Motorcycle Ride: মোটরসাইকেল ডায়েরিজ: পর্ব ৩৮–দারিংবাদিকে ‘ওড়িশার কাশ্মীর’ কেন বলা হয়? – Bengali News | How to explore odisha’s kashmir daringbadi by bike
চলুন, মোটরসাইকেল ডায়েরিজ়-এর আজকের পর্বে আমরা ঘুরে আসি ভূস্বর্গের উদ্দেশ্যে। আমার বহুবার লাদাখযাত্রায় শুধুমাত্র ভূস্বর্গ কে সেভাবে আবিষ্কার করা হয়নি। শুধুমাত্র কাশ্মীরের জন্য আমি একটি আলাদা পর্ব লিখব, যেখানে থাকবে শুধুমাত্র কাশ্মীরের খুঁটিনাটি। আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু ভূস্বর্গের সন্ধান দিয়েছি গত পর্বগুলিতে। আজ চলুন, আমাদের প্রতিবেশি রাজ্য ওড়িশার ভূস্বর্গ নিয়ে আলোচনা করি। হ্যাঁ, দারিংবাদিকে ‘ওড়িশার কাশ্মীর’ বলা হয়। এই ট্রিপের প্রথম থেকেই আমার মনে একটা জিজ্ঞাসা ছিল: এটিকে কাশ্মীর বলার কারণ কি? হ্যাঁ, গিয়ে উপভোগ করলাম। সত্যিই এটিকে কাশ্মীর বলা যায়। তার কারণ সবুজ পাহাড়ের মাঝে উপত্যকা, নদীঝর্ণা এবং ভূস্বর্গের মতো শান্ত পরিবেশ। জঙ্গল, পশুপাখি… এরই সঙ্গে রয়েছে নীল আকাশের নীচে ফুলের বাগিচা। আর বরফ! সেটা নিয়ে একটু বিতর্ক আছে। এখানকার আঞ্চলিক লোকেরা বলেন, যে কোনও এক বছর ডিসেম্বরের শেষের সপ্তাহে শিশির জমে এলাকা সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায়। এবং সেটি বরফের আকার ধারণ করে। এই অবস্থা না-হওয়ারও কিছু নেই; গরমের সময় এই এলাকায় বেশ ঠান্ডা থাকে। দারিংবাদিকে ‘ওড়িশার কাশ্মীর’ বলার আরও একটা কারণ, সেখানে শীতকালে তাপমাত্রা শূন্যের নীচে নেমে যায়। এটি আসলে ঘাসের তুষারপাত এবং শিশির, যা বরফ হয়ে যায় এবং তুষার হলে একটি ছাপ রেখে যায়। তবুও, এর গভীর পাইন বন, সবুজ উপত্যকা, সবুজ পাহাড় এবং চোখ ধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে, এই উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলটি অবশ্যই এর পরিচ্ছন্নতা ও স্বচ্ছতাকে সমর্থন করে। এখানকার হোটেলে পাখা বা এসি আপনি পাবেন না। এখানে যাওয়ার আদর্শ সময়ে ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি। আমি যদিও গিয়েছিলাম বেশ কিছু বছর আগে। তাই হোটেল স্টে-র ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়। পিক সিজ়নে গেলে আগে থেকে বুকিং করে যাবেন। তবে এখন আগের থেকে বেশি হোটেল এবং হোম-স্টের ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও রইল ওড়িশার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্পটের ঠিকানা, যা আপনি বাইক অথবা চারচাকা না-থাকলে যেতে পারবেন না।

ওড়িশা একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান। ভ্রমণকারীরা সর্বদা রাজ্যটিকে সমুদ্র সৈকত এবং অলঙ্কৃত মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে আমি মনে করি যে, এই রাজ্যের আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে। এছাড়াও রয়েছে ওড়িশার একটি ছোট গ্রাম: রঘুরাজপুর নবগ্রাম। সেখানে আমি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ধ্বংসাবশেষ দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। এবারও, ওড়িশার কাশ্মীর ভ্রমণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং দুঃসাহসিকতার নিখুঁত মিশেলে একটি দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল এবারের পর্ব। কারণ এখানেই আমাদের ছোট্ট এই বাইক টিম সম্মুখীন হয় দুর্ঘটনার। দারিংবাদি ওডিশার একটি নয়নাভিরাম পাহাড়ি স্থান। ওড়িশার কান্ধমাল জেলায় ৩০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই জায়গাটি কলকাতা থেকে আদর্শ সপ্তাহান্তের ছুটির ঠিকানা হতে পারে। এছাড়াও এই হিল স্টেশনটির নামকরণ করা হয়েছিল দেরিং নামে এক ব্রিটিশ অফিসারের নামে।

তাহলে চলুন, আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়ি দারিংবাদির উদ্দেশ্যে। কলকাতা থেকে দারিংবাদির দূরত্ব আনুমানিক ৭০০ কিলোমিটার। দারিংবাদি যাওয়ার দু’টি রাস্তা আছে; একটি NH6 হয়ে ভুবেনশ্বর, চিল্কা পেরিয়ে ডানদিকে সোজা অসিকা হয়ে দারিংবাদি। অন্যটি হল খড়্গপুর, লোধাসুলি, বাঙ্গৃপসি, AH46 হয়ে দেওঘর থেকে বাঁ দিক নিয়ে বাউধগড় হয়ে দারিংবাদি। যাওয়ার সময় আমি প্রথমের রাস্তাটি নিয়েছিলাম এবং ফেরার সময় দেওঘরের রাস্তাটি। এর ফলে পুরো রাস্তাই কভার হয়ে যায়, প্রথম রাস্তার তুলনায় দ্বিতীয় রাস্তাটি বেশ সুন্দর।

প্রথম দিনের গন্তব্য স্থান ছিল ভিতার্কানিকা ন্যাশনাল পার্কে এবং গোটা একটা দিন এখানেই কাটানো। এই জায়গাটি ওড়িশার ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও রয়েছে ছোট-ছোট দ্বীপে বোটে করে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা। এখানে আপনাকে সম্পূর্ণ একটা দিন কাটাতেই হবে, তার কারণ এখানে রয়েছে জঙ্গল সাফারি এবং সুন্দরবনের মতো নানা ধরনের গাছ এবং ম্যানগ্রোভ, কুমির প্রকল্প। এছাড়াও রয়েছে বন্য পশুপাখি সংরক্ষণের ব্যবস্থা, যাদের আপনি খুব কাছ থেকে দেখতে পাবেন। কলকাতা থেকে এর দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটার। তাই সকাল-সকাল কলকাতাকে গুডবাই করে NH6 ধরে জলেশ্বর এবং বালাসোর হয়ে দুপুরের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ভদ্রক। ভদ্রক থেকে বাঁ দিক নিয়ে সোজা চলে যাবেন রাজকানিকা, এখান থেকে আবার বাঁ দিক নিয়ে জয়ানগর জেটি পেরিয়ে চলে যান ভিতার্কানিকা ন্যাশনাল পার্কে।

থাকার জন্য এখানে আপনি পেয়ে যাবেন ফরেস্ট গেস্ট হাউস, যা আপনি ওড়িশা ট্যুরিজম থেকে বুক করতে পারেন। এখানে দেখার জন্য রয়েছে ভিতার্কানিকা ক্রোকোডাইল ফার্ম, ম্যানগ্রোভ জঙ্গল, হেন্তাল ফরেস্ট। এছাড়াও রয়েছে সুন্দর একটা এককাকুলা বিচ। এখানে একদিন থেকে পরের দিন সকালে বেরিয়ে পড়ুন দারিংবাদির উদ্দেশ্যে, যা এখান থেকে প্রায় ৪১০ কিলোমিটারের দূরত্ব। রাস্তায় আপনার পড়বে একটি সুন্দর বিচ, যার নাম পেন্থা সি বিচ। এই বিচ-এর সূর্যোদয়ের প্রাকৃতিক বৈচিত্র খুবই অসাধারণ। এটি ঘোরা শেষ করে আপনি বেরিয়ে পড়ুন কটক হয়ে চিলিকা লেক। এই লেকটির প্রাকৃতিক বৈচিত্র খুবই সুন্দর। চিলকা লেক পেরিয়ে ডানদিকে নিয়ে চলে যান সুরাদা ঘাই ড্যাম-এ। সুন্দর এই ড্যামটিতে সময় কাটিয়ে চলে যান ঘাঁটি ঝর্ণা। এই ঝর্ণাটির পরেই দারিংবাদি পৌঁছনোর সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা: দু’টি পাহাড়ের মাঝখানে আঁকাবাঁকা কালো পিচ রাস্তা। এই রাস্তাটির বাইক চালানোর অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ। আর এখানেই ঘটে যায় আমাদের একটি বিপদ। আঁকাবাঁকা রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ছোট-ছোট নুড়ি পাথরে আমাদের একটি বাইকের সামনের চাকাটি পিছলে যায়। গতি একটু বেশি থাকার কারণে ব্যালান্স হারিয়ে ফলে ডিভাইডারের ধাক্কা মারে সেটি। গাড়ি ও তার হেলমেট এবং হাতের গার্ড-এ প্রচুর ক্ষতি হয়। পরে কোনওক্রমে টোটো করে দারিংবাদিতে নিয়ে আসা হয় এবং সার্ভিসিং করে মোটামুটি কাজ চালানোর মতো হালে ফেরানো হয় বাইকটি।

দুর্ঘটনার জেরে আমরা দারিংবাদিতে পৌঁছই বিকেল পেরিয়ে। পিক সিজ়ন হওয়ার দরুণ হোটেল খুঁজতে একটু বেশিই বেগ পেতে হল। একবার ঠিকই করে ফেললাম যে, এখানকার কোনও পেট্রল পাম্পেই টেন্ট খাটিয়ে থাকব। পরে সেই পেট্রল পাম্পেরই মালিকের বাড়িতে তারই অনুরোধে আমরা থেকে গেলাম। এখন আগের থেকে বেশি হোটেল এবং হোম-স্টে হচ্ছে; তা-ও আমার মনে হয় আগে থেকে বুকিং করে নেওয়া ভাল।
দারিংবাদি, ‘কাশ্মীর অফ ওড়িশা’র পরবর্তী অংশ রয়েছে আগামী সপ্তাহে…