‘বাবা, একদিন আমাকে নিয়ে তোমার গর্ব হবে...’, স্বপ্নপূরণে দিল্লি এসে আর বাড়ি ফেরা হলো না অক্ষতের - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘বাবা, একদিন আমাকে নিয়ে তোমার গর্ব হবে…’, স্বপ্নপূরণে দিল্লি এসে আর বাড়ি ফেরা হলো না অক্ষতের

Spread the love

‘বাবা একদিন দেখো, আমাকে নিয়ে তোমার খুব গর্ব হবে। আমি তোমাকে মস্ত বড় অফিসার হয়ে দেখাব।’ রবিবারের দুপুরে দুঃসংবাদটা আসার পর থেকে অক্ষতের বাবার কানে বাজছে ছেলের বলা এই কথাগুলোই। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চ পদে চাকরি পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তো রাজধানীতে এসেছিলেন অক্ষত সিং যাদব। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের PGDAV কলেজে পড়ার পাশাপাশি স্বপ্নপূরণের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন UPSC-এর প্রস্তুতি কোর্সেও। কিন্তু ১৯ বছরের অক্ষতের স্বপ্নের দৌড় শেষ হয়ে রবিবার। সত্য নিকেতনের ওই ভেঙে পড়া বাড়িতেই পেয়িং গেস্ট থাকতে শুরু করেছিলেন মধ্যপ্রদেশের কাটনি জেলার বাসিন্দা অক্ষত সিং যাদব। আচমকা বাড়ি ধসে ধ্বংসস্তূপেই চাপা পড়ে মৃত সাতজনের মধ্যে একজন অক্ষত।

মধ্যপ্রদেশের কাটনির দুবে কলোনিতে থাকেন অক্ষতের পরিবার। তাঁর বাবা কাজ করেন রাজস্থানের কোটায়। মা গৃহবধূ। ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগেই রাখির জন্য বাড়ি এসেছিল পরিবারের চোখের মণি অক্ষত সিং যাদব। সেই দেখাই যে শেষ দেখা হবে তা কে জানত। রবিবার দুপুর দেড়টা নাগাদ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে সত্য নিকেতন এলাকার ওই বাড়িটি। ছুটির দিন হওয়ায় দুপুরে নিজের ঘরে বসেই সম্ভবত পড়াশোনা করছিলেন। পিজির ঘরে থাকাই হলো কাল। বাড়ি ভেঙে পড়ায় আর কয়েকজন আবাসিকের মতোই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে যায় কাটনির বাসিন্দা এই তরুণ। বাড়ি ভাঙার খবর পেয়েই সেখানে পৌঁছয় উদ্ধারকারী দল। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বাদে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৯-এর মেধাবী পড়ুয়াকে। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।

মোবাইলে তোলা ছেলের ছবিই বুকে জড়িয়ে রেখেছেন মা

রবিবার দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ বাড়িতে এসেছিল ফোনটা। খবরটা শোনার পর থেকেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন অক্ষতের মা। মোবাইলে থাকা ছেলের ছবি আঁকড়েই কেঁদে চলেছেন তিনি। দু’দিন আগেই মায়ের সঙ্গে ভিডিয়ো কলে শেষ কথা হয়েছিল ওই পড়ুয়ার। তখনও নিজের স্বপ্ন নিয়েই মাকে ভবিষ্যতের একাধিক পরিকল্পনা শুনিয়েছিল অক্ষত। ছোট থেকেই সে মেধাবী পড়ুয়া। অবসর পেলেই বই কিনতেন। বিভিন্ন কুইজ ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল UPSC দিয়ে প্রশাসনিক আধিকারিক হওয়া। ছেলের স্বপ্ন যাতে পূরণ হয়, তাই দিল্লির পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাবা-মা। এখন সেই কথা মনে করেই আক্ষেপে বিলাপ করছেন অক্ষতের শোকার্ত মা। মোবাইলের স্ক্রিনে ছেলের ছবি দেখতে দেখতে চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না তিনি। কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বলেন, ‘যে সন্তানকে নয় মাস গর্ভে ধারণ করেছি, কোলে-পিঠে মানুষ করেছি, আজ সেই সন্তানের নিথর দেহ কী ভাবে দেখব!’

অক্ষতের বাবাও শোকে ভেঙে পড়েছেন। বার বার তাঁর মনে হচ্ছে, কেন ছেলের কথা শুনে তাঁকে যেতে দিলেন, তা হলে আজ এই বিপদ হতো না। অক্ষতের পরিবারের এক ব্যক্তি রক্ষাবন্ধনের সময়ে যখন বাড়ি এসেছিলেন অক্ষত। তাঁর বাবা চেয়েছিলেন, আরও কিছু দিন ছেলে বাড়িতে থাকুক। কিন্তু দিল্লিতে ফেরার টিকিট কাটা ছিল। তাই ছেলে টিকিট বাতিল করতে চায়নি। জেদ করে ফিরে যায়। ছেলেকে আটকাতে না পারার শোক সামলাতে পারছেন না সন্তানহারা পিতা।

তলোয়ার নিয়ে কত আনন্দ ছিল!

আকশতের একটি বিশেষ শখ ছিল তলোয়ার সংগ্রহ করা। সম্প্রতি প্রায় ২,৫০০ টাকা দিয়ে একটি তলোয়ার কিনেছিলেন তিনি। ভিডিয়ো কলে পরিবারের সদস্যরা সেটি দেখিয়েছিলেন তিনি। বোন লিচিকে বাড়ি ফিরে সেই তলোয়ারটি দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতিও রয়ে গেল অসম্পূর্ণ।

অক্ষত, তাঁর মা-বাবা এবং বোন লিচি— এই ছিল তাঁদের ছোট্ট পরিবার। বাবা-মায়ের মতো দাদার এরকম মর্মান্তিক পরিণতিতে শোকে বাকরুদ্ধ লিচি। সপ্তাহখানেক আগেই যে হাতে রাখি বেঁধে দীর্ঘ জীবনের কামনা করেছিলেন, আজ দাদার প্রাণশূন্য, বরফ ঠান্ডা সেই হাতটা ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অক্ষতের বোন।

‘কেন ছেলেকে অকালে চলে যেতে হলো?’ অক্ষতের বাবা প্রশ্ন তুলেছেন, ছাত্রদের থাকার মতো এই বিল্ডিংগুলির নিরাপত্তা কেন নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না। তাঁর কথায়, ‘মানুষ নিজের সন্তানকে এই বিল্ডিংগুলিতে রেখে যায় নিরাপদ ভেবে। আমরা কখনও ভাবিনি, আমার ছেলে যেখানে আছে, সেই বাড়ির এমন অবস্থা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *