আন্দামান থেকে কচ্ছ, উষ্ণ সমুদ্রে বিপন্ন ভারতের চার প্রবালপ্রাচীর

কলকাতা: সমুদ্রের জল ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। বাড়ছে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের তীব্রতাও। এর জেরে আগামী ৫০ বছরে ভারতের চারটি প্রধান প্রবালপ্রাচীর (Coral Reefs) অঞ্চল ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়তে পারে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লাক্ষাদ্বীপ, মান্নার উপসাগর এবং কচ্ছ উপসাগরের প্রবালপ্রাচীরগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে এমনই সতর্কবার্তা দিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল। কলকাতার জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ZSI)-এর বিজ্ঞানীরাও এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN)-র Red List of Ecosystems-এর অধীনে প্রবালপ্রাচীর নিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী এই মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে রাষ্ট্রসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন COP17-এ প্রকাশিত হয়েছে রিপোর্টটি। গবেষকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অধিকাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র আগামী কয়েক দশকে চরম বিপদের শ্রেণিতে চলে যাবে।
বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্র বিপদের মুখে
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বজুড়ে মূল্যায়ন করা প্রবালপ্রাচীর বাস্তুতন্ত্রের ৯৬ শতাংশই ভবিষ্যতের সমুদ্র উষ্ণায়ন এবং সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের প্রভাব বিবেচনায় নিলে ‘Critically Endangered’ বা মহাবিপন্ন শ্রেণিতে পৌঁছতে পারে। এই বাস্তুতন্ত্রগুলি বিশ্বের মূল্যায়ন করা মোট প্রবালপ্রাচীর এলাকার ৯৯.৮ শতাংশ জুড়ে রয়েছে।
IUCN-এর প্রচলিত Red List-এ মূলত পৃথক প্রজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। অন্যদিকে, Red List of Ecosystems-এ কোনও সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিচার করা হয়। ফলে এই মূল্যায়ন প্রবালপ্রাচীরের ভবিষ্যৎ বিপদ সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ছবি তুলে ধরেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মিলিয়ে মোট ১৩টি প্রবালপ্রাচীর ইকোরিজিয়ন রয়েছে। প্রায় ৮,২৮২.৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রবালপ্রাচীরগুলি বিশ্বের মোট প্রবালপ্রাচীর এলাকার প্রায় ৪ শতাংশ। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে আগামী ৫০ বছরে এই ১৩টি অঞ্চলই ‘Critically Endangered’ শ্রেণিতে পৌঁছতে পারে।
ভারতের চারটি প্রধান প্রবালপ্রাচীরেও বিপদের আশঙ্কা
গবেষণায় ভারতের প্রবালপ্রাচীরগুলির পরিস্থিতি আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লাক্ষাদ্বীপ এবং কচ্ছ উপসাগরের প্রবালপ্রাচীরগুলি আগে ‘Vulnerable’ বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে ছিল। ভবিষ্যতের সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের প্রভাব যুক্ত করলে এগুলি ‘Critically Endangered’ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
অন্যদিকে, মান্নার উপসাগর এবং পক প্রণালীর প্রবালপ্রাচীরগুলি আগে থেকেই ‘Endangered’ বা বিপন্ন শ্রেণিতে রয়েছে। সেগুলির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং চাগোস দ্বীপপুঞ্জের ১৩টি ইকোরিজিয়নের মধ্যে আগে সাতটি ছিল ‘Vulnerable’, চারটি ‘Endangered’ এবং দু’টি ‘Critically Endangered’ শ্রেণিতে। কিন্তু ভবিষ্যতের সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পর সবক’টিই সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে চলে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ZSI-এর বিজ্ঞানীদের
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মূল্যায়নে ZSI-এর চার বিজ্ঞানী ডক্টর সি রঘুনাথন, ডক্টর তমাল মণ্ডল, ডক্টর জে এস যোগেশ কুমার এবং ডক্টর চন্দন রেথিনারাজ সহ-লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রবালের শ্রেণিবিন্যাস, সমুদ্রের তলায় সরেজমিন সমীক্ষা, প্রবালপ্রাচীরের মানচিত্র তৈরি এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে তাঁদের দীর্ঘদিনের গবেষণার অভিজ্ঞতা এই মূল্যায়নে কাজে লেগেছে।
গবেষণায় ব্যবহৃত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলির ক্ষেত্রেও ভারতের অবদান সবচেয়ে বেশি। Criterion A-এর অধীনে মূল্যায়ন করা মোট ৩৫০টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ১৬২টি, অর্থাৎ ৪৬.৩ শতাংশই ভারতের প্রবালপ্রাচীর অঞ্চলে অবস্থিত।
প্রবাল সাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
গবেষকদের চিহ্নিত প্রধান বিপদগুলির মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ এবং ব্যাপক প্রবাল বিবর্ণ হয়ে যাওয়া বা Coral Bleaching। ১৯৯৮ ও ২০১৬ সালের প্রবাল বিবর্ণ হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে এই বাস্তুতন্ত্র কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়াও উপকূলবর্তী নির্মাণকাজ, ড্রেজিং, সমুদ্রে পলি জমা, স্থলভাগ থেকে দূষণ, সামুদ্রিক বর্জ্য এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার মতো বিষয় প্রবালপ্রাচীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। তাপমাত্রাজনিত চাপের পর প্রবালগুলি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে না পারলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
প্রবালপ্রাচীর শুধু সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, উপকূলবর্তী মানুষের জীবিকা এবং অর্থনীতির সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি হলে পরিবেশের পাশাপাশি মৎস্যজীবী ও উপকূলীয় জনজীবনও প্রভাবিত হতে পারে।
সংরক্ষণে প্রয়োজন স্থানীয় উদ্যোগ, কমাতে হবে কার্বন নিঃসরণও
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমুদ্রের জলের গুণমান উন্নত করা, উপকূলীয় এলাকায় নির্মাণ ও ব্যবহারের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রবালপ্রাচীর পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। তবে তাঁদের মতে, শুধু স্থানীয় স্তরে সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ নিয়ে এই বিপদের মোকাবিলা সম্ভব নয়।
প্রবালপ্রাচীরের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কতটা কমানো যাচ্ছে তার উপর। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। তাই প্রবালপ্রাচীর বাঁচাতে স্থানীয় সংরক্ষণের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
The latest news from Kolkata, including traffic updates, civic issues, weather, accidents, administrative decisions, and other important information for daily life, is published in this section. Stay tuned regularly to keep up with all the latest updates from the city.