EXPLAINED: তৃণমূলের ‘কালো ঘোড়া’ কাশেম? – Bengali News | In depth: will TMC gets benefit after Furfura Sharif Pirzada Kasem Siddique appointed as party state general secretary
কলকাতা: বছর দুয়েক আগের কথা। ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তখন নিয়মিত রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা গিয়েছে ফুরফুরা শরিফের এক পীরজাদাকে। আর সেই পীরজাদা কাশেম সিদ্দিকীই এখন তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক। কয়েকদিন আগেই তাঁকে এই পদে বসিয়েছে রাজ্যের শাসকদল। রাজনীতিতে দলবদলের ছবি অপরিচিত নয়। কাশেম খাতায় কলমে কোনও দলেও ছিলেন না। ফলে অন্য দল থেকে তাঁর তৃণমূলে যোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে না। তারপরও রাজনৈতিক মহলে কাশেমের তৃণমূলে পদ পাওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। হঠাৎ কাশেমকে দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কেন করল তৃণমূল? আর কয়েকমাস পরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই কি দাবার কোনও চাল চালল শাসকদল? কাশেমের তৃণমূলে পদ পাওয়া নিয়ে কী বলছেন নওশাদ সিদ্দিকী? তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পিছনে কারণ নিয়ে কাশেমেরই কী বক্তব্য?
ফুরফুরা শরিফের পীরজাদার হাত ধরে আইএসএফের আত্মপ্রকাশ-
ভাঙড়ে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী ফুরফুরা শরিফের একজন পীরজাদা। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে নওশাদের দাদা পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী আইএসএফ গঠন করেন। আর একুশের নির্বাচনে কংগ্রেস ও সিপিএমের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ৩২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আইএসএফ। তার মধ্যে শুধু ভাঙড়ে তারা জেতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একুশের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের সঙ্গেই ছিল। আইএসএফ তৃণমূলের ভোট তেমনভাবে কাটতে পারেনি। কিন্তু, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ধর্মতলায় আইএসএফের প্রতিষ্ঠা দিবসের একটি কর্মসূচিতে পুলিশের উপর হামলা এবং সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর-সহ একাধিক অভিযোগে নওশাদ সিদ্দিকীকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর ফুরফুরা শরিফের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে তৃণমূলের। ৪১ দিন পর জামিন পান নওশাদ। ওই সময়ই মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী হেরে যান। নওশাদ জামিন পাওয়ার পরই তৃণমূলের একাধিক নেতাকে ফুরফুরা শরিফে যেতে দেখা যায়।
শাসকদলের বিরোধিতা করা কাশেমের তৃণমূল ঘনিষ্ঠতা কীভাবে?
নওশাদ ও আব্বাসের তুতো ভাই কাশেম সিদ্দিকী। একসময় ফুরফুরাতে তিনি তৃণমূল বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেইসময় সিপিএমের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কারও নজর এড়ায়নি। ২০২১ সালে আইএসএফ গঠন হওয়ার পর থেকেই আব্বাস ও নওশাদকে পুরোপুরি সমর্থন করতে শুরু করেন কাশেম। এমনকি, ২০২৩ সালে নওশাদকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর নিয়মিত রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হতেন।
সেই কাশেমকেই এ বছর মার্চে ফুরফুরা শরিফে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে তাঁকে দেখা যায়। রমজান মাসে ফুরফুরা শরিফে গিয়ে ইফতারে যোগ দিয়েছিলেন মমতা। সেখানে ছিলেন না ফুরফুরার দুই পীরজাদা আব্বাস ও নওশাদ তবে মমতার পাশে দেখা গিয়েছিল কাশেমকে। পরদিন কলকাতার পার্ক সার্কাসে ইফতারে মমতার পাশে ফের তাঁকে দেখা যায়। তারপরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, ফুরফুরা শরিফের সঙ্গে তৃণমূলের রসায়নে কি এবার নেতৃত্ব দেবেন কাশেম সিদ্দিকী? সেই জল্পনাতেই কার্যত সিলমোহর পড়েছে গত ৯ জুন। পীরজাদা কাশেম সিদ্দিকীকে দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক করেছে তৃণমূল।
তৃণমূলে যোগ দেওয়া নিয়ে কী বলছেন কাশেম?
