অর্থমনর্থম! অতিরিক্ত আয়েই কি বাড়ছে ভারতীয় ক্রিকেটারদের ঔদ্ধত্য?
ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে সবচেয়ে ধনী খেলা অবশ্যই ক্রিকেট। যত দিন যাচ্ছে, ক্রিকেটে অর্থের পরিমাণ ততই বাড়ছে। প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সময়ে ভারতীয় ক্রিকেটের যে অবস্থা ছিল সেখান থেকে এখনকার ছবি অনেকটাই আলাদা। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় উঠছে নানা প্রশ্ন। ক্রিকেটে যত অর্থ বাড়ছে তত কি প্লেয়াররা অহংকারী হয়ে যাচ্ছেন? মাথাচাড়া দিচ্ছে ঔদ্ধত্য? অন্তত যশস্বী জয়সওয়ালের সাম্প্রতিক হেড বাটের ঘটনায় এই বিষয়টা নতুন করে উঠে এসেছে।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে গল টেস্টে যশস্বীর হেডবাট নিয়ে দেশ-বিদেশের প্রাক্তন ক্রিকেটাররা সরব। কেউ যশস্বীর দিকে আঙুল তুলছেন, কেউ সরাসরি BCCI-এর শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। যশস্বী দেশের জন্য লড়ার কথা বললেও তাতে মন গলছে না প্রাক্তনীদের। কারণ, অতীতে একাধিকবার এই ছবি দেখা গিয়েছে। কিন্তু ছবি বদলায়নি। কেন? এর পিছনে কি অতিরিক্ত অর্থ?
এখন ক্রিকেটে ঘরোয়া স্তর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রতিটা ক্ষেত্রেই বিপুল টাকা। যেমন বৈভব সূর্যবংশী, মাত্র ১৪ বছর বয়সে IPL-এ খেলতে নেমে পেয়েছে ১.১০ কোটি টাকা। ক্রিকেট খেলে এক বছরে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ, মাথা ঘোরানোর মতোই। যশস্বীর থেকে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে অঙ্কটা আরও বেশি। যেমন ঋষভ পন্থ। তিনি IPL থেকে ২৭ কোটিতে দল পেয়েছেন। এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট, BCCI-এর কেন্দ্রীয় চুক্তি, নিজস্ব ব্যবসা, বিনিয়োগ। অর্থাৎ, প্রত্যেক ক্রিকেটারই কোটিপতি। একজন ক্রিকেটারের আয় যে কোনও স্টার্টআপকে হারিয়ে দেবে। আর এতেই কিছু ক্রিকেটার ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
BCCI-এর প্লেয়ারদের আয়
BCCI-এর কেন্দ্রীয় চুক্তিতে রয়েছে পাঁচটা গ্রেড। A+, A, B, C ও D। এর মধ্যে A+ গ্রেডে যে প্লেয়ার খেলেন, তিনি বছরে বোর্ডের থেকে পান ৭ কোটি টাকা। এর পর A গ্রেডের প্লেয়ার পান ৫ কোটি টাকা। রিপোর্ট অনুযায়ী, বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তির একজন প্লেয়ার প্রতিটা ম্যাচ বাবদ আলাদা আলাদা ফি পান। যেমন A+ গ্রেডে থাকা প্লেয়ার একটা টেস্ট খেলে পান ৫ লাখ টাকা। ODI থেকে অঙ্কটা ৩ লাখ এবং টি-টোয়েন্টি থেকে অঙ্কটা দেড় লাখ। এর সঙ্গে ব্র্যান্ড ডিল ও IPL যোগ করলে তা বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তির অঙ্ককেও ছাড়িয়ে যায়।
তবে অতীতে এই ছবিটা ছিল না। যেমন ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপের সময় ODI ম্যাচ পিছু প্লেয়াররা পেতেন মাত্র দেড় হাজার টাকা। দৈনিক ভাতা মিলত ২০০ টাকা। বিদেশে গেলে সেই অঙ্কটা দাঁড়াত ১৫-২০ পাউন্ড। শুধু তাই নয়, ১৯৮৩ সালে প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করা কপিল দেব ব্রিগেডকে বোনাস দিতে পারেনি BCCI। প্রয়াত শিল্পী লতা মঙ্গেশকর অনুষ্ঠান করে সেই টাকা তুলে দেন প্লেয়ারদের হাতে।
কপিল দেব একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাঁর ক্রিকেটীয় জীবনে তাঁরা দৈনিক ভাতাগুলোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা কর্তাদের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। অনেক সময় খেলা ছেড়ে দিতে মন চাইলেও ভালোবাসার জন্য তাঁরা মানিয়ে নিয়েছেন। এখানে রয়েছে একটি ঘটনাও, প্রাক্তন ক্রিকেটার সুধীর নায়েক ১৯৭৪ সালে লন্ডনের মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার স্টোর থেকে এক জোড়া মোজা চুরি করেছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়েছিল যে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মাঝখানে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে জরিমানা করে ছেড়ে দেয় ব্রিটিশ আদালত।
অতীত বনাম বর্তমান: প্লেয়ারদের মানসিকতা
অতীতে প্লেয়ারদের বেতন, ভাতার অঙ্কটা শুনলে বোঝা যাচ্ছে তাঁদের কাছে এক একটা টাকার গুরুত্ব কতটা। ফলে ম্যাচে তাঁরা এমন কিছু করতেন না যাতে শাস্তি পেয়ে টাকা কাটা যায়। এতে অনেকটা সংযমী মানসিকতার পরিচয় দিতে হতো। কিন্তু এখন বোর্ড তথা প্লেয়ারদের আর্থিক অবস্থা যেখানে পৌঁছেছে তাতে তাঁদের ম্যাচ ফি-র ২৫ বা ৫০ শতাংশ জরিমানা করলেও তা খুব একটা পার্থক্য তৈরি করে না। আর এটাই প্লেয়ারদের মধ্যে ডোন্ট কেয়ার মানসিকতার জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
উপায় কি আদৌ আছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লেয়ারদের মধ্যে আগ্রাসনের ঘটনা নতুন নয়। একজন প্লেয়ারের আগ্রাসী মানসিকতা থাকলে সেটা দলের জন্য লাভজনক। কিন্তু সেই আগ্রাসনটা দলকে জেতানোর জন্য থাকতে পারে। সেটা না হয়ে বিপক্ষকে হেডবাট, চাপে রাখতে অবাঞ্ছিত ঝামেলা করাটা দিনের শেষে হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। BCCI এখনই লাগাম না টানলে আখেরে ভারতীয় ক্রিকেটেরই ক্ষতি।