Civic Volunteers Explained: ‘বাঁশের’ চেয়ে ‘সিভিকের’ দর কেন বেশি? – Bengali News | Why so much bad reputation, What is the salary of civic volunteers, how are they recruited
কখনও ‘তোলাবাজি’, কখনও এলাকায় ‘দাদাগিরি’, কখনও আবার পুলিশের উর্দি গায়ে চাপিয়ে পুলিশ সেজে ধমক-চমক, ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অবস্থা যা তাতে বিগত কয়েক বছরের সিভিক দৌরাত্ম্য মাথাব্যথা বাড়িয়েছে সরকারেরও। কথায় আছে বাঁশের চেয়ে কঞ্চির দর বেশি। সিভিকদের রমরম দেখে এই প্রবাদই যেন নতুন করে ঘুরছে নাগরিক মহলে। গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগের পরেও সিভিকদের দৌরাত্ম্য না থামায় বারবার প্রশ্ন উঠেছে সিভিক ভলান্টিয়ারদের ক্ষমতা, চাকরির সীমাবদ্ধতা নিয়ে। এমনকি জল গড়িয়েছে আদালতেও। সেখান থেকে ‘কাজ’ বুঝিয়ে দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নিয়ে বারবার উঠেছে প্রশ্ন। সিভিক নিয়োগ নিয়েও জলঘোলা হয়েছে রাজনৈতিক আঙিনাতেও। পুলিশ কর্তাদের একাংশ যদিও বলছেন গোড়ায় গলদ। কিন্তু কেন?
আছে কোনও ডিউটি রুলস?
প্রাক্তন পুলিশ কর্তা সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, আমরা অনেক আগেই ওদের কাজ নিয়ে একটা নির্দিষ্ট নির্দেশিকার কথা বলেছিলাম। সবসময়ই বলতাম কী করা যাবে, আর যাবে না তা নিয়ে ওদের যেন ন্যূনতম একটা ৬০ দিনের ট্রেনিং দেওয়া হয়। তাহলে ওদের কাজে অনেকটাই সুবিধা হত। কিন্তু, ওদের কাজ নিয়ে সরকারের কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই। তাঁর কথায়, “তাঁদের যদি বলে দেওয়া যায় তাঁরা টাকা তুলতে পারবে না, মদ খেয়ে ডিউটি করতে পারবে না, তুমি বাইকে পুলিশ কথা লিখতে পারবে না, তোমাদের সবকিছুই ওসি-র অর্ডারে করতে হবে, হাজিরা নিয়মিত থাকতে হবে। এই পুরো বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকলে অনেকটাই সুবিধা হত।”
প্রসঙ্গত, আরজি কর কাণ্ডের পর ফের একবার বড়সড় প্রশ্ন উঠেছিল সিভিক ভলান্টিয়রদের ভূমিকা নিয়ে। সেই সময়েও শোনা গিয়েছিল ‘স্পেশ্যাল ট্রেনিংয়ের’ কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হুগলির এক সিভিক ভলান্টিয়র বলছেন, “তিন মাসের ইন হাউস ট্রেনিং হওয়ার কথা ছিল। অনেক জায়গাতে ট্রেনিং হয়েছে। তবে হুগলি গ্রামীণ পুলিশে এখনও কোনও ট্রেনিং হয়নি।” তবে ভোট এলে প্রায়শই আসে নানা ‘নির্দেশিকা’। সেই সময় ডিউটিতে কী কী নিয়ম মানতে হবে, কী করা যাবে, কী করা যাবে না, তা লেখা থাকে।
প্রশ্ন উঠেছিল সুপ্রিম কোর্টেও

আরজি কর কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়র সঞ্জয় রায় ধরা পড়তেই সুপ্রিম কোর্টেও সিভিকদের নিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রশ্ন উঠেছিল। সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগের পদ্ধতি কী? নিয়োগে যোগ্যতার মাপকাঠি কী? মাস শেষে সিভিকদের বেতন হয় কীভাবে? কোন প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নিয়োগ করা হচ্ছে? এই সব প্রশ্নেরই উত্তর চেয়েছিল দেশের শীর্ষ আদালত। ফের সিভিকদের নিয়ে শুরু হয়েছিল দীর্ঘ চাপানউতোর। একসময় এই সিভিকদের ইন্টারভিউ নিয়ে নিয়োগের দায়িত্ব ছিল সত্যজিৎবাবুর মতো আইপিএস অফিসারদের কাঁধে। সেই সিভিক নিয়োগের স্মৃতির রাস্তায় হাঁটতে দিয়ে তিনি আবার মনে করালেন গ্রিন পুলিশের কথা। তিনি বলছেন, “প্রথমে গ্রিন পুলিশ নাম দেওয়া হয়েছিল কারণ এদের শুধু নাগরিক পরিষেবার সংক্রান্ত সমস্যার কাজে এদের ব্যবহার করা হবে। জল, বৃষ্টি বা পরিবেশ সংক্রান্ত কাজে কোনও দরকার পড়লে এদের ডাকার কথা ছিল। শুরুতে এটা শুধু কলকাতায় হয়েছিল।”
কীভাবে নিয়োগ? কোন পথে বাছাই?
