হরমুজে মাইনের প্রস্তুতি, লারাক দ্বীপে ইরানের দুই লঞ্চারে হামলা আমেরিকার
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের (Iran US War) আবহে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রবিবার ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ইরানি লঞ্চারে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্মকর্তারা। অভিযোগ, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশন গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্র মাইন ছোড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এদিকে যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার দিনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই উদ্যোগ দুর্বলতার কারণে নয়, বরং যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তার বার্তা ইরানের
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তেহরান যোগাযোগ শুরু করেছে। ইরানি প্রেসিডেন্টের দফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, তিনি বলেছেন, এই উদ্যোগ “দুর্বলতার অবস্থান থেকে নয়, বরং যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে” নেওয়া হচ্ছে।
তেহরানে ৪০তম আন্তর্জাতিক ইসলামিক ঐক্য সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা ইরান খুব ভালোভাবেই জানে। তিনি বলেন, যখন ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা আছড়ে পড়ে, তখন সেগুলি কোনও ইরানি মায়ের স্বপ্ন আর কোনও আরব মায়ের স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য করে না। গত সপ্তাহেও পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, এখনই সংঘাত শেষ করা ভালো হবে। তাঁর দাবি ছিল, ইরান বর্তমানে “শক্তি ও মর্যাদার” অবস্থান থেকে যুদ্ধ শেষ করার জায়গায় রয়েছে।
লারাক দ্বীপে আমেরিকার হামলা
রবিবার ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি লঞ্চারে আমেরিকার বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, আইআরজিসির সদস্যদের এমন রকেট প্রস্তুত করতে দেখা গিয়েছিল, যেগুলির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর দিকে সমুদ্র মাইন ছোড়া হতে পারে। এই ঘটনার পর মার্কিন বাহিনী লারাক দ্বীপে হামলা চালায়। প্রায় এক মাসের মধ্যে এটি লারাক দ্বীপে প্রথম মার্কিন হামলা বলে জানা যাচ্ছে। ইরানের ফার্স সংবাদ সংস্থা এর আগে লারাক দ্বীপের কাছে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর দিয়েছিল। তবে বিস্ফোরণের কারণ তখন নিশ্চিত করা হয়নি।
আমেরিকাকে পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি আইআরজিসির
মার্কিন হামলার পর ইরানের ইসলামিক রেভলিউশন গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, আইআরজিসি হামলার জন্য দায়ীদের “শাস্তি” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আইআরজিসির দাবি, মার্কিন হামলায় বেশ কয়েকজন ইরানি যোদ্ধা এবং সাধারণ নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন। তবে হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
লারাক দ্বীপে হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। ইরানি বাহিনী আমেরিকার এই দাবি যে প্রণালীটি খোলা রয়েছে, সেটিকে “স্পষ্ট মিথ্যা” বলে অভিহিত করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহণ করা হয়। ফলে এই জলপথে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
ইউরোপে প্যাট্রিয়ট মিসাইলের ঘাটতি নিয়ে ন্যাটোর উদ্বেগ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পাশাপাশি আমেরিকার জন্য আরেকটি বড় সমস্যা সামনে এসেছে ইউরোপে উন্নত মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি। মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে ইউরোপে “ক্রিটিক্যালেরও নিচে” পর্যায়ের উন্নত মিসাইল ইন্টারসেপ্টর মজুতের সমস্যায় রয়েছে বলে জানা গেছে। সবচেয়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর-এ। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাশিয়ার উচ্চগতির ব্যালিস্টিক মিসাইল মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ন্যাটোর এক কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন যে ইউরোপে আমেরিকা ও ন্যাটোর হাতে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে গিয়েছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘাটতির কারণে রাশিয়া যদি ইউরোপে সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা চালায়, তাহলে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়তে পারে। সামরিক সদর দফতর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর না থাকলে ন্যাটোকে বড় সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। এক ন্যাটো কর্মকর্তা পরিস্থিতির তুলনা ইউক্রেনের সঙ্গে করেছেন। ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ঘাটতির মধ্যে রাশিয়ার মিসাইল হামলা মোকাবিলা করছে।
যুদ্ধের ছয় মাসে নতুন সামরিক সমীকরণ
ইরান-আমেরিকা সংঘাত ছয় মাসে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। হরমুজ প্রণালীতে মাইন বসানোর আশঙ্কা, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা এবং আইআরজিসির পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে আমেরিকার বিপুল অস্ত্র ব্যবহারের ফলে ইউরোপে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে যাওয়ায় রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি নিয়েও ন্যাটোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালী, অন্যদিকে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একই সময়ে দুই ভিন্ন অঞ্চলে সামরিক চাপ সামলাতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন