চিন-ইয়েমেনে অস্ত্র তৈরিতে AI-এর অপব্যবহার! নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন শুধু প্রযুক্তি, গবেষণা কিংবা ব্যবসার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে না। রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সংস্থা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিও অত্যাধুনিক এআই মডেলকে নিজেদের সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে এআই সংস্থা অ্যানথ্রপিক।
সংস্থার সাম্প্রতিক থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে ছয়টি নির্দিষ্ট ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তাদের ক্লদ এআই মডেলকে এমন কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সংস্থার ব্যবহারের নীতির পরিপন্থী। ঘটনাগুলির মধ্যে তিনটি চিন-ভিত্তিক, দুটি রাশিয়া-ভিত্তিক এবং একটি ইয়েমেন-ভিত্তিক বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক। এই ঘটনাগুলিতে অস্ত্র প্রযুক্তি, নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মতো কাজে এআই ব্যবহারের চেষ্টা ধরা পড়েছে।
চিনে সামরিক গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার
রিপোর্টের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলির একটি চিনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অ্যানথ্রপিকের তদন্ত অনুযায়ী, চিন-ভিত্তিক এক ব্যক্তি ক্লদ ব্যবহার করে একটি ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সফটওয়্যার ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শনাক্ত করা, ব্যাহত করা এবং বিভ্রান্ত করার মতো সামরিক কাজে সহায়তা করা। সফটওয়্যারটি তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে এআই ব্যবহার করে গবেষণা, সফটওয়্যার তৈরি এবং পরীক্ষা চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চিনের প্রতিরক্ষা গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে সন্দেহ করা হয়েছে।
তাইওয়ানকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল সামরিক পরিস্থিতি
তদন্তের সময় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। প্রকল্পটির একটি সিমুলেশন পরিস্থিতি পরিবর্তন করে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাতের কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে সামরিক ঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অ্যানথ্রপিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে সামরিক পরিকল্পনা ও সংঘাতের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এআইয়ের ব্যবহার আর শুধুই তাত্ত্বিক বিষয় নয়। ভারতের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চিনের সামরিক আধুনিকীকরণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলিই ভারতের উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
Advertisements
ইয়েমেনে অস্ত্র কর্মসূচিতেও এআই
আরও উদ্বেগজনক একটি ঘটনা ইয়েমেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অ্যানথ্রপিকের দাবি, সেখানে একদল ব্যক্তি একাধিক অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে ক্লদ ব্যবহার করছিলেন। এআইকে সেখানে কার্যত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং গবেষণা সহকারীর মতো কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিভিন্ন এআই ব্যবস্থাকে আলাদা দায়িত্ব দিয়ে কোড লেখা, গবেষণা এবং নিজেদের কাজ পর্যালোচনা করানো হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইয়েমেনে একটি বাস্তব পরীক্ষা চালানোর পর তার ফলাফলও অল্প সময়ের মধ্যে এআইয়ের কাছে বিশ্লেষণের জন্য দেওয়া হয়েছিল বলে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে। এতে বোঝা যায়, কিছু ক্ষেত্রে এআই আর শুধুমাত্র পরিকল্পনা বা গবেষণার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাস্তব অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে।
ছোট গোষ্ঠীর হাতেও বাড়ছে বড় ক্ষমতা
এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখানেই। অত্যাধুনিক সামরিক গবেষণার জন্য আগে বিপুল সংখ্যক বিশেষজ্ঞ, গবেষক, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং বিশাল পরিকাঠামোর প্রয়োজন হত।
এআই সেই ব্যবধান কিছু ক্ষেত্রে কমিয়ে দিতে পারে। অ্যানথ্রপিকের রিপোর্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, নির্দিষ্ট সংগঠনগুলি এআই ব্যবহার করে এমন কিছু সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে, যা সাধারণত বড় ও সংগঠিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভবিষ্যতে শুধুমাত্র রাষ্ট্র নয়, অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী বা প্রক্সি সংগঠনগুলিও তুলনামূলকভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে।
ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের নিরাপত্তার দিক থেকে এই প্রবণতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে রয়েছে চিনের দ্রুত সামরিক আধুনিকীকরণ এবং অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়া থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ত্র ও প্রযুক্তির বিস্তারের ঝুঁকি। চিনের ক্ষেত্রে এআই-নির্ভর সামরিক পরিকল্পনা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মতো ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের মতো জায়গায় অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলির হাতে এআই পৌঁছে যাওয়ার অর্থ হল পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব ভারতের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের উপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচল ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন পরীক্ষা
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তাদের ‘ফ্রন্টিয়ার রেড টিম’ এআই মডেলের সামরিক সক্ষমতা পরিমাপের জন্য নতুন ধরনের পরীক্ষা তৈরি করেছে। এর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্য নির্বাচন এবং প্রচলিত অস্ত্র উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সক্ষমতাও রয়েছে। সংস্থাটির দাবি, এই ধরনের কাজে অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলির সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
তবে অ্যানথ্রপিকের রিপোর্টে যে ঘটনাগুলি তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলি এআইয়ের মাধ্যমে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বরং এগুলি দেখাচ্ছে, রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গবেষক এবং অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলি কীভাবে বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া এআই প্রযুক্তিকে সামরিক কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
এখন মূল প্রশ্ন হল, এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার অপব্যবহার ঠেকানোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কত দ্রুত উন্নত করা যায়। ভারতের মতো দেশগুলির ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় এআই-সক্ষম রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় হুমকিকে আলাদা করে বিবেচনা করা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন