S 500 ও Su 57 নিয়ে ভারত-রাশিয়ার বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির জল্পনা
নয়াদিল্লি: এসসিও শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক (India Russia) ঘিরে ভারতের পরবর্তী বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে রাশিয়ার এস-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সু-৫৭ স্টেলথ যুদ্ধবিমান। ওয়াশিংটন এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকে নজর রাখলেও নয়াদিল্লি মস্কোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকে এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বিশেষ ও বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবেই দুই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে। এস-৫০০ এবং সু-৫৭, এই দুই প্ল্যাটফর্ম নিয়েই বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে জানা গিয়েছে।
এস-৫০০ নিয়ে ভারতের আগ্রহের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসছে এস-৪০০-এর অভিজ্ঞতা। অপারেশন সিন্দুরের সময় মোতায়েন করা এস-৪০০ আকাশপথের বিভিন্ন হুমকি শনাক্ত এবং প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ভালো কাজ করেছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ভারতের বৃহত্তর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও এস-৪০০ কার্যকরভাবে কাজ করেছে বলে জানা গিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার পর আরও উন্নত প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
এস-৪০০ মূলত ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে বিমান, ড্রোন এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম। অন্যদিকে, এস-৫০০ প্রমিথিউসকে এস-৪০০-এর সরাসরি বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়নি। বরং দুই ব্যবস্থাকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এস-৪০০ যেখানে বিমান, ড্রোন এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় বেশি কার্যকর, সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক অস্ত্রের মতো আরও উন্নত হুমকি মোকাবিলায় এস-৫০০ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আমেরিকার যুদ্ধ দফতরের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রমিথিউস ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক অস্ত্র ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা অত্যন্ত উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।
এস-৫০০ প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার উচ্চতায় থাকা লক্ষ্যবস্তু আটকাতে পারে। অর্থাৎ এটি নিকট-মহাকাশ স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম। কারমান লাইনের ঠিক নীচের স্তরেও এই ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলা করতে পারে। এর জন্য ৭৭এন৬-এন এবং ৭৭এন৬-এন১ হিট-টু-কিল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়।
তবে এস-৫০০ চুক্তির ক্ষেত্রে শুধু সরাসরি কেনাকাটার বিষয়টি নয়, উৎপাদন কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নয়াদিল্লিভিত্তিক কৌশলগত বিষয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ভারতীয় কোনও অংশীদার সংস্থা এবং রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে যৌথ উৎপাদন বা কো-প্রোডাকশন ব্যবস্থার মাধ্যমে এস-৫০০ তৈরির প্রস্তাব দিতে পারে।
ভারতের কাছে এস-৫০০ বিক্রির বিষয়ে রাশিয়া বেশ কয়েক বছর ধরেই আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। ২০২১ সালে তৎকালীন রুশ উপপ্রধানমন্ত্রী ইউরি বরিসভ জানিয়েছিলেন, ভারত এই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম বিদেশি গ্রাহক হতে পারে।
অন্যদিকে, সু-৫৭ স্টেলথ যুদ্ধবিমান নিয়েও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রকাশ্যেই সু-৫৭-এর সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। তিনি বিমানটিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা যুদ্ধবিমান হিসেবে বর্ণনা করার পাশাপাশি ভারত-রাশিয়া আলোচনায় সু-৫৭-এর বিষয়টি থাকার কথাও নিশ্চিত করেছেন।
রাশিয়া শুধু যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাবই দিচ্ছে না। লাইসেন্সের আওতায় ভারতে সু-৫৭ উৎপাদনের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। পাশাপাশি ভারতীয় অস্ত্র ব্যবস্থাকে এই যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সংযুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ব্রহ্মোসের মতো ভারত-রাশিয়ার যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সু-৫৭ নিয়েও নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভারতীয় বায়ুসেনার বর্তমান পরিস্থিতিও সু-৫৭ নিয়ে আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যুদ্ধবিমানের ঘাটতির কারণে ভারতীয় বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন সংখ্যা প্রায় ছয় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। একই সময়ে চিন দ্রুত পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বহর তৈরি করছে এবং ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পরীক্ষা করছে। ফলে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ভারতের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এখনও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে এবং সেটি ২০৩৫ সালের আগে পরিষেবায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা কম। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই জায়গায় সু-৫৭ ভারতের জন্য একটি সম্ভাব্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
তবে এস-৫০০ বা সু-৫৭, কোনও চুক্তিই এখনও চূড়ান্ত হয়নি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ভারত-রাশিয়া শীর্ষ বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে এই দুই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনও উল্লেখ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত, সরবরাহ সংক্রান্ত এবং আর্থিক বিষয় নিয়ে তখনও দুই দেশের মধ্যে সমাধান বাকি ছিল বলে জানা যায়।
এর সঙ্গে রয়েছে আমেরিকার আপত্তির বিষয়টিও। রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের বড় আকারে অস্ত্র কেনার বিষয়ে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই অস্বস্তি প্রকাশ করে আসছে। ফলে এস-৫০০ বা সু-৫৭ নিয়ে কোনও বড় চুক্তি হলে তা ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চলতি মাসের শেষের দিকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসবেন। ফলে মোদী-পুতিন বৈঠকের পর আগামী কয়েক সপ্তাহে এই প্রতিরক্ষা প্রস্তাবগুলির বিষয়ে আরও স্পষ্টতা তৈরি হতে পারে।
এস-৫০০ এবং সু-৫৭-এর বাইরেও ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার খবর রয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশের সামরিক ঘাঁটিতে পারস্পরিক প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে লজিস্টিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের সু-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানের বহর নিয়েও সম্ভাব্য আধুনিকীকরণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এই আপগ্রেডের আওতায় রাডার, অ্যাভিওনিক্স এবং অস্ত্র ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার বিষয় থাকতে পারে। এর ফলে পুরনো বিমানগুলির কার্যকর পরিষেবা জীবন বাড়ানোর পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা ও আঘাত হানার ক্ষমতাও আরও উন্নত করার লক্ষ্য থাকবে।
সব মিলিয়ে এস-৫০০, সু-৫৭, সু-৩০ এমকেআই আপগ্রেড এবং বৃহত্তর সামরিক লজিস্টিক সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। তবে প্রযুক্তি, অর্থ, উৎপাদন, সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণ, বিশেষ করে আমেরিকার অবস্থান, এই সম্ভাব্য চুক্তিগুলির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।