উত্তমকুমার মারা গিয়েছেন, নারায়ণের মূর্তির সামনে গৌরীদেবী, ঘরের দরজা খোলেননি সুপ্রিয়া - Bengali News | This is what niece monami banerjee aka jhimli has said about mahanayak uttam kumar chattopadhyay - 24 Ghanta Bangla News
Home

উত্তমকুমার মারা গিয়েছেন, নারায়ণের মূর্তির সামনে গৌরীদেবী, ঘরের দরজা খোলেননি সুপ্রিয়া – Bengali News | This is what niece monami banerjee aka jhimli has said about mahanayak uttam kumar chattopadhyay

Spread the love

(বাঁ দিক থেকে) সুপ্রিয়া দেবী, মৃত উত্তমকুমার, স্ত্রী গৌরীদেবীর সঙ্গে উত্তমকুমার।

স্নেহা সেনগুপ্ত

ঘটনাটা অনেকেরই জানা। চলছিল ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিং। হাতে রেজ়ার, গাল ভর্তি ফোম, বুকে বিছানো তোয়ালেটা একটা হাত চেপে ধরে শট দিচ্ছিলেন উত্তম। বুকে তখন তীব্র যন্ত্রণা। পরিচালক সলিল দত্ত তাঁকে বিশ্রাম নিতে বলছিলেন বারবার। বলেছিলেন, পরদিন শট নেবেন। কিন্তু মহানায়ক উত্তমকুমার বুঝতে পেরেছিলেন, সেটাই হয়তো স্টুডিয়ো পাড়ায় তাঁর শেষ দিন। তাই অস্ফুটে বলে ফেলেছিলেন, “শট নিয়ে নাও। কাল তো নাও থাকতে পারি।” হলও তাই। পরদিনই তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে গেল। কথাগুলো বলতে-বলতে গলা ধরে এল মহানায়কের ভাইঝি তথা অভিনেতা তরুণকুমারের কন্যা মনামী বন্দ্যোপাধ্যায়ের (ডাকনাম ঝিমলি)। আজ উত্তমকুমারের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ভবানীপুরের বাড়িতে ঠাকুমার (উত্তমের মা) ঘরে বসে সেদিনের কথা টিভি নাইন বাংলা ডিজিটালকে বলে কিছুটা হালকা হলেন ঝিমলিদেবী। প্রথিতযশা শিল্পীদের মাঝে বেড়ে ওঠার স্মৃতি রোমন্থন করলেন তিনি। সেই আলাপচারিতারই বাছাই করা অংশ তুলে ধরা হল এই বিশেষ প্রতিবেদনে।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: আপনার বাল্য স্মৃতি বলতে কী মনে আসে?

ঝিমলিদেবী: আমার বাবা তরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং জ্যাজান (জ্যাঠাকে ওই নামেই ডাকতেন ঝিমলি) অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়–এই দুই তাবড় শিল্পীকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ভবানীপুরের এই বাড়িতেই আমি জন্মেছি। এটা আমার ঠাকুমার ঘর। জন্মানোর পর যখন আমার জ্ঞান হল, বুঝতে পারলাম যে দু’জন শিল্পীর মেয়ে হয়ে আমি জন্মেছি। আমার মা সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়ও অভিনেত্রী। তিনি অভিনয় করতেন স্টার থিয়েটারে। আমার বাবা ছিলেন বিশ্বরূপায়। শুটিংয়ে যেতে দেখেছি তাঁদের। রবিবারে তাঁরা বাড়িতেই থাকতেন। কারণ, সপ্তাহের ওই দিন ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ থাকত। যদি কেউ ভেবে থাকেন আমাদের ফিল্মি পরিবার বলে ছাড় পেতাম, তা হলে ভুল করবেন। আমাদের খুব শাসনে রাখা হত। রক্ষণশীল পরিবার যেমন হয়, সেরকমই বাতাবরণ ছিল। বাবা-মা, এমনকী মহানায়কও ভীষণ কনজ়ার্ভেটিভ ছিলেন।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: সত্যি? পর্দায় মহানায়কের যে রোম্যান্টিক ইমেজ, এ তো দেখছি তার বিপরীত…

ঝিমলিদেবী: একদমই মিল নেই। তাঁরা বাড়ির বাচ্চাদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, আর পাঁচটা বাড়িতে যেমন বাবা-জ্যাঠারা অফিসে চাকরি করেন, তাঁদের কাজটাও সেরকমই। ফারাক একটাই। তাঁদের দুনিয়াবাসী চেনেন।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: বাড়িতে কী সারাক্ষণই সিনেমা নিয়ে আলোচনা হত?

ঝিমলিদেবী: না, একেবারেই হত না। তাঁরা স্টুডিয়োর কথা স্টুডিয়োতেই রেখে আসতেন। এমনও হয়েছে, বাবা-মা ঘরের মধ্যে স্টুডিয়োর কথা আলোচনা করছেন। আমি যেই ঘরে ঢুকেছি। বাবা ওমনি মাকে বললেন, ‘সুব্রতা…’। পলকে মা চুপ করে গেলেন। মানে, আর না। আমার সামনে কোনও কথা না।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: আপনাদের বাড়িতে তো অনেক আর্টিস্টরাই আসতেন সেই সময়কার…

ঝিমলিদেবী: অনেকেই এসেছেন। আমাদের বলা হত, ওই কাকু এসেছেন নমস্কার করো। ওই পিসি এসেছেন নমস্কার করো। আমরা প্রণাম করেই যে যার কাজে চলে যেতাম। আর ওখানে দাঁড়ানোর কোনও সুযোগ পেতাম না।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: উত্তমকুমার নিজে অনেকবার বলেছেন যে তরুণকুমারের অভিনয় প্রতিভাকে তিনি ডরাতেন। মনে করতেন ‘বুড়ো’ (তরুণকুমারের ডাকনাম) সিনে থাকলে গোল দিয়ে চলে যাবেন…

ঝিমলিদেবী: আমার বাবা তরুণকুমারের সঙ্গে পাঠ করলে মহানায়ক সত্যি কনসিয়াস হয়ে যেতেন। কিন্তু বাবার সে সব বালাই ছিল না। বাবা কেবল জেনে নিতেন, কত লেন্স, ওইটুকুই। কিন্তু জ্যাজান ভয় পেতেন। কখন যে বুড়ো কী বলবে, সেই ক্লুটা তিনি ধরতে পারবেন কি না! এটাই ছিল ওঁর মস্ত ভয়। আর বাবা…? ঐতিহাসিক চিত্রনাট্য না হলে, অনেক সময় স্ক্রিপ্ট মুখস্থ না করেই সংলাপ বলে দিতেন।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: দাদার অভিনয় সম্পর্কে কী বলতেন তরুণকুমার?

ঝিমলিদেবী: বাবা কিন্তু অনেক ছবিতেই মহানায়কের অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলতেন, দাদার অভিনয় দেখে তিনিও অনেককিছু শিখেছিলেন। বাকি কথা তো স্টুডিয়োতেই ছেড়ে আসতেন তাঁরা। ওই যে বললাম না, বাড়িতে কিছুই আনতেন না…

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: দাদার মতো অত খ্যাতি পেলেন না, তা নিয়ে তরুণকুমারের কোনও আক্ষেপ ছিল?

ঝিমলিদেবী: আমার বাবা ও জ্যাজান আলাদা-আলাদাভাবেই নিজেদের তৈরি করেছিলেন। ওদের মধ্যে রেষারেষি ছিল না। হিংসা করতেন না কেউ-কাউকে। বাবা পরের দিকে মোটা হয়ে গিয়েছিলেন। মস্করা করে বলতেন, “আমি যদি নিজের চেহারা ধরে রাখতাম, অন্য হিরোদের ভাত মেরে দিতাম।” বাবা নায়ক হতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু তিনি যে সিনেই ঢুকতেন, কাঁপিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসতেন।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: আপনি কেন অভিনয় করলেন না?

ঝিমলিদেবী: আমরা আসলে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলাম না। বাবা কেবলই একটা কথা বলতেন, “তুমি কখনও বড়াই করবে না তোমার বাবা তরুণকুমার, তোমার জ্যাঠা উত্তমকুমার, এই নিয়ে। তোমাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দিলে বলবে।” আমি চিরকাল বাবার সেই আদেশই পালন করে এসেছি। তাই সিনেমায় অভিনয়ও করিনি। বাবা তখন স্ট্রাগলের কথা বলতেন…

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: কেমন ছিল ভাইদের স্ট্রাগল?

ঝিমলিদেবী: অনেক স্ট্রাগল করেছেন আমার বাবা-জ্যাঠারা। আমার ঠাকুরদা তিন ভাইকে কেরোসিনের লাইন দিতে পাঠাতেন। যাদবপুর এইটবি বাসস্ট্যান্ড থেকে মহানায়ক (তবে তখনও তিনি মহানায়ক হয়ে ওঠেননি) চাল কিনে নিয়ে আসতেন। মরা আঁচে পাঁঠার টেংরির জুস পাউরুটি দিয়ে খেয়ে আমরাও সাঁতারে কিংবা টিউশনে ছুটেছি। বাড়িতে কাউকেই দেখিনি টাকাপয়সা নিয়ে আতিশয্য করতে। আমরা খুবই সাধারণ জীবন কাটিয়েছি।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: মহানায়কেরও আতিশয্য ছিল না?

ঝিমলিদেবী: একটা সময়ের পর মহানায়ক বিরাট জায়গায় চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার মধ্যে কোনওদিনও বৈভব আসতে দেখিনি।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: এখন তো ছবি রিলিজ়ের আগে কত প্রচার, কত সাক্ষাৎকার, ওই সময় কেমন ছিল ফ্রাইডে নাইট ফিয়ার?

ঝিমলিদেবী: তখন কিছুই হত না। স্টুডিয়োতে ক্লোজ়ডোর শো হত। ইন্ডাস্ট্রির সকলে গিয়ে ছবিটা দেখতেন। কিছু পরিবর্তন করার হলে এডিট করে রিলিজ় করা হত।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: আপনি ক্লোজ়ডোর শো দেখেছিলেন?

ঝিমলিদেবী: আমার বড় জেঠিমা, মানে গৌরীদেবী (উত্তমকুমারের স্ত্রী) হয়তো আবদার করেছিলেন জ্যাজানের কাছে, তখন দেখতে পেরেছিলাম দু’-একটা শো।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: উত্তমকুমারের ভাইঝি এবং তরুণকুমারের মেয়ে হওয়ার সুবাদে স্কুলে খাতির পেতেন?

ঝিমলিদেবী: আমি মিডলটন রোডের লোরেটো হাউজ়ে পড়েছি। আমাদের স্কুলে বাবা-জ্যাজানকে নিয়ে কোনও উন্মাদনাই ছিল না। এর কারণ, আমার সহপাঠীরাও তেমনই বিরাট বাড়ির মেয়ে ছিলেন। মিহির সেনের মেয়ে আমার ক্লাসমেট ছিলেন। কোকোকলার মালিকের মেয়ে, জব্বর পরিবারের মেয়ে আমার বন্ধু ছিলেন স্কুলে। আমরা স্কুলেও সাধারণভাবেই পড়াশোনা করেছিলাম। সিস্টারদের কড়া নির্দেশ ছিল, কখনও দামী পেন কিংবা দামী কিছু দিয়ে পাঠানো যাবে না…

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: বন্ধুরা পার্টি করতেন?

ঝিমলিদেবী: আমাদের সময় রাতেরবেলায় কোনও পার্টি হত না। বিকেল ৪টে থেকে ৬টা পর্যন্ত টি-পার্টি হত। জ্যাজান-বাবার কোনও অনুমতই মিলত না। কিন্তু মা অ্যালাও করেছিলেন বলে আমি কিছুটা হলেও যেতে পেরেছিলাম।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: জেঠিমা গৌরীদেবীর সঙ্গে আপনার ভাব ছিল?

