Explained: সময়ের আগে উড়েই কি বিপদ ডেকে আনল বোয়িং-৭৮৭? – Bengali News | Air India Plane Crash: Investigating the Possible Causes Behind the Tragedy
আহমেদাবাদ: দুপুর ১টা ৩২ মিনিট। আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল বিমানবন্দর থেকে উড়ান দিল এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-এর এআই ১৭১ বিমানটি। এরপর ঠিক চার মিনিটের মাথায় বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ককপিট থেকে শেষবারের জন্য বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুমে এল মেডে কল। তারপরই দেশজুড়ে শিরোনামে এয়ার ইন্ডিয়ার এই লন্ডনগামী বিমান।
উড়ানের ঠিক চার মিনিটের মাথায় বিমান সরাসরি গিয়ে ধাক্কা মারে বিমানবন্দর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে থাকা মেঘানিনগরের বিজে মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে। তারপরই ভয়াবহ বিস্ফোরণ। নিমিষে ঝলসে গেল বিমানের মধ্য়ে বসে থাকে একের পর এক যাত্রী। নড়ে উঠল গোটা দেশ। ২০১০ সালে ম্য়াঙ্গালুরু বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনার ১৫ বছর এতটা ভয়াবহ দুর্ঘটনা দেখল ভারত।
বিমান পরিষেবা প্রদানকারী এয়ার ইন্ডিয়া ঘণ্টাখানেকের নিজের সমাজমাধ্য়মে বিমানে থাকা যাত্রী ও ক্রিউ সদস্য়ের সংখ্যা খোলসা করে। তারা জানায়, মোট ২৪২ জন যাত্রী ও ক্রিউ সদস্য-সহ উড়ান দিয়েছিল বোয়িং ৭৮৭। যার মধ্য়ে ৮ জন বিমানে কর্মরত ক্রিউ সদস্য। ১৬৯ জন ছিলেন ভারতীয়। ৫৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক। ৭ জন পর্তুগালের নাগরিক ও ১ জন কানাডার নাগরিক।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ছুটে এল বিপর্যয় মোকাবিলা দল, দমকল বাহিনী। ছুটে এল পুলিশ। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল, বিস্ফোরণটা যে রকম হয়েছে হয় তো কেউই রক্ষা পায়নি। পাশাপাশি, হস্টেলে এসে বিমান ধাক্কা মারায় প্রাণ গিয়েছে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক পড়ুয়ার। আহতের সংখ্য়াও বেড়েছে চড়চড়িয়ে। বিমান দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভিড়ে ঢেকে গেল স্থানীয় সিভিল হাসপাতাল। ভরদুপুরে মৃত্যু মিছিল দেখল গোটা দেশ। হারিয়ে গেল কতগুলো পরিবার, মারা গেল কত গুলো স্বপ্ন। একাধিক ভিডিয়ো ফুটেজে দেখা গিয়েছে, পর পর স্ট্রেচারে করে ঝলসানো দেহ নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছে পুলিশ, চিকিৎসকরা। ছিল হস্টেলে বিমানের ধাক্কায় আহত হওয়ারাও। তোলপাড় গোটা দিন। কীভাবেই ঘটল এত বড় দুর্ঘটনা? মিলল না উত্তর।
বিকাল হতেই দেশের অসামরিক বিমান পরিষেবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানাল, পাখির ধাক্কায় ইঞ্জিন নিষ্ক্রিয় হয়েই এমন কাণ্ড। ডিজিসিএ আরও জানিয়েছে, পাইলট MAYDAY কল দেওয়ার পর এটিসি-র তরফ থেকে যোগাযোগ করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। মুহূর্তের মধ্যে কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। বিজে মেডিক্যাল কলেজের ছাদে ইউজি হস্টেলের ছাদেই পড়ে যায় বিমানটি। বহু এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।
তবে তাদের বিবৃতির পরেও থেকে যাচ্ছে, কয়েকটা প্রশ্ন। কীভাবেই বা এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল? বিমানে কি কোনও যান্ত্রিক সমস্যা ছিল? নাকি অন্য কোনও কারণ? বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি…
- দেশের অসামরিক বিমান পরিষেবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, পাখির ঢুকে বিকল হয়ে পড়ে লন্ডনগামী সেই বিমানের দু’টি ইঞ্জিন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবির পরেও থেকে যাচ্ছে কিছু প্রশ্ন। যার মধ্য়ে সর্বপরী, কীভাবেই বা এত পাখির ঝাঁক সেখানে এল? বিমানবন্দরের কার্যত দায়িত্বের মধ্য়ে পড়ে, যেখানে থেকে বিমান ওঠা-নামা করছে, সেখানে যেন কোনও পাখির বাসা তৈরি না হয় বা এমন কোনও রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, যে সেখানে পাখিরা এসে জড়ো হতে পারে। যেমন, টাইম অফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন, ২০২৩ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় ২৪ জন নিরাপত্তা রক্ষীকে মোতায়েন করা হয়। যাদের কাজ বিমানবন্দরের রানওয়েতে যেন কোনও ভাবেই পশু-পাখি ঢুকে না পড়ে সেই দিকটা খেয়াল রাখা। তা হলে সেই সূত্র ধরে প্রশ্ন উঠছে, আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের কাছে কি কোনও সেরকম ব্য়বস্থা ছিল না?
- প্রশ্ন উঠছে উড়ানের সময় বিমানের গতি নিয়ে। ইতিমধ্যে দুর্ঘটনার যে কয়েকটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে ওড়ার ৪ মিনিটের মধ্য়ে বিমান ভেঙে পড়ে। নিজস্ব গতি পর্যন্ত ধরতে পারে না বিমানটি। এমনকি, ছুঁতে পারে না উচ্চতাও। ৬২৫ ফুট থেকেই মাটিতে আছড়ে পড়ে সেটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বোয়িং ড্রিমলাইনারের ওড়ার জন্য অন্তত ঘণ্টায় ৩৭০ থেকে ৪৬৩ কিলোমিটার গতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই বিমানের ক্ষেত্রে সেই গতি ছিল কিনা তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। একাংশের মতে, যে ভাবে এটি উড়ছিল, তাতে সম্ভবত ৩২৫ কিলোমিটার গতি ছিল বিমানটির। যার ফলে ওড়ার আগেই পতন। কিন্ত কেনই বা গতি ধরতে পারল না বিমান? তা তদন্তসাপেক্ষ।
- বিমান ওড়ার সময় কেন গতি পেল না, তার নেপথ্যে কিন্তু দায় থাকতে পারে রানওয়েরও। আহমেদাবাদ বিমানবন্দর সূত্রে জানা গিয়েছে, যে বিমান থেকে বোয়িং ৭৮৭ উড়ান নিয়েছিল, তার দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৬০০ মিটার। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, রানওয়ে পুরোটা অতিক্রম না করে মাঝপথে বিমান উড়ান নিলে, তা পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। সেই সময় বেড়ে যায় দুর্ঘটনার সম্ভবনা। এই ক্ষেত্রে কি তেমনই কিছু হয়েছিল? কিন্তু বিমানে বসে থাকা দুই পাইলটই অত্য়াধিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। বিমানের প্রথম পাইলট, বিমান চালিয়েছেন ৮ হাজার ২০০ ঘণ্টা। দ্বিতীয় পাইলট চালিয়েছেন ১ হাজার ১০০ ঘণ্টা। এমতাবস্থায় তারা কেনই বা এমন সিদ্ধান্ত নেবেন?
- ফ্ল্য়াপে সমস্যা ছিল কি? এই ফ্ল্য়াপ আসলে বিমানের ডানাকে সচল রাখার যন্ত্র। দুই ডানার পিছন দিকে হাওয়া কাটিয়ে বিমান চালনের কাজে ব্যবহার হয়। সর্বভারতীয় সংবাদসংস্থা মিন্ট-কে দুর্ঘটনার ভিডিয়ো ও ছবি বিশ্লেষণ করে এক মার্কিন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, ‘ভিডিয়ো দেখে সম্পূর্ণ ভাবে বোঝা কঠিন। কিন্তু ডানার ফ্ল্যাপগুলির অবস্থান সন্দেহজনক। একটি বিমানকে ওড়ার জন্য যে অবস্থানে ফ্ল্যাপ থাকার প্রয়োজন, তা সম্ভবত নেই। তবে ব্ল্যাক-বক্স উদ্ধার হলে, সেই সম্পর্কে আরও দৃঢ় ধারণা পাওয়া যাবে।’
- বিমান ভেঙে পড়ার আগে খোলা ছিল ল্যান্ডিং গিয়ার। ড্রিমলাইনার বিমানের যান্ত্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী, রানওয়ে ছেড়ে ওড়ার ১৬ সেকেন্ডের মধ্যে এর ল্য়ান্ডিং গিয়ার অর্থাৎ সেটির চাকা আবার ভিতরে ঢুকে যায়। কিন্তু এই বিমানটি যে আকাশে তারও অনেক বেশি সময় ছিল। তা হলে তারপরেও কেন বন্ধ হল না ল্য়ান্ডিং গিয়ারটি? এই প্রসঙ্গে টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে, এয়ার ইন্ডিয়ার প্রাক্তন বিমান চালক, ক্যাপ্টেন মনোজ হাতি জানিয়েছেন, ‘হতে পারে দু’টি ইঞ্জিনে ততক্ষণে আগুন ধরে গিয়েছিল বা বিকল হয়ে পড়েছিল। যার কারণে ল্যান্ডিং গিয়ার কাজ করেনি।’ এই চালকের মন্তব্যকে সমর্থন করে আরও এক প্রাক্তন বিমান চালক এহসান খালিদ জানিয়েছেন, ‘ল্যান্ডিং গিয়ার যেহেতু নামানোই ছিল, সেহেতু এটা হতেই পারে সমস্যা ততক্ষণে তৈরি হয়ে গিয়েছে।’ আর সেই দুই ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কথা তো জানিয়েছে ডিজিসিএ-ও।
- যান্ত্রিক গোলযোগ নয় তো? বোয়িং ৭৮৭ বিমানবন্দর থেকে ছাড়ার আগের মুহূর্তের একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে সমাজমাধ্যম জুড়ে। যেখানে দেখা গিয়েছে, বিমানের এসি, টিভি কোনওটাই ঠিক মতো কাজ করছে না। আহমেদাবাদে নামার আগে সেই ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে তুলে ধরেন এক যাত্রী। তারপর সেই বিমান আহমেদাবাদ থেকে চলে যায় লন্ডনের পথে। তবে কি কোনও যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছিল বিমানের অন্দরে? যার মাশুল গুনতে হল বিমানের ২৪১ জন যাত্রীকে?
