তলায় একটা বেঞ্চিতে বসলেন। তামাক খেতে খেতে চলল দেদার আড্ডা। ওদিকে ঘড়িতে তখন সাড়ে ছটা। বাকি সন্ন্যাসীদের সঙ্গে এক কাপ চা খেলেন তিনি।
সন্ধ্যে ঠিক সাতটায় শুরু হলো সন্ধ্যারতি। স্বামীজি জানেন আর সময় নেই। বাঙাল ব্রজেন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন বিবেকানন্দ। ব্রজেন্দ্রকে বললেন, “আমাকে দু’ছড়া মালা দিয়ে তুই বাইরে বসে জপ কর। আমি না ডাকলে আসবি না।”
স্বামীজি জানেন তিনি আর ডাকবেন না। এটাই তাঁর শেষ ধ্যান। ধ্যানের মধ্যেই নাকি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিবেকানন্দ। পরে ডাক্তার এসে বিষয়টা জানান।
কেউ বলেন পৌনে আটটা নাগাদ গরম লাগছে বলে জানলা খুলে দিতে বলেছিলেন তিনি। শুয়ে পড়েছিলেন মেঝের বিছানায়। রাত ৯টা নাগাদ চিৎ অবস্থা থেকে বাঁদিকে ফেরার পরই ডান হাতা কেমন কেঁপে উঠল। কপালে দেখা দিল বিন্দু বিন্দু ঘাম। শিশুদের মতো কেঁদেও ফেললেন। রাত ৯টা ২ থেকে ৯টা ১০-এর মধ্যবর্তী সময়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে ফের দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এর পর মাথা নড়ে উঠল। পড়ে গেল বালিশ থেকে। চোখ তখন স্থির। অথচ মুখে সেই অপরূপ উজ্জ্বল হাসি। প্রাথমিক ভাবে তাই বোঝা যায়নি কী হয়েছে। শিষ্যদের ধারণা ছিল সমাধি হয়েছে তাঁর। কিন্তু পরে ডাক্তার এসে জানান সব শেষ।
ঠাকুর বলেছিলেন, “নরেন যখন বুঝবে ওঁর কাজ শেষ, নিজেই চলে যাবে।” স্বামীজি বলেছিলেন, “আমি ৪০ পেরোব না।” মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৯ বছর, ৫ মাস, ২৫ দিন।
মৃত্যুর ২ দিন আগে ২ জুলাই নিবেদিতাকে নেমন্তন্ন করে নিজের হাতে খাইয়েছিলেন স্বামীজি। সেদিন নিজের মৃত্যুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। তখন না বুঝলেও পরে বুঝেছিলেন। মৃত্যুর তিনদিন আগে স্বামী প্রেমানন্দকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, “আমি মরলে ওখানে সৎকার করবি।” ১৬ বছর আগে ওইখানে সৎকার হয়েছিল ঠাকুরের।
পরের দিন ৫ই জুলাই। গালিচার ওপর শায়িত দিব্যভাবদীপ্ত বিবেকানন্দ। মাথায় ফুলের মুকুট। পরনে গৈরিক বসন। ডান হাতের আঙুলে তখনও জড়িয়ে রয়েছে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি। চোখদুটি যেন ধ্যানমগ্ন শিবের চোখ‚ অর্ধনিমীলিত। নিবেদিতা ভোরবেলাতেই চলে এসেছেন।
স্বামীজির পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে অনবরত বাতাস করছেন। তাঁর দুটি গাল বেয়ে নামছে জল। স্বামীজির মাথা পশ্চিমদিকে। পা-দুখানি পুবে‚ গঙ্গার দিকে। বিবেকানন্দের দেহ তোলা হল চন্দন কাঠের চিতায়।
শিষ্যদের মতে, বিবেকানন্দ মৃত্যুর আগে মহাসমাধি লাভ করেছিলেন। যদিও মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে যাওয়াই মৃত্যু সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দাবি করছে ডাক্তারি রিপোর্ট। তাছাড়া বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগে ২ বার হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর দিনও ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল বলে ডাক্তারদের ধারণা। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ডাক্তাররাও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। তাঁর শিষ্যদের দাবি, মহাসমাধির সময় মস্তিষ্কের ব্রহ্মরন্ধ্র ফেটে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। শূন্য করে চলে যান স্বামীজি।