রাজ্য পালাবদলের পরেই বের হয় সিভিক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি। তা নিয়ে যদিও বিস্তর বিতর্কও হয়েছিল। যোগ্যতার মাপকাঠি থেকে ট্রেনিং ছাড়া নিয়োগ, সব কিছু নিয়েই উঠে গিয়েছিল প্রশ্ন। প্রাক্তন পুলিশ কর্তা সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “ওদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমেই বডি ফিটনেস দেখা হত। ফিটনেস দেখার পর বয়সটা যেন কমের দিকে ছিল সেটা দেখা হত। ২১ বছরের পর থেকেই কেউ আবেদন করতে পারতো। আলাদা করে ঊর্ধ্বসীমা না থাকলেও বলা হত ৪০ বছরের মধ্যে রয়েছে এমন আবেদনকারীদের নিতে।” পুরো প্রক্রিয়া চলতো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীনে। কিন্তু, হাজার হাজার আবেদনকারীর মধ্যে কাকে নেওয়া হবে, কে পাবে অগ্রাধিকার, কে বেশি যোগ্য তা বাছাই করা হত কীভাবে? সত্যজিৎবাবু বলছেন, “সিভিকদের কোনও ট্রেনিং হত না। তবে দেখা হত তাঁদের কোনও ক্রিমিন্যাল রেকর্ড আছে কিনা। থাকলে বাদ দেওয়া হত। একইসঙ্গে কেউ কোনও নেশা করতো কিনা সেটাও দেখা হত। একইসঙ্গে সমাজের জন্য কাজ করার ইচ্ছা, সমাজসেবা করার ইচ্ছা যাঁদের রয়েছে সেই সমস্ত ছেলেদেরই দেখা হত।”
এ ক্ষেত্রে সরকারের সিভিক নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রাক্তন পুলিশ কর্তা অনিল জানাও। গোটা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলছেন, “আরজি করের ঘটনার পর বলছে চাকরি করতে করতে ট্রেনিং হবে। এগুলো অবান্তর কথা। এদের তো একটা ন্যূনতম ট্রেনিং দিতে হবে। কিন্তু তা ছাড়া যদিও এই পদ্ধতিতে কাজ চলে তাহলে আর কী হবে!”
‘পুলিশের হেল্পিং হ্যান্ড’
ওয়াকিবহল মহলের মতে, মূলত পুলিশের হেল্পিং হ্যান্ড হিসাবেই সিভিকদের নেওয়া হত। পুলিশের কাজের চাপ কিছুটা লাঘব করতেই সিভিক উদ্যোগ। তবে পুরো কাজই মূলত ‘ভলান্টিয়ারি মোডে’। শুরুতে বেতন ছিল সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজারের মধ্যে। পরবর্তীতে তা বেড়ে এখন ১১ হাজার টাকার কাছাকাছি। সত্যজিতবাবু বলছেন, “কলকাতা ও রাজ্য পুলিশে তো ১ লাখ মানুষ পিছু প্রায় ৯৭.২ জন পুলিশ আছে। যা গোটা দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটাই কম। তাই কিছুটা ঘাটতি মিটিয়ে পুলিশের কাজে সাহায্য করতেই মূলত সিভিকদের নেওয়া হয়েছিল।” প্রাক্তন পুলিশ কর্তা অনিল জানা যদিও বলছেন বর্তমানে সিভিকরা যে পরিমাণ কাজ করছেন সেই তুলনায় বেতন তাঁরা পাচ্ছেন না। তাঁর কথায়, “এরা যে কাজ করছে, যে ভার নিচ্ছে সেটা কন্সস্টেবলদের। ওদের সমান কাজ করছে। কিন্তু, সেই তুলনায় মাইনে পাচ্ছে না। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে।”
কীভাবে পুলিশ থেকে ভলান্টিয়র? ভুল করলে কী শাস্তি?
শুরুতে এদের নামের পাশে পুলিশ থাকলেও অচিরেই তা উঠে যায়। তা নিয়েও জলঘোলা-বিতর্ক কম হয়নি। এখনও অনেকেই সিভিক ভলান্টিয়র বলতে গিয়ে ভুল করে সিভিক পুলিশও বলে ফেলেন। সব মিলিয়ে ‘শর্টে সিভিক’দের নিয়ে সত্যজিতবাবু বলছেন, ওদের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ কাজের সঙ্গে এখন নামের মিল আছে। কিন্তু, আগে ওরা নামের অপব্যহার করছিল। সত্যজিতবাবু বলছেন, “প্রথমদিকে যখন নিয়োগ হয়েছিল তখনই ঠিক হয়েছিল এদের সিভিক পুলিশ হিসাবে নেওয়া হবে। আগে এদের নাম সিভিক পুলিশই ছিল। পরে তা বদলে সিভিক ভলান্টিয়র করা হয়। কারণ গাড়িতে, বাইকে ওরা পুলিশ লিখে ঘুরছিল। তা ছাড়াও নানা অভিযোগ উঠছিল। ওদের কাজের গতিপ্রকৃতি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে থাকে। তখনই ভলান্টিয়র নাম দেওয়া হয়। কারণ কাজটাই তো ভলান্টিয়ারি সার্ভিস, পার্মানেন্ট কাজ নয়। এটা মাথায় রাখতে হবে। ট্র্যাফিক পুলিশের অফিসার ইন চার্জ থেকে কোনও থানার ওসি-দের সাহায্য করার জন্যই ওদের নেওয়া হত।” কিন্তু, সিভিকদের ক্ষেত্রে কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব? কী বলছে চাকরির নিয়ম? সত্যজিতবাবু বলছেন, “এরা কোনও অসামাজিক, বেআইনি কাজ করলেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তৎক্ষনাৎ তদন্ত কমিটি বসিয়ে ঠিক ভুল বিচার করে এদের বরখাস্ত বসানো যেতে পারে।”