ঝিমলিদেবী: ভীষণ ভাব ছিল। তিনি আমাকে এবং আমার আর-এক জ্যাঠার মেয়েকে খুব ভালবাসতেন। তিনিই আমাদের শাড়ি পরাতেন। নিজের গয়না খুলে দিতেন আমাদের। তিনি কন্যা সন্তান খুব ভালবাসতেন। মহানায়কও তাই। মেয়ে সন্তান তাঁরও খুব প্রিয় ছিল।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: সুপ্রিয়াদেবীর সঙ্গে মহানায়কের সম্পর্কের কথা সকলেই জানেন, চোখের সামনে আপনি কতখানি দেখেছিলেন?

ঝিমলিদেবী: আমার জন্মানোর পর কিন্তু আমি জ্যাজানকে এই বাড়িতে দেখিনি। দেখতাম তিনি ময়রাস্ট্রিটের বাড়িতে থাকতেন সুপ্রিয়াদেবীর সঙ্গে। তবে আসা-যাওয়া লেগেই থাকত। সুপ্রিয়াদেবীকে আমরা বেণুআন্টি বলে ডাকতাম। ছোটবেলায় তাঁকে চিনেছিলাম বাবা-জ্যাজানের কলিগ হিসেবেই।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: আপনারা যেতেন ময়রাস্ট্রিটের বাড়িতে?

ঝিমলিদেবী: যেতাম তো। সেখানে গেলে তিনি আমাদের খুবই খাতির করতেন। আমরা খুব বেশি কিছু দেখতে পাইনি। আমার কাছে শেষ কথা ছিল, তিনি আমার জ্যাজান-বাবার কলিগ।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: স্বামী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে থাকতেন, তা নিয়ে গৌরীদেবীর মনে কতখানি ক্ষোভ ছিল?

ঝিমলিদেবী: দেখুন, ক্ষোভ তো ছিলই। আজ যদি আমার স্বামী অন্য কারও সঙ্গে থাকেন, আমাকে ডিভোর্স না দিয়ে, আমার ক্ষোভ থাকবে না। সে রকমই ছিল। তা ছাড়া জ্যাজান ভবানীপুরের বাড়িতে রোজই আসতেন। জেঠিমার সঙ্গে উপরের ঘরে দেখাও করতে যেতেন। জেঠিমা নিজেও খুব অসুস্থ ছিলেন। নীচে নামতেন না। আমরা, বাড়ির ছোটরা জানতে পারিনি বন্ধ দরজার ভিতরে জেঠির সঙ্গে জ্যাজান কী নিয়ে কথা বলছেন।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: সুপ্রিয়াদেবীর সঙ্গে কথা বলতেন গৌরী দেবী?

ঝিমলিদেবী: আমাদের বাড়ির শিক্ষার মধ্যে ট্যারা চোখামিটা কোনওকালেই ছিল না। ফলে জেঠিমার সঙ্গে বেণুআন্টির চুলোচুলি হতে দেখিনি। সকলের সামনে যতটুকু দেখেছি, পুরোটা সুসম্পর্ক। ভিতরে-ভিতরে তিনি কতখানি গুমড়ে ছিলেন, টের পাইনি। জ্যাজান চলে যাওয়ার ৯ মাসের মাথায় জেঠিও চলে গিয়েছিলেন। ঠিক আমার বাবা-মায়ের মতো। বাবা মারা যাওয়ার তিন মাসের মধ্য়ে যেমন মা চলে গেলেন।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: মহানায়কের ছেলে গৌতম তো আপনার দাদা, দাদাকে মনে পড়ে?

ঝিমলিদেবী: খুব মনে পড়ে। বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেল। ও তো আমার পাশের বাড়িতেই থাকত। চমৎকার মানুষ ছিল আমার দাদা গৌতম। আমার চেয়ে ১৩ বছরের বড় ছিল। কিন্তু শিশুর মতো ছিল ওর মনটা। আমরা কত আনন্দ করেছি একসঙ্গে। ওকে খুব মিস করি আজও।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: উত্তমকুমারের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল আপনার দাদার?

ঝিমলিদেবী: দাদা জ্যাজানকে ভীষণ ভালবাসত। জেঠিমাকেও তেমনই ভালবাসত। তিনজনের মধ্যে বিভেদ দেখিনি। আসলে ওই যে বলছি না, বাড়ির বাচ্চারা অনেককিছুই টের পায়নি। টের পেতে দেওয়া হত না। বড়রা নিজেদের মধ্যেই সব লুকিয়ে রাখত। দুঃখ-মান-অভিমান, সঅঅঅব।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: সুপ্রিয়াদেবীর মেয়ে সোমার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল আপনাদের?

ঝিমলিদেবী: ভালই ছিল। ওদের বাড়িতে আমরা গিয়েছিলাম। বেণুআন্টি আমাদের খাওয়াত অনেক কিছু রান্না করে।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: ‘মহানায়ক’ সিরিয়ালে দেখানো হয়েছিল গৌরীদেবী নাকি মদ্যপান করতেন। হতাশাগ্রস্ত জীবন কাটাতেন। এটা সত্যি?

ঝিমলিদেবী: দেখুন, মদ্যপানটা তো ঘরে-ঘরে হয়। সে যুগে হত, এ যুগেও হয়। মহানায়ককে নিয়ে যে সিরিয়ালটা তৈরি হয়েছিল, তাতে অনেক ভুল জিনিস দেখানো হয়েছিল। সিরিয়ালটা করাই উচিত হয়নি। অনেকেই আমাদের ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। সবাই ছিঃ ছিঃ করেছিল।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: আর একজন অভিনেত্রী সঙ্গে উত্তমকুমারের নাম জড়িয়েছিল, তিনি সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। তাঁর ‘সত্যি সাবিত্রী’ আত্মজীবনীতে সাবিত্রীদেবী সব কথা স্বীকার করেছেন, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

ঝিমলিদেবী: কেউ তাঁর আত্মজীবনীতে অনেক কথা লিখতেই পারেন। সত্যি-মিথ্যা কে বিচার করবে? ওই যে বললাম, ইন্ডাস্ট্রির কথা ইন্ডাস্ট্রিতেই রেখে আসতেন উত্তমকুমার।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: উত্তমকুমারের মৃত্যুর দিনে জনজোয়ার দেখেছিল কল্লোলিনী…আজ তাঁর ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী, সেই দিনটার কথা মনে আছে?

ঝিমলিদেবী: ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র শুটিং করছিলেন মহানায়ক। শেষ দৃশ্য। বুকে ব্যথা নিয়ে শট দিয়েছিলেন। পরিচালকের নিষেধ শোনেননি। বলেছিলেন, “শট নিয়ে নাও। কাল যদি না থাকি।” জ্যাজান যে ওই কথাটা কীভাবে বললেন, ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। সেদিনই নাক-মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরছিল মহানায়কের। ডঃ সুনীল সেন তাঁকে ভর্তি করান বেলভিউতে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জ্যাজান আর থাকবেন না। তাই আমার ঠাকুমাকে বলেছিলেন, একবারটি গিয়ে দেখে আসতে। ছেলের অসুস্থতার কথা জানতে পেরে আমার ঠাকুমা (চপলা চট্টোপাধ্যায় – উত্তমকুমারের মা) ছুট্টে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। গিয়ে দেখেন পেট ফুলে আছে ছেলের। নাকের কাছে জমাট বেঁধে আছে রক্ত। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। হাসপাতাল থেকে ছেলেকে ওভাবে দেখে বাড়িতে পা রেখেই সোজা চলে গেলেন ঠাকুরঘরে। বিকেলবেলায় হাসপাতালে একে-একে গেলেন বাড়ির বাকিরা।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: সেদিন আপনার বাবা কোথায় ছিলেন?

ঝিমলিদেবী: সে সময় ‘নহবৎ’ নাটকে তুমুল ব্যস্ত বাবা। দাদাকে ওভাবে দেখে তিনিও দ্বিধাগ্রস্ত। ঠিক করতে পারছেন না পাঠ করতে যাবেন কি না। নাকেমুখে নল নিয়ে মৃত্যু পথযাত্রী জ্যাজানই বাবাকে বলেছিলেন, “আজ শো কামাই করবি না কোনও কারণেই। কত লোক বসে আছেন তোর অভিনয় দেখার জন্য। সবাই টিকিট কেটে এসেছেন। তুই যা। ৮টায় সিন শেষ হলেই চলে আসবি।” তারপর ০৮.১০শে বাবার সিন শেষ হয়। হাসপাতালে গিয়ে বাবা দেখেন জ্যাজানের কৃত্রিম হার্ট পাম্প হচ্ছে। তারপরই সব শেষ।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: বাড়িতে কে জানালেন ঠাকুমাকে?

ঝিমলিদেবী: কথাগুলো বলতে-বলতে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। আমার মা দোতলার ঘরে। নীচের ঘরে চিত্রহার চলছে। ক্ষীণ সুর ভেসে আসছে আমার কানে। শো শেষ হল আর তখনই ল্যান্ডলাইনটা বেজে উঠল। রিসিভার তোলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শুনতে পেলাম মায়ের আর্তনাদ–নাআআআআআআআআআ।” ছোট-বউমার আর্তনাদ শুনে আমার ঠাকুমাও বিচলিত। তিনি তখনও কানে অল্প বিস্তর শুনতে পান। ‘কী হয়েছে, কী হয়েছে’ বলতে-বলতে ছুট্টে গেল বাড়ির কাজের মেয়ে। মা বললেন, ঠাকুমাকে যেন কিছুই না জানানো হয়। আমরা সবাই চুপ। যে যার ঘরে গুমড়ে কাঁদছি।”

টিভি নাইন বাংলা: সেই সময় গৌরীদেবী কথায় ছিলেন?

ঝিমলিদেবী: মহানায়কের সঙ্কটজনক অবস্থার খবর পেয়ে আগেই হাসপাতালে ছুট্টে গিয়েছিলেন বড় জেঠিমা (গৌরীদেবী)। দাঁড়িয়েছিলেন বিরাট একটি নারায়ণের মূর্তির সামনে। দাদা আর বাবা আগেই চলে গিয়েছিলেন। জেঠিরই পৌঁছতে দেরি হয়েছিল। দেখলেন, মহানায়কের অসাড় দেহ নিয়ে নীচে নেমে আসছেন দেওর ও পুত্র।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: এরপর কী হল?

ঝিমলিদেবী: জ্যাজানের দেহ কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে এলেন বাবা। বাড়ি ঢুকতেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ঠাম্মা জানে? জানাতে হবে তো…।” ঠাকুমাকে জানাতেই তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন। অভিনেতা-অর্থোপেডিক ডাঃ শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় ঠাকুমাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে গেলেন।

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: তারপর…

ঝিমলিদেবী: ঠাকুমা সেদিন এক সাধুবাবার কথা বারবার আওড়েছিলেন। তাঁর বাবার এক বন্ধু সন্ন্যাসী হয়ে চলে গিয়েছিলেন হিমালয়ে। জ্যাজানের জন্মের পর তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। ঠাকুমাকে তিনি বলেছিলেন, “ছেলেটার কপালটা দেখেছিস চোপু। ওর জগৎ জোড়া নাম হবে। তুই ওকে ধরে রাখতে পারবি না।” জ্যাজানের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঠাকুমা বারবার আওড়াচ্ছিলেন, “আমার নাড়িটা দলা পাকিয়ে মুখে দিয়ে বেরিয়ে আসছে…”

টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল: সুপ্রিয়াদেবী এসেছিলেন? মহানায়িকা সুচিত্রা সেন?

ঝিমলিদেবী: জ্যাজানের মৃত্যুর পর সুপ্রিয়াদেবী আমাদের বাড়িতে আসেননি। জ্যাজানের মৃতদেহ সারারাত বাড়িতেই ছিল। পরদিন টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে তিনি গিয়েছিলেন। তবে হ্যাঁ, আমার খুব ভাল করে মনে আছে, রাত দুটোর সময় ফুলের মালা নিয়ে এসেছিলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *