ডিম্বাকার প্রতিকৃতি: অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা বাংলা অনুবাদ গল্প
মূল গল্প: দ্য ওভাল পোর্ট্রেট | লেখক: এডগার অ্যালান পো
ভাষান্তর: অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়
আমাকে গুরুতর আহত অবস্থায় খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাতে না দিয়ে আমার বিশ্বস্ত ভৃত্য—যে দুর্গ-প্রাসাদটিতে জোর করে প্রবেশের সাহস দেখিয়েছিল—আমাকে সেখানে আশ্রয় দিলো। সেটি ছিল অ্যাপেনাইন পর্বতমালার বুকে ছড়িয়ে থাকা সেই সব প্রাসাদেরই একটি, যেখানে বিষণ্ণতার গাঢ় ছায়া আর রাজকীয় মহিমা একাকার হয়ে আছে।
কেবল বাস্তবেই নয়, মিসেস র্যাডক্লিফের কল্পলোকেও এমন প্রাসাদ বারবার ভেসে উঠেছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, অল্প কিছুদিন আগেই সাময়িক ভাবে পরিত্যক্ত হয়েছে এটি। সেখানেই আমরা সবচেয়ে ছোট, তুলনামূলক ভাবে কম আড়ম্বরের একটি কামরায় আশ্রয় নিলাম। এটি ছিল ভবনের একটি নির্জন কোণের মিনারে। তার সাজসজ্জা ছিল রাজকীয়, যদিও জরাজীর্ণ ও প্রাচীন। দেয়ালজুড়ে ঝুলে থাকা সুদৃশ্য কারুকার্যময় পর্দাগুলো আবার নানান আকৃতি ও নকশার অসংখ্য বংশীয় প্রতীকচিহ্ন ও যুদ্ধস্মারকে সজ্জিত। এর পাশে বিপুল সংখ্যায়, অস্বাভাবিক প্রাণবন্ত আধুনিক সব চিত্রকর্ম সমৃদ্ধ সোনালি আরাবেস্ক— অর্থাৎ লতাপাতার— সূক্ষ্ম নকশাখচিত ফ্রেমে ঝুলছিল।
চিত্রগুলো কেবল দেয়ালের সমতল অংশেই নয়, প্রাসাদের বিচিত্র স্থাপত্যের কারণে তৈরি হওয়া অসংখ্য কুলুঙ্গি ও কোণেও ঝুলছিল। হয়তো আমার সদ্য শুরু হওয়া প্রলাপগ্রস্ত অবস্থাই আমাকে সেগুলোর প্রতি এমন গভীর আকর্ষণে আবিষ্ট রেখেছিল।
আমি পেদ্রোকে বললাম, ঘরের ভারী জানালার পাল্লাগুলো বন্ধ করে দিতে—কেননা তখন ইতিমধ্যেই রাত নেমে এসেছে— আর আমার শয্যার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু বাতিদানের সব মোমবাতি জ্বালাতে। আমার শয্যাকে ঘিরে থাকা কালো মখমলের ঝালর-দেওয়া ভারী পর্দাগুলোও সম্পূর্ণ খুলে দিতে। যেহেতু রাত হয়েছিল, আমি ঘুমোতে চাইছিলাম না। বরং পালা করে ছবিগুলোর দিকে তাকাতে এবং বালিশের পাশে রাখা একটি ছোট বই পড়তে চাইলাম— যেখানে
সেই চিত্রগুলোর বর্ণনা ও সমালোচনা লেখা ছিল।
অনেকক্ষণ ধরে আমি বইটি পড়লাম, আর একাগ্র বিস্ময়ে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। সময় যেন ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছিল। কখন গভীর মধ্যরাত নেমে এল, টেরই পেলাম না।
বাতিদানটির অবস্থান আদৌ আমার মনঃপূত হয়নি। হাতের নাগালে সহজে আসছিল না। ঘুমন্ত পেদ্রোকে না জাগিয়ে কষ্ট করেই হাত বাড়িয়ে সেটিকে আর একটু সরিয়ে এমন ভাবে রাখলাম, যাতে বইয়ের ওপর আরও ভালো ভাবে আলোটা এসে পড়ে।
কিন্তু এই সামান্য কাজটির ফল হলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। বহু মোমবাতির আলো এ বার ঘরের একটি ছোট কুলুঙ্গির ভেতরে গিয়ে পড়ল— যে জায়গাটি এতক্ষণ পর্যন্ত খাটের খুঁটির আড়ালে গভীর অন্ধকারে ঢাকা ছিল। আর তখনই প্রথম আমার চোখে পড়ল একটি ছবি— যা এতক্ষণ নজরেই পড়েনি।
সেটি ছিল এক তরুণীর প্রতিকৃতি—কৈশোর পেরিয়ে সদ্য যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো এক রমণীর মুখ।
আমি এক ঝলক ছবিটির দিকে তাকিয়েই যেন চমকে উঠলাম। পরক্ষণেই চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কেন এমন করলাম, প্রথমে নিজেও উপলব্ধি করতে পারিনি।
কিন্তু চোখ বুজে থাকতেই নিজের আচরণের কারণ খুঁজতে লাগলাম।
চিন্তা করার অবকাশটুকু লাভের জন্য এ ছিল এক হঠাৎ প্রয়াস— এটা নিশ্চিত হওয়া যে, আমার দৃষ্টি আমাকে প্রতারিত করেনি, এবং আমার কল্পনাকে শান্ত ও সংযত করে যাতে আরও স্থির, আরও নিশ্চিত দৃষ্টিতে তাকাতে পারি।
কয়েক মুহূর্ত পর পুনরায় চোখ খুলে স্থির দৃষ্টিতে প্রতিকৃতিটির দিকে তাকালাম।
এ বার ঠিকমতো দেখে আর কোনও সন্দেহ রইল না।
মোমবাতির প্রথম ঝলক ক্যানভাসে পড়তেই যেন আমার ইন্দ্রিয়কে আচ্ছন্ন করে আসা সেই স্বপ্নময় ঘোর কেটে গেল এবং মুহূর্তেই আমাকে জাগ্রত জীবনের মধ্যে ফিরিয়ে আনল।
আমি আগেই বলেছি, এটি ছিল এক তরুণীর প্রতিকৃতি— শুধু মুখ ও কাঁধ পর্যন্ত আঁকা, শিল্পের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ভিনিয়েট শৈলী। ছবিটির ভঙ্গিতে স্যার থমাস সুলির বিখ্যাত নারীমুখগুলির প্রভাব স্পষ্ট। বাহু, বক্ষ, এমনকী উজ্জ্বল চুলের শেষপ্রান্তও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে পটভূমির গভীর, অস্পষ্ট ছায়ায়।
ফ্রেমটি ছিল ডিম্বাকার, সমৃদ্ধ সোনালি কারুকার্যে অলঙ্কৃত, মুরীয় নকশায় সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা।
শিল্পকর্ম হিসেবে এর চেয়ে নিখুঁত ছবি কল্পনা করা কঠিন। অথচ আমাকে এত প্রবল ভাবে যা আলোড়িত করেছিল, তা ছবির নিখুঁত অঙ্কন বা তরুণীর অপার্থিব সৌন্দর্য নয়। আবার এমনও নয় যে আধো-ঘুমন্ত কল্পনা তাকে জীবন্ত মানুষ বলে ভুল করেছিল। ছবির বিন্যাস, ভিনিয়েট শৈলী এবং অলঙ্কৃত ফ্রেম— সবই স্পষ্ট করে দিচ্ছিল, এটি কেবল একটি প্রতিকৃতি।
আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলাম যে ছবিটির নকশা, তার ভিনিয়েট রীতির ব্যবহার ও কৌশল— ছবির প্রান্তদেশ অস্পষ্ট করে কেন্দ্রকে উজ্জ্বল করা— এবং ফ্রেমের বৈশিষ্ট্য— এই তিনটিই নিশ্চয়ই মুহূর্তের মধ্যে সেই ধারণাটিকে দূর করে দিয়েছিল। এমনকী ক্ষণিকের জন্যও সেই ধারণা মনে স্থান পেতে দেয়নি।
তবু আমি দীর্ঘক্ষণ, হয়তো এক ঘণ্টা, আধশোয়া অবস্থায় চোখ সরাতে পারলাম না। যেন কোনও অদৃশ্য শক্তি আমাকে সেই মুখের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে।
অবশেষে বুঝতে পারলাম, কী সেই রহস্য, যা আমাকে এত গভীর ভাবে বিচলিত করেছে। ছবিটির মুখে এমন এক জীবন্ত অভিব্যক্তি ছিল, এমন এক নিঃশ্বাস-ফেলা বাস্তবতা, যা প্রথমে আমাকে বিস্মিত করেছিল, পরে বিভ্রান্ত, স্তব্ধ এবং শেষ পর্যন্ত আতঙ্কিত করে তুলেছিল। মনে হচ্ছিল, ছবিটি নয়— একজন জীবন্ত মানুষই েযন নীরবে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
গভীর শ্রদ্ধা ও অজ্ঞাত ভয়ে আমি বাতিদানটিকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে রাখলাম, যাতে সেই প্রতিকৃতি আবার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে।
আমার গভীর আলোড়নের কারণটি এ ভাবে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ায়, আমি তাড়াতাড়ি সেই বইটি খুঁজতে লাগলাম, যেখানে ছবিটির আলোচনা এবং তার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।
ডিম্বাকার প্রতিকৃতিটির নম্বর খুঁজে পেয়ে আমি সেখানে লেখা এক সংক্ষিপ্ত অথচ-অদ্ভুত বিবরণ পড়তে শুরু করলাম—
সে ছিল অতুলনীয় রূপসী এক তরুণী। কিন্তু তার সৌন্দর্যের চেয়েও ছিল তার প্রাণোচ্ছ্বলতা। হাসি, উচ্ছ্বাস আর জীবনের আনন্দে সে ছিল ভরপুর।
অমঙ্গল নেমে এসেছিল সেই দিন, যে দিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেই চিত্রশিল্পীর। যে দিন সে তাকে ভালোবেসেছিল এবং বিবাহ করেছিল। শিল্পী ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ— প্রবল আবেগপ্রবণ, অধ্যবসায়ী, কঠোর স্বভাবের। আর তার প্রথম এবং
প্রকৃত প্রেম ছিল তার শিল্প। স্ত্রী যেন তার কাছে দ্বিতীয়।
অন্য দিকে, নববধূটি ছিল হাসিখুশি, কোমল, প্রাণবন্ত। বনের হরিণশাবকের মতো চঞ্চল। পৃথিবীর সব কিছুকেই সে ভালোবাসত। কেবল একটি জিনিসকেই সে মনে-প্রাণে অপছন্দ করত। তার স্বামীর শিল্পকে। কারণ সেই শিল্পই ছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বিনী। শিল্পীর রঙের প্যালেট, তুলি, ক্যানভাস— এই সবই যেন তাকে স্বামীর সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখত।
তাই যখন শিল্পী একদিন বলল যে সে নিজের তরুণী স্ত্রীকেই আঁকতে চায়, তখন কথাটি শুনে তার মনে এক অদ্ভুত আশঙ্কা জন্ম নিল। তবু সে ছিল বিনয়ী এবং অনুগত। স্বামীর ইচ্ছার বিরোধিতা করল না।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ সে বসে রইল সেই নির্জন, উঁচু মিনারের কক্ষে। উপরের সরু জানালা দিয়ে আসা শীতল আলো সরাসরি পড়ত ক্যানভাসের ওপর। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, শিল্পী একাগ্রচিত্তে কাজ করে চলল। সে নিজের শিল্পকর্মে এমন ভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়েছিল যে, সময়, মানুষ, এমনকী নিজের স্ত্রী— সবকিছুকেই যেন ভুলে গিয়েছিল।
সে বুঝতেই পারল না, মিনারের সেই বিবর্ণ আলো ধীরে ধীরে তার স্ত্রীর মুখের রক্তিম আভা কেড়ে নিচ্ছে। নিঃশেষ করে দিচ্ছে তার স্বাস্থ্য, তার প্রাণশক্তি।
কিন্তু তরুণী কোনও অভিযোগ করল না। বরং সে মৃদু হাসিমুখেই প্রতিদিন বসে থাকত। কারণ সে জানত, তার স্বামী নিজের কাজকে কত গভীর ভাবে ভালোবাসে। সেই শিল্পসাধনায় স্বামী যে আনন্দ খুঁজে পায়, সেই আনন্দ নষ্ট করার অধিকার তার নেই।
এ দিকে প্রতিদিনই তার শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ছিল। মুখের রং ফ্যাকাশে হচ্ছিল, চোখের দীপ্তি ম্লান হয়ে আসছিল। অন্য সবাই তা লক্ষ করলেও শিল্পীর
চোখে কিছুই ধরা পড়ল না। কারণ তার সমস্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ক্যানভাসের ওপর—যেখানে সে সৃষ্টি করে চলেছিল এক অমর সৌন্দর্য।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল। অবশেষে আর মাত্র দু’টি কাজ বাকি রইল— ঠোঁটে একটি শেষ তুলির আঁচড়, আর চোখে একটি শেষ আলোর আভা।
সেই সময়ে তরুণীর প্রাণশক্তি যেন নিভে যাওয়া প্রদীপের শেষ শিখার মতো একবার ক্ষীণ ভাবে জ্বলে উঠল। শিল্পী শেষবারের মতো তুলি তুললেন। তিনি স্ত্রীর ঠোঁটে রঙের শেষ স্পর্শ দিলেন। তার পর চোখে বসালেন রঙের দীপ্তি।
এক মুহূর্তের জন্য তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নিজের সৃষ্টির সামনে। মনে হলো, ক্যানভাসের ভেতরে সত্যিই প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। হঠাৎ তিনি কাঁপতে শুরু করলেন। তাঁর মুখ বিবর্ণ হয়ে
গেল। আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখে ছবিটির দিকে তাকিয়ে তিনি উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠলেন—
‘এ তো সত্যিই জীবন!’
এই বলে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে তাকালেন— তিনি মৃত।