Explained: সুদর্শনের ‘বাবার বাবা’ S-500, রাশিয়ার এই অস্ত্র কিনবে ভারত? – Bengali News | In Depth: Russia’s S 500 Air Defense System, unmatched power in the skies?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়ার এস-৫০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ‘প্রমিথিউস’ আরও খতরনাক
পহেলগাঁও হামলার প্রত্যাঘাতে পাক জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ৭-মে মধ্যরাত থেকে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সিঁদুর’। পাল্টা জবাব দিতে ৯ ও ১০ মে ভারতের সেনাঘাঁটিতে হামলার চেষ্টা করে পাক সেনা। কিন্তু ভারতের শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স গ্রিডের কারণে একটাও পাক ফাইটার জেট, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন- ভারতের কোনও মিলিটারি বেস-এ দাঁত ফোটাতে পারেনি। খোদ ভারতের ডিরেক্টর জেনারেল মিলিটারি অপারেশন বা ডিজিএমও লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব ঘাই একথা স্পষ্ট করেন। পাক বিমান হামলার মুখে ভারতের অন্তত ১৫টি শহরকে বাঁচাতে রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা ‘এস-৪০০ সুদর্শন চক্র’ ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল ।
১৯৯০-তে নির্মিত রাশিয়ার আলমাজ আনটের নির্মিত এই মোবাইল সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম (SAM) ২০০৭ থেকেই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, কিন্তু ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর খোদ মস্কো-ও তাদের ডিফেন্স সিস্টেমের জোরদার প্রচারে নেমেছে। সম্প্রতি রেড স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ৮০-তম মস্কো ভিকট্রি ডে সেনা প্যারেডেও অন্তত ৩০টি দেশের রাষ্ট্রনেতাদের সামনে পুতিন সদর্পে দেখালেন এস-৪০০-এর কামাল।
এত কথা বলছি, কারণ এবার এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকেও আপগ্রেড করে ফেলেছে রাশিয়া। রুশ সংবাদমাধ্যমের দাবি মোতাবেক, নয়া এস-৫০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ‘প্রমিথিউস’ আরও খতরনাক। ইতিমধ্যেই এস-৫০০ ক্রিমিয়াতে পাঠিয়েছে রাশিয়া। আর এদিকে, এস-৪০০-এর ব্যাপক সাফল্যের পর ভারতেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এবার কি এস-৫০০ কেনার দিকেও ঝুঁকবে দিল্লি? দেশের DGMO স্পষ্টই জানিয়েছেন, পুরনো সব প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে এবারের যুদ্ধ যেমন আধুনিক সমরাস্ত্রের সাহায্যে ভারত লড়েছে, তেমনই ভবিষ্যতের যুদ্ধও আরও আধুনিক সরঞ্জামেই হবে। আর সেই কারণেই এস-৫০০ বা ‘প্রমিথিউস’ নিয়ে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
এই খবরটিও পড়ুন
প্রথমেই জেনে রাখা দরকার, যে সংস্থা এস-৪০০ বানিয়েছে, তারাই মানে রুশ সংস্থা আলমাজ-আনটে গ্ৰুপই S-500 Prometheus বানিয়েছে। গ্রীক পুরাণ মতে, জিউসের পুত্র ‘প্রমিথিউজ’ হলেন আগুনের দেবতা। শুধু তাই নয়, তিনি বুদ্ধির প্রতীক ও মানবিকতার বাহক। তাঁর নামেই এই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের নাম। কারণ, রাশিয়ার মতে এটাও নাকি বিশ্ব মানবতাকে রক্ষা করার জন্যই নির্মিত।
