EXPLAINED: কোন ফাঁদে পা? কীভাবে সাধারণ ভারতীয়রা পাকিস্তানের ISI-র ‘সম্পদ’ হয়ে উঠল? – Bengali News | In depth: how ordinary Indians became Pakistani ISI assets?
কোন ফাঁদে পা দিয়ে আইএসআইয়ের গুপ্তচর হয়ে ওঠেন জ্যোতি মালহোত্রারা?Image Credit source: TV9 Bangla
নয়াদিল্লি: কেউ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। কেউ সরকারি কর্মী। কেউ আবার স্বাস্থ্যকর্মী। কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় ইউটিউবার হিসেবে চেনা মুখ। আর এই সাধারণ ভারতীয়রাই হয়ে উঠেছিলেন পাকিস্তানের ISI-র ‘সম্পদ’? কীভাবে? কোন ফাঁদে তাঁদের ফাঁসিয়েছিল পাকিস্তানের এজেন্টরা? টাকা-পয়সা? নাকি অন্য কিছু? এইসব সাধারণ ভারতীয় কি জেনেবুঝেই পাকিস্তানের এজেন্টদের হাতে দেশের স্পর্শকাতর তথ্য তুলে দিয়েছিলেন? ভারতীয় সেনার অপারেশন সিঁদুরের পর পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একের পর এক গ্রেফতারের ঘটনায় উঠে আসছে একাধিক প্রশ্ন। সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্যও।
গত ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরনে পর্যটকদের উপর হামলা চালিয়ে ২৬ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। বেছে বেছে পরিচয় জেনে হামলা চালানো হয়। এই জঙ্গি হামলার ১৫ দিনের মাথায় ভারতীয় সেনা পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ৯টি জায়গায় আঘাত হানে। একাধিক জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর পাকিস্তান বিনা প্ররোচনায় সীমান্তে গোলাবর্ষণ করে। যার যোগ্য জবাব দেয় ভারতীয় সেনা। কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাকিস্তান। এরপর পাকিস্তান সেনার ডিজিএমও ভারতীয় সেনার ডিজিএমও-কে ফোন করলে গত ১০ মে দুই দেশ সংঘর্ষবিরতিতে সম্মত হয়। অপারেশন সিঁদুরের পর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি দেশের নানা প্রান্ত থেকে একের পর এক ভারতীয়কে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার করে। রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট এবং পঞ্জাব থেকে ১৫ জনকে গ্রেফতার কিংবা আটক করা হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছেন মুম্বইয়ের এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। যিনি যুদ্ধজাহাজ সম্পর্কে স্পর্শকাতর তথ্য পাকিস্তানের এজেন্টের হাতে তুলে দিয়েছেন। আবার হরিয়ানার একজন ট্রাভেল ব্লগার রয়েছেন, লাহোরের বাজারে যাঁর আশপাশে সশস্ত্র রক্ষী দেখা গিয়েছে। তালিকায় রয়েছেন রাজস্থানের একজন সরকারি কর্মী, যিনি সাতবার পাকিস্তানে গিয়েছেন যার কোনও কারণ জানাতে পারেননি। পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির তালিকায় এক সিআরপিএফ জওয়ানও রয়েছেন।
ধৃতদের তালিকায় কারা রয়েছেন?
হরিয়ানার ইউটিউবার জ্যোতি-
পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ধৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে হরিয়ানার এক ইউটিউবারের নাম। জ্যোতি মালহোত্রা। ট্রাভেল ব্লগার। তাঁর একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। গত ১৬ মে তাঁকে গ্রেফতার করে হরিয়ানা পুলিশ।
তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসে। দিল্লিতে পাকিস্তানের দূতাবাসের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। একাধিকবার পাকিস্তান গিয়েছেন। সেখানে ১৫ দিনের গুপ্তচরবৃত্তির প্রশিক্ষণও নেন বলে অভিযোগ। লাহোরের বাজারে সশস্ত্র রক্ষী দ্বারা পরিবেষ্ঠিত হয়ে তাঁর ঘুরে বেড়ানোর ছবিও সামনে এসেছে। এক স্কটিশ ইউটিউবারের ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, লাহোরের আনারকলি বাজারে হেঁটে যাচ্ছেন জ্যোতি, পাশে একে-৪৭ নিয়ে তাঁকে পাহারা দিচ্ছেন ৬ জন রক্ষী।
মধু-ফাঁদে মহারাষ্ট্রে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার –
মুম্বইয়ের একটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থার কর্মী বছর সাতাশের রবীন্দ্র ভার্মা। পাকিস্তানের এজেন্টের মধু-ফাঁদে ফেঁসে যান তিনি। মহারাষ্ট্র পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াড তাঁকে গ্রেফতার করে। জেনেবুঝেই ভারতীয় নৌসেনার যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের তথ্য পাচার করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কর্মসূত্রে দক্ষিণ মুম্বইয়ের নৌসেনার ডকইয়ার্ডে যাতায়াত করতেন তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, ডকইয়ার্ডের ভিতরে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া যায় না। ফলে, সেখানে কাজ করার পর যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন নিয়ে স্পর্শকাতর তথ্যগুলি স্কেচ ও ডায়গ্রাম এঁকে পাকিস্তানের এজেন্টকে পাঠাতেন তিনি। অডিয়ো নোটের মাধ্যমেও তথ্য শেয়ার করতেন। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে পাকিস্তানের এজেন্টের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
