Explained: ক্যানসার ৪ স্টেজেও চিকিৎসা সম্ভব, পথ দেখাচ্ছে হরমোন থেরাপি! বিষয়টা কী? – Bengali News | Hormone Therapy in Breast cancer, know how it can defeat 4 stage cancer
ক্যানসার মানেই সব শেষ! আর তো কটা দিন আয়ু। এভাবেই এখনও ভাবতে অভ্যস্ত সমাজের বেশিরভাগ অংশ। এই কথা আমি বলছি না। বলছেন, ক্যানসার জয়ী যোদ্ধারা। ক্যানসারের আনসার খুঁজতে, প্রতি মুহূর্তে লড়ে চলেছেন চিকিৎসক, বিজ্ঞানী থেকে গবেষকরা। এই রাস্তায় এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি আমরা সেই কথা প্রায় সকলেই জানি। কারণ প্রতিদিন বদলে বদলে যাওয়া ক্যানসারের চরিত্রলিপি। তবে পিছিয়ে নেই চিকিৎসা বিজ্ঞানও। কেন এই কথা বলছি?
এত দিন ক্যানসার চিকিৎসা বলতে আমরা মূলত তিন ধরনের পদ্ধতির কথা জানতাম। রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি এবং তারই সঙ্গে অস্ত্রপচার। তবে এইবার তারই সঙ্গে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠছে নতুন আরেকটি চিকিৎসা পদ্ধতি। সেটি হল হরমোন থেরাপি। কেবল প্রসিদ্ধ হয়ে উঠছে না বরং ব্যপক প্রভাব ফেলছে রোগীদের সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে।
ভারত তথা গোটা বিশ্বেই মহিলাদের মধ্যে যে ক্যানসারটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি তা হল ব্রেস্ট ক্যানসার বা স্তন ক্যানসার। এই ক্ষেত্রে চিকিৎসার বেশিরভাগ সময় প্রয়োজন পড়তো অস্ত্রপচারের। যার ফলে টিউমারের সঙ্গেই অনেক সময় বাদ পড়তো স্তনও। অথচ এখানেই পথ দেখাচ্ছে নতুন হরমোন থেরাপি। ক্যানসারের যে স্টেজে গিয়ে এতদিন খানিকটা অসহায় বোধ করতেন চিকিৎসকরাও, সেই স্টেজেই দুর্দান্ত কাজ করছে নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতি। এমনকি অপ্রয়োজন হয়ে পড়ছে টিউমারকে অস্ত্রোপচার করে বাদ দেওয়া।
কিছুদিন আগেই অ্যাপোলো হাসপাতালের ‘CanWin’ অনুষ্ঠানে এসে সেই গল্পই ভাগ করে নিয়েছেন ক্যানসার জয়ী মানিনী রায়। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল ক্যানসারে আক্রান্তদের যুদ্ধ কেবল শারীরিক নয়। তার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় মানসিক ধকল, সামাজিক ট্যাবু এবং অর্থনৈতিক সংগ্রাম। সেই যুদ্ধে অনেকেই হেরে যান স্রেফ সঠিক পথ নির্দেশনা এবং কখন কী করতে হবে, তার সম্মক ধারণা না থাকার কারণে। সেখানেই আরও বেশি করে রোগীদের উদ্বুদ্ধ করতে সমাজের স্বার্থে অ্যাপোলো হাসপাতালের এই নতুন উদ্যোগ CanWin। যার মাধ্যমে ক্যানসার জয়ীদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পারবেন নতুন রোগীরা। তাঁদের গল্প এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা নতুন রোগীদের সঠিক পথ বেছে নিতে সাহায্য করবে বলেই আশা।
এবার আসি মানিনী দেবীর কথায়। ৪৪ বছর বয়সে ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ে মানিনী দেবীর। পেশায় স্কুল শিক্ষিকা, বাড়িতে ৯ এবং ১৪ বছরের দুই কন্যা সন্তান। স্বামী কাজের সূত্রে বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে। তাই শ্বশুর বাড়ির সিংহভাগটাই সামলান তিনি।
এমতাবস্থায় এমন একটা খবর বিনা মেঘে বজ্রপাত ছিল মানিনীদেবীর জীবনে। ব্রেস্ট ক্যানসার স্টেজ ৪। ২০২৩ সালে শুরু হল কেমোথেরাপি। বায়প্সি রিপোর্ট দেখতেই চোখ কপালে। শিরদাঁড়া থেকে কোমড় অবধিও ছড়িয়েছে সেই বিষাক্ত সেল। এমন অবস্থায় অস্ত্রপচার করা সম্ভব নয়। তাহলে উপায়? চিকিৎসক জানালেন হরমোন থেরাপি করতে হবে। পিরিয়ডসের জন্য বড় হচ্ছিল টিউমার। ডাক্তারবাবু বললেন সেটাকে আগে বন্ধ করব আমরা হরমোন থেরাপির মাধ্যমে। তারপর দীর্ঘ লড়াই শেষে আজ সম্পূর্ণ ক্যানসার সেল মুক্ত মানিনীদেবী। প্রতি ৬ মাস অন্তর যান নিয়মিত চেক আপে।
কী ভাবে কাজ করে এই হরমোন থেরাপি?
ব্রেস্ট ক্যানসার চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বর্তমানে হরমোন থেরাপি (Hormone Therapy)। এটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয় সেইসব ব্রেস্ট ক্যানসারের ক্ষেত্রে, যেগুলো হরমোন-রিসেপটর পজিটিভ (HR+) অর্থাৎ ইস্ট্রোজেন বা প্রোজেস্টেরনের উপর নির্ভরশীল। এই ধরনের ক্যানসার কোষ ইস্ট্রোজেন বা প্রোজেস্টেরন হরমোন পেলে দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
হরমোন থেরাপি কী?
হরমোন থেরাপি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যা শরীরের প্রাকৃতিক হরমোনগুলোর কাজকে বাধা দিয়ে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিকে রোধ করে। এটি কেমোথেরাপি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি এবং অপেক্ষাকৃত ধীর কার্যকারিতার একটি চিকিৎসা।
হরমোন থেরাপির মূল উদ্দেশ্য –
অস্ত্রোপচার বা কেমোথেরাপির পর ক্যানসার যেন ফিরে না আসে তা নিশ্চিত করা (adjuvant therapy)
ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে (advanced/metastatic stage) তার বৃদ্ধিকে ধীর করা
পুনরায় ক্যানসার হবার সম্ভাবনা কমানো –
কীভাবে হরমোন থেরাপি দেওয়া হয়?
১। ঔষধের মাধ্যমে (oral therapy)। দীর্ঘদিন কোনও কোনও ক্ষেত্রে সারা জীবন কিছু ওষুধ খেতে পরে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রেশার বা সুগারের মতো এই ওষুধ খেলেই হবে।
২। ট্যামোক্সিফেন (Tamoxifen)। প্রি-মেনোপজাল এবং পোস্ট-মেনোপজাল উভয় নারীর জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ইস্ট্রোজেন রিসেপটরকে ব্লক করে। ফলে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি রোধ হয়।
৩। অ্যারোমাটেজ ইনহিবিটর (Aromatase Inhibitors)। যেমন আনাস্ট্রাজোল (Anastrozole), লেট্রাজোল (Letrozole)। এগুলো শুধু পোস্ট-মেনোপজাল নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং শরীরে ইস্ট্রোজেন তৈরি হওয়া কমিয়ে দেয়।
৪। ইনজেকশনের মাধ্যমেও চিকিৎসা সম্ভব। কিছু ইনজেকশন যেমন লিউপ্রোলাইড (Leuprolide), শরীরের ওভারিতে হরমোন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। প্রি-মেনোপজাল নারীদের ওভারি ফাংশন বন্ধ করতে এই থেরাপি ব্যবহার করা হয়।
৫। কারও কারও ক্ষেত্রে ওভারিকে অপারেশনের মাধ্যমে সরিয়ে হরমোন উৎসকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়।
হরমোন থেরাপি কত দিন চলে?
সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত চলতে পারে। চিকিৎসক রোগীর বয়স, মেনোপজাল স্টেটাস, ক্যানসারের স্টেজ ও হরমোন রিসেপটরের উপস্থিতি অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া-
ক্যানসারের মতো সাঙ্ঘাতিক একটি রোগের চিকিৎসা হলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা কার জন্য কী হবে নিশ্চিত করা বলা মুশকিল। শরীরের আরও নানা অবস্থার নির্ভর করেই নির্ধারিত হয় এই রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। যেমন হঠাৎ হঠাৎ গরম লাগা, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাড় পাতলা হওয়া, যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, মুড চেঞ্জ, বিষণ্ণতা ইত্যাদি।
হরমোন থেরাপি ব্রেস্ট ক্যানসারের জন্য একটি কার্যকরী ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি অনেকটাই কমায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত থেরাপি চালিয়ে যাওয়া জরুরি।