রুশ সেনার দাবি, এস-৫০০ সারফেস টু এয়ার অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেম (ABM) বিশ্বের যে কোনও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রকে (শব্দের চেয়ে জোরে ছোটে যে ক্ষেপণাস্ত্র) আটকে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, ইন্টারকনটিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM), স্টেলথ এয়ারক্রাফট (যে যুদ্ধবিমান রেডার ফাঁকি দিতে সক্ষম) এমনকী মহাকাশে লোয়ার অরবিটে থাকা উপগ্রহকেও ধ্বংস করতে পারে। এস-৪০০, এস-৫০০ ও এ-২৩৫ এবিএম মিসাইল সিস্টেমের ত্রিমুখো ফলা মস্কো-কে যে কোনও পারমাণবিক হামলার থেকেও বাঁচাতে পারে বলে দাবি রুশ সেনার। নির্মাণকারী সংস্থার কর্ণধারের বক্তব্য, এস-৫০০ মহাকাশের লো অরবিট স্যাটেলাইটকেও ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে। ভাবা যায়! আজ রাশিয়ার সবচেয়ে সুরক্ষিত ও গোপন সেনাঘাঁটি, শহর, প্রশাসনিক ভবনকে নিরাপদে রাখতে এস-৫০০ মোতায়েন রয়েছে। এই ডিফেন্স সিস্টেম সরাসরি ন্যাটো-কে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা রাখে।
পূর্বসূরি এস-৪০০-এর মতোই এস-৫০০-এরও সবচেয়ে বড় গুণ, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের হামলার ধরণ বদলানোর ক্ষমতা। মানে, এস-৫০০ শুধুমাত্র ধেয়ে আসা মিসাইলকেই নষ্ট করে না, হামলাকারী মিসাইল যদি মাঝপথে নিজের অভিমুখ বদলে (যেমন ব্যালিস্টিক মিসাইল করতে পারে) অন্য কোনও দিকে হামলা চালাতে যায়, সেটাকেও আগাম আঁচ করে নষ্ট করে দেবে ‘প্রমিথিউস’। আধুনিক আকাশপথে যুদ্ধে (modern aerial warfare) রুশ মিলিটারির বড় সম্পদ এই এস-৫০০। এতে বিভিন্ন ধরণের মিসাইল থাকে। এক একটি মিসাইল এক একরকমের হামলাকে প্রতিহত করতে পারে। এস-৫০০ একটি থিয়েটার ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স (Theater Ballistic Missile Defense) বা TBMD সিস্টেম। অর্থাৎ, কোনও একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে (যুদ্ধের ভাষায় একে বলে থিয়েটার) ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার হাত থেকে বাঁচাতে এর ব্যবহার করা হয়। যেমন মস্কো, রুশ সেনার সদরঘাঁটি বাঁচাতে এটি মোতায়েন করা রয়েছে। TBMD সিস্টেমে সেন্সর, ইন্টারসেপ্টর মিসাইল থাকে যেগুলি ধেয়ে আসা মিসাইলকে খুঁজে, চিহ্নিত করে মাঝআকাশেই নষ্ট করে ফেলতে পারে। আপাতত BAZ-6909 মাল্টি টেরেন ভেহিক্যালস-এ লাগানো রয়েছে এস-৫০০। মার্কিন ডিফেন্স সিস্টেম THAAD বা US Patriot ডিফেন্স সিস্টেমের চেয়েও অনেকে এস-৫০০-কে এগিয়ে রাখেন।

এবার আলোচনায় আসা যাক এস-৫০০ এর রেডার ও টার্গেটিং সিস্টেম নিয়ে। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক এস-৫০০-এর রেডার ৬০০ কিলোমিটার দূর থেকে ধেয়ে আসা ‘থ্রেট’-কে নিউট্রালাইজ করতে পারে। সাধারণ রেডারে ধরা পড়ে না এমন ‘অদৃশ্য’ স্টেলথ যুদ্ধবিমানকেও বহুদূর থেকে নিশানা করে মাঝআকাশেই ধ্বংস করতে পারে এস-৫০০। এই সফিস্টিকেটেড রেডার কমপ্লেক্সে চারটি করে রেডার ভেহিক্যালস থাকে। ৯১এনসিক্সই(এম) এস ব্যান্ড অ্যাকুইজিশন রেডার, সি ব্যান্ড রেডার, মাল্টি মোড এনগেজমেন্ট রেডার ও অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিশাল এনগেজমেন্ট রেডার। এই চারটি রেডার ব্যান্ডের মাল্টিপল ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করেই স্টেলথ ফাইটার জেটকে নিখুঁতভাবে নিশানা করতে পারে এস-৫০০। যার মানে, মার্কিন এস-২২ বা এফ-৩৫-র এস-৫০০-এর কাছে কাবু।
এবার আসা যাক একসঙ্গে কতগুলি টার্গেটকে ধ্বংস করতে পারে এস-৫০০, সেই আলোচনায়।
এস-৫০০ রেজিমেন্টে সবমিলিয়ে ১২টি লঞ্চার থাকে। রুশ সেনার দাবি, একসঙ্গে ১০টি মিসাইল ধেয়ে এলেও ৩ সেকেন্ডেরও কম সময়ে সবকটি মাঝআকাশেই ধ্বংস করে ফেলতে পারে এস-৫০০। মানে, এস-৪০০-এর চেয়েও কম সময়ে। ব্যালিস্টিক বা ধেয়ে আসা মিসাইল যদি মহাশূন্য থেকেও আসে, তাহলেও এস-৫০০-এর রেডার তাকে ২০০০ কিলোমিটার দূর থেকে ট্র্যাক করতে পারে। দেশের সীমানা বা এনজেগমেন্ট জোন-এ ঢোকার বহু আগেই ব্যালিস্টিক মিসাইল বা এয়ারবর্ন টার্গেটকে নষ্ট করতে ওস্তাদ এই ডিফেন্স সিস্টেম। লো-অরবিট স্যাটেলাইট বা ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক মিসাইলকে তাদের মাঝপথেই ধ্বংস করে দিতে পারে। এক একটি এস-৫০০ সিস্টেমে ৪টি করে লং রেঞ্জ সারফেস টু এয়ার মিসাইল থাকে যেগুলির এক একটির পাল্লা ৪০০ কিলোমিটার। থাকে দুটি করে ৭৭এন৬ ইন্টারসেপ্টর, যার পাল্লা ৬০০ কিলোমিটার। মাটি থেকে ২০০ কিলোমিটার উপরে ধেয়ে আসা টার্গেটকে নষ্ট করে ফেলতে পারে। rapid launch সক্ষমতা ও ঘনঘন গুলি চালানোর দক্ষতার জন্য একসঙ্গে দ্রুতগতিতে ছুটে আসা বহু টার্গেটকে নষ্ট করতে সক্ষম। পরীক্ষার সময় রাশিয়ারই তৈরি ‘কিঞ্জল’ ব্যালিস্টিক মিসাইলকে সাফল্যের সঙ্গে আকাশেই ধ্বংস করে এস-৫০০। ২০২১-এ রাশিয়ার এয়েরোস্পেস আর্মি ইউনিটের প্রথম এই এস-৫০০ সিস্টেম হাতে পায়। ২০২৪-এ প্রথম ক্রিমিয়ার ব্রিজ আগলাতে মোতায়েন হয় এস-৫০০। ইউক্রেন যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে ২০৩০-৩৫-এর মধ্যে অন্তত ৬০টি এমন সিস্টেম তৈরি করে ফেলবে রাশিয়া।

কোথায় মোতায়েন?
সেটা গোপন রেখেছে মস্কো। তবে প্রেসিডেন্টের ভবন, সেনার সদর ঘাঁটি, অস্ত্র ভাণ্ডার আগলাতে এস-৫০০ মোতায়েন আছে বলে রিপোর্ট নানা সংবাদমাধ্যমে। ২০১৮-তে ঘটা করে ‘কেরচ ব্রিজ’ উদ্বোধন করেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ক্রেমলিনকে জুড়েছে প্রায় ২০ কিলোমিটার লম্বা এই ব্রিজ। এই ব্রিজ রক্ষায় মোতায়েন রয়েছে ১২টি এস-৫০০। ইউক্রেন বারবার এই ব্রিজকে টার্গেট করে হামলা চালায়, তাই রুশ আবেগকে রক্ষায় ব্রিজে মোতায়েন রাখা হয়েছে ‘প্রমিথিউজ’কে। তবে সবচেয়ে ইঙ্গিতবাহী রুশ ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। তাঁর ইঙ্গিত, এস-৫০০-এর প্রথম ও সর্ববৃহৎ ক্রেতা হতে পারে ভারতই। আর রফতানি শুরু হতে পারে এবছরই।
