Explained: বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শেই জারি হয় জরুরি অবস্থা? সত্যিই কি সংবিধান হত্যা করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী? – Bengali News | Explained on Emergency 1975: How Indira Gandhi’s Fight for Prime Minister Post Led to Dark Chapter of Democracy, has constitution actually Ended in Emergency
কেন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?Image Credit source: TV9 বাংলা
“ভাইও অউর বেহনো রাষ্ট্রপতিজি নে আপদকাল কা ঘোষণা কি হ্যায়”
এই একটা ঘোষণায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ। ৫০ বছর পরে আজকের দিনটিকে পালন করা হচ্ছে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসাবে। গত বছর, ২০২৪ সালেই ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আজ দেশজুড়ে সংবিধান হত্যা দিবস পালন করেছে বিজেপি। অন্যদিকে রাজ্য সরকার এই দিনকে কালো দিন হিসাবে মানতে নারাজ। সত্যিই কি সংবিধান হত্যা করা হয়েছিল ২৫ জুন?
সালটা ১৯৭৫। দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে তখন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর পরামর্শেই ঘড়ির কাটা ১২টা ছোঁয়ার আগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ ঘোষণা করেন যে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হচ্ছে। ১৯৭৭ সালের ২১ মার্চ অবধি জারি ছিল এই জরুরি অবস্থা। এই ২১ মাসের সময়কালকে দেশের ইতিহাসে অন্ধকারময় অধ্যায় বলা হয়। ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় এটি। জরুরি অবস্থায় আদৌ সংবিধানকে হত্যা করা হয়েছিল কি না, সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করার আগে এই প্রেক্ষাপট জানা দরকার যে কেন জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার আগে, ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ ও ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে তার প্রভাব গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
নির্বাচনে কারচুপি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?
ইন্দিরা গান্ধী যখন কংগ্রেসে প্রথম যোগ দিয়েছিলেন, তখন অনেকেই কটাক্ষ করে তাকে বলতেন ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্বাক পুতুলই সরব হয়ে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধীর প্রভাব-প্রতিপত্তি এমনই হয় যে কংগ্রেসের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু কংগ্রেসের প্রবীণ নেতারা ইন্দিরা গান্ধীর এই জনপ্রিয়তাকে ভাল চোখে দেখেননি। ইন্দিরার নানা সিদ্ধান্ত নিয়েও তাদের বিস্তর আপত্তি ছিল। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে যখন ইন্দিরা গান্ধীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন তিনি নতুন দল তৈরি করেন, নাম দেন কংগ্রেস (রিকুইজিশনিস্ট)। নতুন প্রতীক ছিল গাই-বাছুর। এদিকে পুরনো কংগ্রেসের প্রতীক ছিল জোয়াল কাঁধে দুই গরু।
১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৫১৮টি আসনের মধ্যে ৩৫২টি আসনেই জয়ী হয় ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস। সমাজতান্ত্রিক পার্টির রাজ নারায়ণকে এক লাখ দশ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারান নেহরু-কন্যা। রায়বরেলি আসন থেকে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী। তবে তাঁর প্রতিপক্ষ রাজ নারায়ণ অভিযোগ করেন নির্বাচনী অনিয়মের। সরকারি অর্থ ব্যবহার করে প্রচার থেকে শুরু করে ভোটারদের কম্বল, ধুতি, শাড়ি, মদ বিলি, সেনার বিমান ও হেলিকপ্টার ব্য়বহারের মতো একাধিক নিয়ম লঙ্ঘন করে ইন্দিরা গান্ধী জয়ী হন বলে অভিযোগ করেন। ইন্দিরাকে সাহায্য করার অভিযোগ আনা হয় প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস সরকারের একদল আধিকারিকের বিরুদ্ধে। এলাহাবাদ হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন নির্বাচনী এজেন্ট নিরুদ্ধ নারাইন। ইন্দিরা গান্ধীর দলের প্রতীক নিয়েও মামলা হয়।

দোষী সাব্যস্ত হলেন ইন্দিরা গান্ধী-
হাইকোর্টে যে দিন রায় ঘোষণার কথা ছিল, সেদিন প্রথমবার কোনও প্রধানমন্ত্রী আদালতে আসেন। ১৮ মার্চ হাইকোর্টে এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সে দিন আদালতে প্রধানমন্ত্রী সুলভ আচরণ হয়নি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। তাঁকে সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়াননি পুলিশ আধিকারিকরা।
১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্ট নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত রায় দেয়, আগামী ছয় বছর কোনও ধরনের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ সালে রায়বরেলিতে ইন্দিরা গান্ধীর জয় বাতিল করে দেওয়া হয়, লোকসভার আসন হারান তিনি। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য তখন ইন্দিরা গান্ধী।
ইন্দিরা গান্ধীর ইস্তফা?
এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের পর ইস্তফাই দিতে চেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁকে বলা হয়, কংগ্রেস অধ্যক্ষ হওয়ার। কিন্তু পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর পরামর্শে ইস্তফা দিতে নারাজ হন ইন্দিরা। প্রধানমন্ত্রীর পদ বাঁচাতে হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টেও যান ইন্দিরা গান্ধী, কিন্তু সেখানেও হাইকোর্টের রায়ই বহাল রাখা হয়। ২৪ জুন সুপ্রিম কোর্ট জানায়, প্রধানমন্ত্রী থাকলেও লোকসভায় সংসদীয় ভোট দেওয়ার অধিকার পাবেন না ইন্দিরা। সাংসদ হিসাবে ইন্দিরা গান্ধী যে সমস্ত সুবিধা পেতেন, তা বন্ধ করে দিতে বলা হয়। তাঁর ভোটাধিকারও কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের বুদ্ধিতেই ইমার্জেন্সি-
প্রধানমন্ত্রী পদ ধরে রাখতে মরিয়া ইন্দিরা গান্ধী। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ইন্দিরা গান্ধীকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পরামর্শ দেন। এই পরামর্শ গ্রহণ করেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর নির্দেশে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ জরুরি অবস্থা জারি করতে রাজি হন। ১১টা ২০ নাগাদ এমার্জেন্সি পত্রে সিলমোহর পড়ে রাষ্ট্রপতির। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন, মধ্য রাত হওয়ার কয়েক মিনিট আগে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
এরপর মধ্যরাত থেকে প্রায় ভোর ৩টে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য়মন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ও ইন্দিরা গান্ধী মিলে দেশের উদ্দেশে ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা ঘোষণার বক্তব্য ঠিক করেন। ২৬ জুন সকাল ৮টায়, অল ইন্ডিয়ায় রেডিয়োর একটি বার্তায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থার ঘোষণা করেন। রেডিয়ো বার্তায় বলেন, “ভাই ও বোনেরা, রাষ্ট্রপতিজি জরুরি অবস্থার ঘোষণা করেছেন। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।”
কী কী নিষিদ্ধ হয়েছিল জরুরি অবস্থায়?
- জরুরি অবস্থা ঘোষণা হতেই দিল্লির অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়। পরেরদিন সকালে সংবাদপত্র সাদা পাতা প্রকাশিত হয়।
- গ্রেফতার করা হয় একের পর এক বিরোধী নেতাকে। বিজয়রাজে সিন্ধিয়া থেকে শুরু করে জয়প্রকাশ নারায়ণ, মোরারজি দেশাই, চরণ সিং, অটল বিহারী বাজপেয়ী, লাল কৃষ্ণ আদবাণী, অরুণ জেটলি, নারায়ণ সিনহা, জয়পুরের রানি গায়েত্রী দেবীকে গ্রেফতার করা হয়।
- ওই সময়ে প্রায় ১ লক্ষেরও বেশি মানুষ সরকারের বিরোধিতা করার অপরাধে গ্রেফতার হয়েছিলেন।
- বন্ধ হয়ে যায় লোকসভা ও রাজ্যসভার নির্বাচন।
- দেশের কর্মক্ষমতা বাড়াতে রবিবারের ছুটি বাতিল করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বোনাস, বেতন বৃদ্ধি। নির্বিচারে কর্মী ছাঁটাইয়ের অধিকার দেওয়া হয়।
- মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কর ছাড়ের ঘোষণা করেন। আট হাজার টাকা অবধি আয়ের উপরে ছাড় দেওয়া হয়।
- চালু করা হয় রোড পাসের নিয়ম। ন্যাশনাল পারমিট স্কিম চালু করা হয়।
শেষ হল জরুরি অবস্থা-
১৯৭৭ সালে হঠাৎ জরুরি অবস্থায় ইতি টেনে, লোকসভা নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেন ইন্দিরা গান্ধী। ইমার্জেন্সির যে প্রভাব পড়েছিল জনমানসের উপরে, তার প্রভাবে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় কংগ্রেস। ৫৪২টি লোকসভার মধ্যে ২৯৫টি আসন পায় জনতা পার্টি। ১৫৪টি আসন পায় কংগ্রেস। প্রথম অ-কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী হন মোরারজি দেশাই।
সংবিধান হত্যা দিবস-
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে জরুরি অবস্থার নিন্দা করেছিলেন। সংসদে বারবার উঠে আসে ইমার্জেন্সির সময় কীভাবে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। সেই প্রতিবাদের সুরকেই আরও জোরাল করতে গত বছর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জরুরি অবস্থা ঘোষণার দিনকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসাবে পালন করার ঘোষণা করেন। এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘‘১৯৭৫ সালের ২৫ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাদের দেশের গণতন্ত্রের আত্মাকে গলা টিপে হত্যা করেছিলেন। দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন স্বৈরাচারী মানসিকতা কাকে বলে। বিনা অপরাধে সেই সময়ে জেলে গিয়েছিলেন লাখ লাখ মানুষ। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধও করা হয়েছিল। সরকার তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতি বছর ২৫ জুন তারিখটিকে সংবিধান হত্যা দিবস হিসাবে পালন করার। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় যাঁরা ওই অমানবিক বেদনা সহ্য করেছিলেন, তাঁদের প্রতিই সম্মান জানাবে দিনটি।’’
