Motorcycle Ride: মোটরসাইকেল ডায়েরিজ: পর্ব ৪৬–ফুলের উপত্যকার মাঝে ঘুরে দেখুন হেমকুণ্ড সাহিব – Bengali News | How To Explore Valley of Flowers and Gurdwara Hemkund Sahib of uttarakhand
রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা থাকার কারণে ঘুম হয়নি বললেই চলে, রাতে এপাশ ওপাশ করার ফলে কম্বলের বাইরে যেটুকু অংশ বেরিয়ে যায় সেটুকুই ঠান্ডায় সেন্সলেস হয়ে যাওয়া জোগার। কোনও মতে ঘাপটি মেরে শুয়ে থেকে অপেক্ষা করা ভোরবেলার। সকাল হতেই ছাতুর জল খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম চন্দ্রশিলার উদ্দেশ্যে। তুঙ্গনাথ মন্দির থেকে চন্দ্রশিলার দূরত্ব আড়াই কিলোমিটার। ভোরবেলা বেড়ানোর কারণগুলির মধ্যে একটি চন্দ্রশিলা থেকে সূর্যোদয় দেখা। আরেকটি কারণ হল এই সময় নানা ধরনের পশু এবং পাখি দেখা যায়। রাস্তাটি বেশ সরু এবং পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে ওঠা। একপাশে খাড়াই ঢাল অন্যপাশে পাহাড়ের চূড়া। ক্রমে উপরে ওঠা এবং প্রকৃতির সেই রূপ দর্শন করা। প্রকৃতির এই রূপ না দেখলে ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। একদিকে পাহাড় থেকে লাল আলোর আভায় বেরিয়ে আসছে সূর্য আর অন্য পাশে পাহাড়ে ঢেকে থাকা সাদা মেঘ সরে গিয়ে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চূড়া।

এরপর এখানে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে চলে আসলাম হোটেলে, সেখানে ব্রেকফাস্ট করে জিনিসপত্র নিয়ে আবার ৭ কিলোমিটার হেঁটে নিচে নেমে আসলাম। এরপর বাইকে লাগেজপত্র বেঁধে বেরিয়ে পড়লাম আজকের দিনের প্রথম গন্তব্য স্থান কল্পেশ্বর মন্দিরের উদ্দেশ্যে। রাতে বৃষ্টি হওয়ার কারণে বাইকের অবস্থা একটু খারাপই ছিল। বাইকের হাওয়া, ক্লাচ, ব্রেক আরও দরকারী জিনিসপত্র ঠিকঠাক আছে নাকি তা দেখে বাইক স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম প্রথমে গোপেশ্বর মন্দিরের উদ্দেশে। গোপীনাথ বাবাকে দর্শন করে বেরিয়ে পড়লাম শ্রী গরুর মন্দিরের উদ্দেশে। এখান থেকে শ্রী গরুর মন্দিরের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে আপনার দু’ঘণ্টা সময় লেগে যাবে তার কারণ পাহাড়ি রাস্তা এবং শহরের যানজট। এখানে জনবসতির ঘনত্ব খুবই বেশি। শ্রী গরুর মন্দির থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার যাওয়ার পর আপনি দেখতে পারবেন বাদিকে একটা রাস্তা চলে গেছে যেটির নাম হেলাঙ্গ-উর্গম রোড ধরে অলকানন্দা নদী ক্রস করে প্রায় ১৫ কিলোমিটারের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা অতিক্রম করে পৌঁছে যাবেন কল্পেশ্বর মন্দিরে।

পঞ্চকেদারের আরেকটি হল এই কল্পেশ্বর মন্দির। রাস্তাটির কাজ হওয়ার দরুন রাস্তাটি প্রচণ্ড খারাপ ছিল। এই ১৫ কিলোমিটার রাস্তা যেতে এক ঘন্টার বেশি সময় লেগে যায় শুধুমাত্র রাস্তা খারাপ হওয়ার কারণ এ, তবে কাজ চলছে আশা করি কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। এরপর কিছু কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত যোশিমঠ। যোশিমঠ থেকে দুটি খুব সুন্দর জায়গা দু’দিকে ভাগ হয়ে গেছে। একটির নাম আউলি হিল স্টেশন এবং অন্যটি চনাপ ভ্যালি ট্রেক। দুদিকে দুটি ভ্যালির সৌন্দর্য দু’রকম। সময় কম থাকার জন্য এই দুটো জায়গা না ঘুরে সোজা পৌঁছে গেলাম গোবিন্দঘাটে। এখানে পৌঁছেই প্রথমে গুরুদ্বারে নাম এন্ট্রি করে লাগেজপত্র রেখে স্নান করে ফ্রি হয়ে নিলাম। এখানে গুরুদ্বারে আলাদা করে রুম নিলে আপনাকে দিতে হবে ১১০০ টাকা এবং কমনরুমে থাকলে আপনার কোনও টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই আপনার সাধ্য মতন ডোনেশন দিলেই হবে।

গুরুদ্বারে থাকার দরুন আমার থাকা এবং খাওয়া দুটোই প্রায় ফ্রি বললেই চলে। গুরুদ্বারের পাশ থেকে বয়ে যাচ্ছে অলকানন্দা নদী, তার ঠিক উপরেই একটি লোহার ঝুলন্ত সেতু। এই সেতু উপরে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ। দু’পাশে উচু উঁচু পাহাড় এবং মাঝখানে বয়ে চলা নদীর অবিরাম শব্দ এবং তার সুন্দর্য দেখে কখন যে অনেকটা সময় কেটে গেল তা বোঝা গেল না। রাতে আটটার মধ্যে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম পরের দিনের গন্তব্য স্থান ঘাঙ্গরিয়া।

সকালে মাথাপিছু ৫০ টাকার বিনিময়ে এখানকার গাড়ি আপনাকে ছেড়ে আসবে ঘাঙ্গরিয়া যাওয়ার চেকপোস্ট পর্যন্ত তারপর হেঁটেই আপনাকে পৌঁছাতে হবে এই স্থানে। এখানের চেকপোষ্টে আপনার এন্ট্রি করার পর প্রায় ১০ কিলোমিটার হেঁটে আপনি পৌঁছে যাবেন ঘাঙ্গরিয়া। এছাড়াও এখানে যাওয়ার আরেকটি উপায় হলো খচ্চর। তবে আমার মতে খচ্চরের থেকে পায়ে হেঁটে যাওয়াই ভাল। তার কারণ প্রকৃতির নানা সৌন্দর্য ফুল, গাছপালা, নদী, ঝর্ণার মধ্য দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা অবশ্যই অসাধারণ। কিছু ফুল এবং পশুর ছবি রইল যা আমি হাঁটার পথেই দেখেছিলাম।

এরপর ঘাঙ্গরিয়া হেলিপ্যাড এবং ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড ক্রস করে পৌঁছে গেলাম আজকের দিনের গন্তব্যস্থান ঘাঙ্গরিয়া গুরুদ্বার সাহেব শ্রীগোবিন্দ ধামে। এখানের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বেশ কম। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেই প্রচণ্ড ঠান্ডায় বাইরে থাকতে না পেরে গুরুদ্বারর ঘরেই প্রবেশ করলাম। বাকিটার সময় অন্যান্যদের সাথে কথা বলে সময় কাটালাম। পরের দিনের গন্তব্যস্থান ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার। পরের দিন তাড়াতাড়ি ওঠার কোন দরকার নেই তার কারণ এই ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার এর প্রবেশপথ সকাল দশটা থেকে খোলা হয়। তাই সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠে পাশের একটি হোটেলে সকালের খাবার খেয়ে দশটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার এর চেকপোস্ট এ। এটি একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হওয়ার কারণে আপনাকে বিকেল পাঁচটার মধ্যে ফিরতেই হবে। এর ভিতরে কোনও দোকানপাট নেই আপনাকে ব্যাগ ভর্তি করে জল এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে যেতে হবে।

কোথাও যদি স্বর্গ থেকে থাকে তবে হয়তো এখান থেকেই শুরু হয়েছে। সকাল দশটার মধ্যেই ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারসের উদ্দেশে রওনা দেবেন তার কারণ হাতে সময়ে না নিয়ে গেলে এই বিস্তীর্ণ ৬ থেকে ৮ কিলোমিটার ভ্যালিকে উপভোগ করতে পারবেন না। যতই ভেতরে প্রবেশ করবেন ততই নতুন কিছু আপনার চোখে পড়বে পাহাড় ফুল নদী আর নতুন ধরনের গাছের আকৃতি। যত দূরেই যান না কেন মনে রাখবেন দুপুর একটা থেকে দুটোর মধ্যে আপনাকে ফিরে আসা দরকার। সন্ধের সময় আবারও ফিরে আসলাম গুরুদ্বারতে।
………… উত্তরাখন্ড ডায়েরি পরবর্তী অংশ রয়েছে আগামী পর্বে।