RG Kar: ‘কাঁদানে গ্যাস আর হ্যান্ড গ্রেনেডের বিষাক্ত ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু…’ – Bengali News | RG Kar: First hand experience of TV9 reporter Aritra Ghosh
বুধ রাতে আতঙ্কিত অরিত্রImage Credit source: TV9 Bangla
অরিত্র ঘোষ, কলকাতা: বুধবার রাত সোয়া বারোটা নাগাদ আমরা আরজি করের ভাঙচুরের খবর পেয়েছিলাম। আমাদের এক সহকর্মী খুব বাজেভাবে হাসপাতালের ভিতরে আটকে পড়েছিল। কারণ সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের উপরও ওরা হামলা করছিল। এরপরই আমরা আরজি করের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু মাঝ রাস্তায় আমাদের আটকে যেতে হয়। শ্যামবাজার, বেলগাছিয়া – খালপাড়ের যে জায়গাগুলি রয়েছে, প্রত্যেকটি রাস্তাতে অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ দাঁড়িয়েছিল। গাড়ি নিয়ে সেই সব রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করা যায়নি। আমাদের যেমন প্রাণভয় ছিল, তেমনই সঙ্গে ক্যামেরা ছিল। কিছুক্ষণ আগেই আমাদের একটা ক্যামেরা ভাঙা হয়েছে বলে খবর পেয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল আমার ক্যামেরা পার্সন অরিৎ বসু। আমরা দুজনেই সেই সময় গাড়ি থেকে নেমে ধীরে-ধীরে আরজি করের দিকে এগোতে শুরু করি।
কিছুটা দূর যাওয়ার পর, আমরা যখন আরজি কর থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে, হঠাৎ দেখি বিশাল সংখ্যক জনতা ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। সেই সময় আমরা প্রাণভয়ে একটা বাড়ির একতলায় আশ্রয় নিই। কিছু পরে, সেই উন্মত্ত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। তারপর আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আবার আরজি করের দিকে এগোতে থাকি। সেই সময় দেখি হাড় হিম করা এক ছবি। মাত্র জনা দশেক পুলিশকর্মীর সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে প্রায় হাজারখানেক বিশৃঙ্খল জনতার। তাদের খণ্ডযুদ্ধর মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম আমরা। বড় বড় ইট-রাটকেল ছুটে আসছিল আমাদের দিকে। আমাদের সামনেই এক পুলিশকর্মী আহত হন। আমরাও আহত হই। অরিতের পায়ে ইট লাগে। আমার পায়ে বড় একটি ইট এসে লাগে। কাঁধেও হালকা চোট লেগেছিল। কিন্তু আমাদের কে তো খবর দেখাতেই হবে। আতঙ্ক ছিল হয়তো সেখান থেকে আর বের হতে পারব না। কিন্তু, তারমধ্যেই আমরা খবর দেখিয়ে গিয়েছি।
এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে শুরু করে। গ্যান্ড গ্রেনেড ফাটায়। সেই সময় আমরা দুজনেই সেই কাঁদানে গ্যাস এবং হ্যান্ড গ্রেনেডের বিষাক্ত ধোঁয়ায় সাময়িকভাবে অসুস্থ বোধ করছিলাম। কিন্তু, কিছু পরেই আবার আমরা কাজে ফিরি। সেই সময় তুলকালাম চলছিল আরজি করের আশপাশের এলাকাগুলিতে। বৃষ্টির মতো ইটের টুকরে পড়ছিল। উন্মত্ত জনতা কার্যত পুলিশক লক্ষ্য করে ভযঙ্কর আক্রমণ করে যাচ্ছিল। শুধুমাত্র রাস্তার ওই পার থেকেই নয়, ওই এলাকায় যে বহুতল বাড়িগুলি রয়েছে, সেগুলির তল থেকেও মুহূর্মূহূ ইট ছুটে আসে।
এর মধ্য়ে আমরা চলে এসছিলাম আরজি করের সামনে। সেখানে এসে দেখি, এমার্জেন্সির সামনে পুলিশের যে আউটপোস্ট ছিল, তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ যে ব্যারিকেড তৈরি করেছিল, তা ভেঙে নীচে পড়ে আছে। পুলিশের দুটি গাড়ি কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বহু নথিপত্রও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলিও পড়ে ছিল সেখানে। এরপর আমরা এমার্জেন্সির গেট দিয়ে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকি। সেখানে যা যা ছিল কার্যত সবই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাচের তৈরি সবকিছু ভেঙে পড়েছিল। দামি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞজাম, ফ্রিজ – সব ভেঙে পড়ে ছিল। এরপর আমরা যাওয়ার চেষ্টা করি সেমিনার হলের দিকে। যে সেমিনার হল থেকে প্রমাণ লোপাট করার উদ্দেশেই এই হামলা চালান হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
সেই সময় হাসপাতালে আর কোনও দুষ্কৃতী ছিল না। তবে, তারা হাসপাতাল চত্বরেই ছিল। পুলিশের সঙ্গে তখনও তাদের সংঘর্ষ চলছিল। এর মধ্যে দুষ্কৃতীরা যে সিঁড়ি বেয়ে সেমিনার হলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সেই সিঁড়ি দিয়েই আমি ও অরিৎ উপরে উঠতে থাকি। উপরে উঠতে গিয়ে দেখি, দ্বিতীয় তলা, অর্থাৎ ফার্স্ট ফ্লোরের দরজা পুরো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেই দরজা শিকল দিয়ে বেঁধে তালা লাগিয়ে সিল করা ছিল। সেই দরজা একেবারে সিল সমেত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় তলের দরজারও অবস্থা তাই ছিল। চতুর্থ তলের দরজার সিল তারা ভাঙতে পারেনি। ভাঙতে না পেরে সেখানে তাণ্ডব চালিয়েছে। পুলিশের সামনেই তারা তাণ্ডব চালিয়েছে। আমরা যখন হাসপাতালের ভিতরে, সেই সময়ও তারা হাসপতালের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। গুণ্ডা বাহিনীর এই স্পর্ধা দেখে সাংবাদিক হিসেবেও অত্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
বুধবারের রাত, আমার দীর্ঘদিন মনে থাকবে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক জায়গাতেই বিপদের মুখে পড়েছি। কিন্তু, পুলিশকে এতটা অসহায় কখনও দেখিনি। গুন্ডাদের এত স্পর্ধাও দেখিনি। তাই ভয় বলুন বা আতঙ্ক, খুবই বেশি ছিল। কখনও কখনও মনে হয়েছে, রাতটা আদৌ কাটবে তো?
আরও খবর পড়তে ডাউনলোড করুন Tv9 বাংলা অ্যাপ (Android/ iOs)