এতদিন কোনও দলে সক্রিয়ভাবে তাঁকে দেখা যায়নি। মমতার সঙ্গে দুটি ইফতার পার্টিতে দেখা গেলেও তারপর আর তৃণমূলের কোনও অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি তাঁকে। তাহলে হঠাৎ তৃণমূলে যোগ দিলেন কেন তিনি? প্রশ্ন শুনেই কাশেমের সোজাসাপ্টা জবাব, “২৮ বছর ধরে ধর্মসভা করছি। দেখেছি, একটা দলে না আসা পর্যন্ত কোনও মানুষের জন্য কোনও কাজ করা যাবে না। এইজন্য সিদ্ধান্ত নিলাম, মানুষের জন্য কিছু কাজ করতে হবে। সেজন্য আমার দলে আসা। ফুরফুরা শরিফেও ঠিক ঠিক মতো কাজ হয়নি। মানুষ যাতে সঠিক কাজটা পায়, সেজন্য দলে আসা।”
একসময় বিভিন্ন ইস্যুতে রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ভবিষ্যতে কি কোনও ইস্যুতে সরব হতে দেখা যাবে তাঁকে? এতটুকু না ভেবেই কাশেম বললেন, “যেখানে মানুষ বিপদে পড়েছে, সেখানে প্রতিবাদ করেছি। আগামিদিনেও মানুষ বিপদে পড়লে প্রতিবাদ করব।”
কাশেমের তৃণমূলে যোগ দেওয়া নিয়ে কী বলছেন নওশাদ?
কাশেম তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক হওয়ার কয়েকঘণ্টার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেছিলেন নওশাদ। হাতে চায়ের কাপ ধরে নিজের ছবি দেন। সেখানে লেখেন, “কাপে কিন্তু চা নেই।” পরে নওশাদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি কাশেমের পক্ষে? যার জবাবে ভাঙড়ের বিধায়ক বলেন, “আমি ভাইয়েরও পক্ষে নই। আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ভাই ঠিক করেছেন কি না, সেটা ভাই জবাব দেন।”
কাশেমকে খোঁচা দিলেন তৃণমূলেরই বিধায়ক শওকত-
কাশেমকে দলে নেওয়ার কারণ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনই তৃণমূলের অন্দরেও নানা কথা শোনা যাচ্ছে। কাশেমকে খোঁচা দিতে ছাড়েননি ক্যানিং পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লা। তিনি বলেন, “আমরা যাঁরা তৃণমূল করি, তাঁদের নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর নেতার নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে এ বিষয়ে আমি কিছু বলব না। দল যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে তাজা আলু হোক আর পচা আলু হোক, সেগুলো নিয়েই আমাদের চলতে হবে। এর বেশি আমি কিছু বলছি না।” ভরতপুরের তৃণমূল বিধায়ক হুয়ামুন কবীরও খোঁচা দিতে ছাড়লেন না। তাঁর বক্তব্য, “রাজনীতির অ, আ, ক, খ জানেন না কাশেম সিদ্দিকী। লালবাজারের সামনে তৃণমূল নেতৃত্বকে কী ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, সবাই জানেন। এখন তাঁকে নেওয়ার পিছনে কী পরিকল্পনা রয়েছে, এটা ভবিষ্যৎ বলবে।”
গত মার্চে মমতার পাশে কাশেমকে দেখা যাওয়ার পর ফুরফুরার পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকী বলেছিলেন, নওশাদ যদি মমতার কথা না শোনেন, তাহলে ভাঙড়ে কোনও পীরজাদাকে নওশাদের বিরুদ্ধে প্রার্থী করতে পারে তৃণমূল। প্রার্থী হওয়া নিয়ে কাশেম নিজে কী ভাবছেন? তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া কাশেম বলছেন, “সেটা দল সিদ্ধান্ত নেবে। দল সিদ্ধান্ত নিলে স্বাগত জানাব।” কী হবে বিধানসভা নির্বাচনে? সত্যিই কি নওশাদের বিরুদ্ধে প্রার্থী হবেন কাশেম? নাকি কাশেমকে নিয়ে অন্য ‘পরিকল্পনা’ রয়েছে তৃণমূলের? এর জন্য আরও কয়েকমাস অপেক্ষা করতে হবে।