এটিএস জানিয়েছে, রবীন্দ্রকে হানি ট্র্যাপের জালে ফাঁসায় পাকিস্তানের এক এজেন্ট। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে মহিলা বলে পরিচয় দিয়ে রবীন্দ্র ভার্মার সঙ্গে আলাপ জমায় পাকিস্তানের ওই এজেন্ট। ধীরে ধীরে ওই ইঞ্জিনিয়ারকে মধু-ফাঁদে ফাঁসায়। পাকিস্তানের এজেন্টের মধু-ফাঁদে পা দিয়েই ওই যুবক স্পর্শকাতর তথ্য পাচার করেন। স্কেচ, ডায়াগ্রাম ও অডিয়ো নোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের এজেন্টকে তথ্য পাচার করেছেন ওই ইঞ্জিনিয়ার। এর জন্য ভারত ও বিদেশের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁকে টাকাও পাঠানো হয়েছে।
ধৃত সিআরপিএফ জওয়ান-
ধৃতদের তালিকায় রয়েছেন সিআরপিএফ জওয়ান মোতিরাম জাঠ। কোনও পদস্থ অফিসার নন তিনি। কিন্তু, সিআরপিএফের অভিযানের তথ্য তাঁর জানা। ২০২৩ সাল থেকে পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স অফিসারদের (PIO) সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তদন্তে জানা গিয়েছে, টাকা বিনিময়ে প্রতিবেশী এই দেশের হাতে স্পর্শকাতর তথ্য তুলে দিতেন তিনি।
তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় গতিবিধি দেখে সন্দেহ হয়েছিল তদন্তকারীদের। দিল্লি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সিআরপিএফের তরফে জানানো হয়, বাহিনীর নিয়ম ও প্রোটোকল ভঙ্গ করায় তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মোতিরাম জাঠ বর্তমানে NIA হেফাজতে রয়েছেন। ৬ জুন পর্যন্ত তাঁকে নিজেদের হেফাজতে পেয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। কোন কোন তথ্য তিনি পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ধৃতদের তালিকায় স্বাস্থ্যকর্মী-
তিনি একজন স্বাস্থ্যকর্মী। গুজরাটের সীমান্ত জেলা কচ্ছের বাসিন্দা। বছর সাতাশের সেই সহদেব সিং গোহিলও ছিলেন পাকিস্তানের গুপ্তচর। ভারতীয় সেনার পরিকাঠামোর তথ্য তিনি পাকিস্তানের এজেন্টের কাছে পাঠাতেন বলে অভিযোগ।
এটিএস-র তরফে জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালের জুন-জুলাইয়ে অদিতি ভরদ্বাজ নামে এক মহিলার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হয় গোহিলের। কথা বলে গোহিল জানতে পারেন, ওই মহিলা পাকিস্তানের এজেন্ট। বিএসএফ ও নৌসেনার নির্মীয়মাণ কিংবা সদ্য নির্মিত সাইটের ছবি চান ওই মহিলা। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সেইসব ছবি পাঠাতে শুরু করেছিলেন গোহিল। পাকিস্তানের এজেন্টের জন্য নিজের আধার কার্ড ব্যবহার করে সিমকার্ডও কিনেছিলেন গোহিল। গুজরাট এটিএস জানিয়েছে, এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি গোহিলকে ৪০ হাজার টাকা নগদ দিয়েছিল।
পুলিশের জালে রাজস্থানের সরকারি কর্মী-
পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে উঠেছে রাজস্থানের এক সরকারি কর্মীর। বছর উনপঞ্চাশের ধৃত শাকুর খান একসময় রাজস্থানের কংগ্রেসের প্রাক্তন মন্ত্রী শালে মহম্মদের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে শাকুর খান গ্রেফতার হওয়ায় রাজস্থানে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। শাকুর খান কমপক্ষে সাতবার পাকিস্তানে গিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
ধৃতদের তালিকায় ব্যবসায়ী থেকে পড়য়া-
ইউটিউবার, স্বাস্থ্যকর্মী শুধু নয়। ব্যবসায়ী থেকে ছাত্রদেরও নিজেদের গুপ্তচর বানাতে চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ থেকে শাহজাদ নামে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ওই ব্যবসায়ী একাধিকবার পাকিস্তান সফরে গিয়েছেন।
পঞ্জাবের পাতিয়ালার দেবেন্দ্র সিং ধিলো নামে বছর পঁচিশের এক পলিটিক্যাল সায়েন্সের ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সেনাঘাঁটির ছবি পাকিস্তানের এজেন্টের হাতে তুলে দেন। হরিয়ানার পানিপথ থেকে নৌমন ইলাহি নামে বছর চব্বিশের এক সিকিউরিটি গার্ডকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় শনিবার (৩১ মে) আটটি রাজ্যের ১৫টি জায়গায় তল্লাশি চালায় NIA। এই আটটি রাজ্য হল দিল্লি, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়, অসম এবং পশ্চিমবঙ্গ। কলকাতার তিনটি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। আলিপুরের একটি দোকান, খিদিরপুরের একটি ট্রাভেল এজেন্সি এবং পার্ক সার্কাসের একটি হোটেলে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশি অভিযানের সময় একাধিক নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
