‘চোখের সামনে ভেসে গেল ছেলে-বৌ…’, বিপর্যয়ের পরে প্রিয়জনের জন্য ‘মিরাকেল’-এর প্রার্থনা নেপালের ব্যবসায়ীর
রোদ ঝলমলে আবহাওয়া। কাজের দিনের সকালে দোকানে ভালোই ভিড় জমেছিল খদ্দেরদের। তাঁদের চাহিদা সামাল দিতেই ব্যস্ত ছিলেন দম্পতি। সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল ছেলেও। আচমকা চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়ে এসে এক ব্যক্তি বললেন,‘বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। জল আসছে, সবাই পালাও।’ মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ভুলে দৌড়োদৌড়ি শুরু করলেন সকলে। কোনওমতে দোকানের ঝাঁপ টেনে প্রাণ হাতে দৌড় শুরু করেন দোকানি ও তাঁর পরিবারও। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। তাঁদের প্রাণ বাঁচানোর দৌড়কে হারিয়ে দিল আচমকা ধেয়ে আসা কাদাজলের স্রোত। চোখের নিমেষে হাত ছাড়িয়ে সেই জলের তোড়ে ভেসে গেলেন স্ত্রী। ১৮ বছরের ছেলেও কাদাজলের স্রোতে চোখের নিমেষে ভেসে গেলেন। এর পরেই কান্নায় গলা বুজে এল নেপালের নুওয়াকোটের ত্রিশুলি বাজারের ওই ব্যবসায়ীর।
হড়পা বানে নুয়াকোটের ত্রিশুলি বাজার একেবারে নিশ্চিহ্ন। ওই ব্যবসায়ীর দোকান যে জায়গায় ছিল সেখানে এখন বইছে কাদাজলের স্রোত। রাক্ষুসে বানের জল তাঁর দোকানের পাশাপাশি গিলে খেয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁইও। ২৪ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে মুখে খাবার-জল কিছুই তোলেননি তিনি। সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে কোনও মতে বলেন, ‘সকালে হঠাৎ প্রশাসনের লোকজন এসে আমাদের জানান যে, তিব্বতের দিকে ভোটকোশি নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বিপুল জলস্রোত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। জলদি উঁচু জায়গায় যেতে বলা হয়েছে।’
ওই ব্যবসায়ী আরও জানান, এই সতর্কবাণী শুনে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। বাজারে আসা লোকজন যে দিকে পেরেছেন দৌড় লাগান। তিনি জানান, বন্যার জল এত দ্রুত এসেছিল যে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার কার্যত কোনও সময়ই দেয়নি। তাঁর কথায়, ‘দোকানে কোনও মতে ঝাঁপ টেনে বেরোতেই দেখলাম কাদামাটির জল পৌঁছে গিয়েছে। তার পরেই পিছনে দেখি সুনামির মতো উঁচু ঢেউ ছুটে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের উপর আছড়ে পড়ল। হাত ছাড়িয়ে ভেসে গেল স্ত্রী। ছেলেকেও আর দেখতে পেলাম না।’ স্রোতের তোড়ই ওই ব্যবসায়ীকে আছড়ে ফেলে শুকনো ডাঙার দিকে। কিন্তু এখনও খোঁজ নেই তাঁর পরিবারের। ভয়াবহতার কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘প্রায় ১০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মতো উঠে বাজারের দিকে ধেয়ে এসেছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গোটা বাজার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।’
প্রকৃতির তাণ্ডবলীলার হাত থেকে নিজে বেঁচে ফিরলেও ছেলে ও স্ত্রীয়ের চিন্তা প্রতিমুহূর্তে কুরে কুরে খাচ্ছে ওই ব্যবসায়ীকে। কোনও না কোনও জাদুবলে তাঁরা সুরক্ষিত আছেন বলেই বিশ্বাস তাঁর। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা আর না বাড়িয়ে ফের চোখ বুজে স্বজনদের সুরক্ষায় প্রার্থনা শুরু করলেন তিনি।
Terrifying new video shows a flash flood tearing through a village on the Nepal–Tibet border, giving residents just seconds to run for cover as people desperately flee the approaching flood. pic.twitter.com/GzE2URICX2
— Weather Monitor (@WeatherMonitors) August 27, 2026
নেপাল বিপর্যয়ে মৃত্যু মিছিল
এই ভয়াবহ হড়পা বানের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নেপালের রাসুয়া এলাকায়। পাশাপাশি ধাদিং এবং নুয়াকোট জেলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নেপাল পুলিশের হিসাবে বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত অন্তত ২৮৯ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। কাঠমান্ডু পোস্টের আপডেট অনুযায়ী, এখনও নিখোঁজ ৮২৬ জন। রয়টার্সের আপডেট অনুযায়ী, নিখোঁজ প্রায় ১৩০০ জন। নেপালের বিদেশমন্ত্রীর দাবি, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৩০০ জন ভারতীয় রয়েছে।
FAQ
১. নেপালে কত জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না?
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
২. ২৮৮ জন ভারতীয় কি নিখোঁজ?
অবশ্যই এমনটা বলা হয়নি। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না। দুর্গম এলাকা, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই তাঁদের সবাইকে নিখোঁজ বা মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়নি।
৩. চিনের দিকে কত জন ভারতীয় আটকে রয়েছেন?
বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ জন ভারতীয় নাগরিক চিনের দিকে সীমান্ত এলাকায় আটকে রয়েছেন।
৪. আটকে থাকা ভারতীয়দের উদ্ধারে কী করছে ভারত?
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নেপাল ও চিনের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আটকে থাকা ভারতীয়দের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যোগাযোগহীন ভারতীয়দের অবস্থান জানার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
৫. নেপালের কোন কোন এলাকায় হড়পা বানের প্রভাব পড়েছে?
নেপালের রসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং-সহ একাধিক পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধস হয়েছে। নদীর তীরবর্তী বহু বাড়ি, রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৬. নেপাল ও চিনে মোট কত জন নিখোঁজ?
Reuters-এর প্রতিবেদনে নেপাল ও চিনের তিব্বত মিলিয়ে প্রায় ১,৫০০ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানানো হয়েছে।
৭. নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন?
হ্যাঁ। নেপাল ও তিব্বতে নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয়দের পাশাপাশি আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার নাগরিকরাও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৮. নেপালে হড়পা বানে কত জনের মৃত্যু হয়েছে?
নেপাল পুলিশের হিসাবে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬৫-এ পৌঁছেছে। উদ্ধার অভিযান চলায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৯. চিনের তিব্বতের গিরংয়ে পরিস্থিতি কেমন?
চিনা সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে অন্তত তিন জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে।