স্মার্টফোনের দাম ২১% বাড়ল, AI-এর চাপে পকেটে বড় ধাক্কা
২০২৬ সালে ভারতে স্মার্টফোন কেনার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে (Smartphone Price Hike)। গড়ে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে স্মার্টফোনের খুচরো দাম, যা বিশ্বের বড় বাজারগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। বাজার গবেষণা সংস্থা কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ-এর ‘গ্লোবাল স্মার্টফোন প্রাইস ইনক্রিজ ট্র্যাকার’ অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের খুচরো দাম গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
ভারতের পর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দাম বেড়েছে ১৯ শতাংশ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলে ১৮ শতাংশ। ফলে ভারতের বাজারে কেন স্মার্টফোনের দাম এতটা বাড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
মেমোরি চিপের দামেই বড় চাপ
স্মার্টফোনের দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে মেমোরি চিপের খরচ। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় স্মার্টফোনের মেমোরির দাম প্রায় চার গুণ বেড়েছে।
ডিআরএএম এবং ন্যান্ড চিপের দাম বাড়ায় ফোন তৈরির মোট খরচে মেমোরির অংশও দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে ১৫,০০০ টাকার নিচের স্মার্টফোনে মেমোরি এখন মোট বিল অব ম্যাটেরিয়ালস বা বিওএম-এর ৪৫ শতাংশেরও বেশি অংশ দখল করছে।
Advertisements
এই পরিস্থিতির পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিকাঠামোর চাহিদার। মেমোরি নির্মাতারা এআই সার্ভারে ব্যবহৃত হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরির জন্য উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশ বরাদ্দ করছেন। ফলে স্মার্টফোন ও অন্যান্য কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত প্রচলিত মেমোরির সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক বছরে ডিআরএএম-এর দাম পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এআই পরিকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণ মেমোরি সরবরাহের উপর আরও চাপ তৈরি করেছে।
Read More: যোগী নেতৃত্বে বড় সাফল্য! ১ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির দিকে উত্তরপ্রদেশ
সবচেয়ে বেশি চাপ বাজেট ফোনে
মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ভারতের বাজেট স্মার্টফোন বাজারেই সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। কাউন্টারপয়েন্টের তথ্য অনুযায়ী, জুন ত্রৈমাসিকে ১৫,০০০ টাকার নিচের স্মার্টফোনের শিপমেন্ট বছরে ৪৫ শতাংশ কমেছে।
শুধু বাজেট সেগমেন্ট নয়, গোটা ভারতীয় স্মার্টফোন বাজারও এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে বছরে প্রায় ১০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, জানিয়েছে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি সংস্থা ফোনের স্পেসিফিকেশনেও পরিবর্তন আনছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু নির্মাতা এন্ট্রি-লেভেল ফোনে মেমোরি কনফিগারেশন কমিয়ে দিচ্ছে, যাতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অর্থাৎ আগে যে দামে বেশি র্যাম বা স্টোরেজ পাওয়া যেত, এখন একই দামের ফোনে তুলনামূলক কম স্পেসিফিকেশন দেখা যেতে পারে।
শুধু পুরনো ফোন নয়, নতুন মডেলের দামও বাড়ছে
দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বাজারে থাকা পুরনো মডেলগুলির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন লঞ্চ হওয়া ফোনগুলিও আগের তুলনায় বেশি দামে বাজারে আসছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে লঞ্চ হওয়া নতুন স্মার্টফোনগুলির দাম একই ধরনের ২০২৫ সালের মডেলের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। ইতিমধ্যেই চলতি বছরে ৪০ শতাংশের বেশি স্মার্টফোন মডেলের দাম বেড়েছে।
ভারতের বাজারেও এই প্রবণতা বছরের শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছিল। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এপ্রিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮০টিরও বেশি স্মার্টফোন মডেলের গড় দাম ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
Read More:বিশাল অর্থনৈতিক সাফল্য! ১ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহে সই আদানি এয়ারপোর্টের
ফোন কেনার সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন ক্রেতারা
দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের কেনাকাটার পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসছে। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের ভারতীয় ক্রেতা সমীক্ষা অনুযায়ী, ৪৬ শতাংশ সম্ভাব্য ক্রেতা পছন্দের ফোন কিনতে বাজেট বাড়াতে রাজি।
তবে সবাই অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে চাইছেন না। প্রায় ২৫ শতাংশ ক্রেতা ফোন কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে চান। আরও ২৯ শতাংশ ক্রেতা নিজেদের নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই থাকতে চান অথবা রিফারবিশড ফোন বিবেচনা করছেন।
এর ফলে ভারতের স্মার্টফোন বাজারে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত প্রবণতা এখন বড় ধাক্কার মুখে। এতদিন একই দামে প্রতি বছর আরও ভালো প্রসেসর, বেশি র্যাম, বেশি স্টোরেজ ও উন্নত ক্যামেরা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধি সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
এআই সার্ভারের জন্য মেমোরির চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় স্মার্টফোন নির্মাতাদের খরচের চাপ আপাতত কমার সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়। ফলে সংস্থাগুলি দাম বাড়ানো, স্পেসিফিকেশন সামঞ্জস্য করা, ইএমআই, ব্যাঙ্ক অফার এবং এক্সচেঞ্জ বোনাসের মতো কৌশলের উপর আরও বেশি নির্ভর করতে পারে।
বিশেষ করে ১৫,০০০ টাকার নিচের ফোনের বাজারে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে বেশি দামের মিড-রেঞ্জ ও প্রিমিয়াম ফোনে নির্মাতারা অতিরিক্ত খরচ তুলনামূলক সহজে সামলাতে পারলেও ক্রেতাদের বাজেটের উপর তার প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের স্মার্টফোন বাজারে শুধু নতুন ফিচার বা ক্যামেরার প্রতিযোগিতাই নয়, মেমোরি চিপের সরবরাহ এবং এআই শিল্পের বিপুল চাহিদাও ফোনের দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে আগামী দিনে কম দামে বেশি স্পেসিফিকেশনের স্মার্টফোন পাওয়ার প্রবণতা কতটা বজায় থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।