Explained: আপনার বাড়িতেও কি আসবে নির্বাচন কমিশন? কী তথ্য চাইছে ওরা? – Bengali News | What is Voter List Revision Happening in Bihar, What it Means For Bengal
কলকাতা: একপক্ষ বলছেন, ঘুরপথে NRC। অন্য পক্ষ বলছে, এটা কমিশনের অধিকার। যা সংবিধান তাদের দিয়েছে। সামনেই বিহারে নির্বাচন। ইতিমধ্যেই প্রার্থী নিয়ে একাধিক দলের অন্দরে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্ভবত ছট পুজোর পরে নির্বাচনী ডঙ্কা বেজে উঠবে সেই রাজ্যে। পরপর জমা পড়বে মনোনয়ন। ভোট দিতে যাবে সাধারণ। কিন্তু কারা ভোট দিতে পারবেন? কারা পারবেন না? কে আসল ভোটার, কেই বা ভুয়ো ভোটার? নির্বাচনের আগে সেই তথ্যটাও শেষবারের জন্য মেপে নিতে চায় নির্বাচন কমিশন। সেই সূত্র ধরেই জারি হয় একটি নির্দেশিকা। আর তারপরেই শুরু বিতর্ক।
কমিশনের নির্দেশিকা জারি
- দেশের নির্বাচন কমিশন জানায়, বিহারে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ এবং নিবিড় সমীক্ষা বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন করবে তারা। সেই সূত্র ধরে একটি নির্দেশিকাও জারি করে কমিশন। তাতে তারা বলে,
- নাগরিকত্বের সুনির্দিষ্ট পরিচয়পত্র ছাড়া ভোটার তালিকায় নাম তোলা যাবে না। প্রয়োজন হবে বাবা-মায়ের জন্মের শংসাপত্র।
- ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে যাঁরা জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই ভোটারদের জন্ম তারিখ এবং জন্মস্থানের প্রমাণ্য নথি দাখিল করতে হবে।
- ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের পর যারা জন্মেছেন, তাদের নিজের পরিচয়ের প্রমাণ্য নথির সঙ্গে বাবা-মায়েরও নথি জমা দিতে হবে।
- ২০০৪ সালের ২ ডিসেম্বরের পর যারা জন্মেছেন, তাদের ক্ষেত্রেও সেই একই নিয়মাবলী।
- পাশাপাশি, বিহারের ২০০৩ সালে ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম ছিল না, তাঁদেরও জন্মস্থানের প্রমাণ দিতে হবে।
এই প্রযোজ্য শর্তের ভিত্তিতেই বিহারের ভোটারদের একটি ডিক্লারেশন ফর্ম জমা দিতে হবে বলেও জানিয়েছে কমিশন।
খুব স্বাভাবিক ভাবেই কমিশনের এই নির্দেশিকার পর রীতিমতো ক্ষোভ চড়ে রাজনৈতিক মহলে। দিঘা থেকে কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কীভাবে এত দশক পুরনো জন্ম শংসাপত্র মানুষ বের করে আনবে, সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মমতা। এমনকি বিহার যে শুধুমাত্র উপলক্ষ্য, আসল নিশানা বাংলা সেই দাবি করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। বিতর্ক এই ভোটার তালিকা সংশোধনের অংশ। তা রয়েছে, তা থাকবেও। কিন্তু সেই বিতর্ক এড়িয়েও কিছু প্রশ্ন থাকছে, যা রাজনৈতিক নয়, বরং জনগণের সম্পর্কিত।
কোন ভিত্তিতে এই সমীক্ষা চালাচ্ছে কমিশন?
১৯৫০ সালে দেশে সংবিধান লাগু হওয়ার পর থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে দু’টি বিশেষ ক্ষমতা আসে, একটি নির্বাচন করানোর দায়িত্ব, অন্যটি, ভোটার কারা তা খতিয়ে দেখা। যা ইলেকটোরাল রোলস-এর অংশ। সংবিধানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইনের অনুচ্ছেদ ২১ অনুযায়ী, একটি দেশে ভোটার কারা, সেই বিষয়টি যাচাই করার জন্য বিশেষ এবং নিবিড় সমীক্ষা চালানোর অধিকার পেয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিহারে শেষবার ২০০৩ সালে এই সমীক্ষা হয়েছিল। তারপর থেকে কেটে গিয়েছে দুই দশকের অধিক সময়। কোন ভোটাররা এখনও বেঁচে রয়েছেন, কারা বেঁচে নেই, কারা রাজ্য ছেড়েছে, সেটা জানার অধিকার নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।
তা হলে এত বির্তক কেন? বিতর্ক হচ্ছে সময় নিয়ে। কয়েক মাস পরেই নির্বাচন, তার আগে হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তকে ‘অসময়ে তোলা দাবি’ বলেই অভিহিত করছে একাংশ। তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের কাছে সময় ছিল, তাও তারা কেন এই সিদ্ধান্ত আগাম নেয়নি। কেন আগে ভাগে রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে কথা বলেনি? কেন এত তাড়াহুড়ো?
প্রশ্ন উঠছে এই নিয়েও যে কীভাবে ১৯৮৭ সালের আগে জন্মেছেন, যারা তাদের থেকে শংসাপত্রের দাবি করছে কমিশন? কারণ, সংবিধান তো বলছে, যারা ১৯৮৭ সালের পয়লা জুলাইয়ের আগে জন্মেছেন, তারা জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক। আর এই নিয়ে কোনও প্রশ্নের জায়গাই নেই।
এই প্রসঙ্গেই বলে রাখা প্রয়োজন একটা ‘ভুল’ হচ্ছে, তা ঘুরপথে স্বীকার করে, কমিশন এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে বিশেষ কিছু ছাড় দিয়েছে। এদিন তারা তাদের নির্দেশিকায় একগুচ্ছ বদল করে জানিয়েছে,
- বিহারের ২০০৩ সালে ভোটার তালিকা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে মোট ৪.৯৬ কোটি ভোটারের নথি-বিবরণ রয়েছে।
- ২০০৩ সালের এই ভোটার তালিকা প্রকাশের ফলে নিবিড় সমীক্ষার কাজ আরও সহজ হবে। আগে যেখানে ৮ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাই করতে হত, এখন তা প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গিয়েছে।
- ওয়েবাসাইটে প্রকাশিত ৪.৯ কোটি ভোটারকে আরও কোনও রকম পরিচয়পত্র বা নথি জমা দিতে হবে না।
- তবে যে সকল ভোটারের নাম সেই তালিকায় নেই। অর্থাৎ ১৯৮৭ সালের পর যাদের জন্ম কিন্তু সেই বছরের তালিকায় তাদের নাম নেই। বরং রয়েছে, তাদের বাবা-মায়ের নাম, সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিদের নিজস্ব পরিচয়পত্র প্রদান করলেই হবে। আলাদা কোনও প্রমাণপত্র লাগবে না।
কীভাবে হবে সমীক্ষা?
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের নেতৃত্বে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা জেলাশাসকে, ভোটের অতিরিক্ত জেলাশাসক, ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার এবং বুথ লেভেল অফিসারেরা একত্রে ভোটার তালিকায় নাম থাকা প্রত্যেকের বাড়িতে সমীক্ষার কাজটি করবেন। সেই প্রত্যেক ভোটারকে একটি ফর্ম ভরে তাদের কাছে জমা করতে হবে। যা যাচাই করবে কমিশন।
তবে ২০২৩ সালের আগে পর্যন্ত কোন ভোটারেরা কী তথ্যর ভিত্তিতে কার্ড পেয়েছে, তা ডিজিটাল ভাবে সংরক্ষিত রাখা হত না। ফলে সেক্ষেত্রে গরমিল ধরা কঠিন বলেই দাবি করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এখনই কেন এই সমীক্ষা প্রয়োজন?
কমিশন জানিয়েছে, সাম্প্রতিককালে বহু বাংলাদেশি, পাকিস্তানি এবং নেপালি দেশের মধ্য়ে ভুয়ো ভোটার কার্ড বানিয়ে ঢুকে পড়ছে। বাংলা-বিহার-সহ বিভিন্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে তারা। তাই সেই বিষয়টিকে হাতিয়ার করেই আপাতত সমীক্ষায় নেমেছে কমিশন। যে কাজে ইতিমধ্যে ৭৮ হাজার বুথ লেভেল অফিসারকে এই কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে।
বাংলায় কি হবে নিবিড় সমীক্ষা?
দিঘা থেকে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছিলেন, বিহার বিজেপি শাসিত রাজ্য, ওখানে ভোটার সমীক্ষা একটা উপলক্ষ্য মাত্র। নিশানায় বাংলা। এ রাজ্যে শেষবার এই নিবিড় সমীক্ষা হয়েছিল ২০০২ সালে। তারপর থেকে বহু বাংলাদেশি, পাকিস্তানি বাংলাকে ট্রানজিট রুট করে বাসা বেঁধেছে। যাদের উপস্থিতি টের পেয়েছে গোয়েন্দারাও। তাই নির্বাচনের আগে ভুয়ো নথির সমস্যা মেটাতে, এই রাজ্যেও সমীক্ষার সম্ভবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
